সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

হাওড়ে গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে সবজি চারা উৎপাদন শুরু

১২ মাসই সবজি চাষের উদ্যোগ
হাওড়ে গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে সবজি চারা উৎপাদন শুরু
সুনামগঞ্জে গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি চারা -যাযাদি

হাওড়ের জেলা সুনামগঞ্জে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা এখন নিয়মিত কৃষকের ক্ষতির কারণ। প্রতি বছরই বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ধানের সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে সবজিও। এ বছর টানা চারবার বন্যায় আমন ধানের সঙ্গে সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই শীতের সবজি উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান আধুনিক গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে ১২ মাস উচ্চফলনশীল সবজি চারা উৎপাদনে নেমেছে। মাটিবিহীন পদ্ধতিতে শূন্য মৃতু্য হার ও পোকা-মাকড়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন চারা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনও শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সিলেট বিভাগের হাওড়াঞ্চলে গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে ১২ মাস উচ্চফলনশীল সবজি চারা উৎপাদন এটাই প্রথম। আগামীতে কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলার চিন্তা করছেন দায়িত্বশীলরা। বৃহত্তর সিলেট বিভাগে আধুনিক পলি হাউসে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সবজি চারা উৎপাদনের প্রথম উদ্যোগ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন কৃষকরা। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উদ্বোধন করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তের গ্রাম আমপাড়ায় এক একর জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই সবজি চারা প্রতিষ্ঠানটির। বর্তমানে

আগাম ফলনশীল কয়েক প্রজাতির টমেটো, লাউ, ফুলকপি ও কাঁচা মরিচের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। মাটির বদলে পস্নাস্টিকের তৈরি বিশেষ ট্রেতে কোকোপিট ব্যবহার করে শতভাগ শিকড়যুক্ত চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। তাই মাটি বাহিত রোগ-জীবাণুতে চারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

সরেজমিন আমপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিবিষ্ট মনে কাজ করছেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা হাসান আহমদ। তিনি চারায় সেচ দিচ্ছেন। নিবিড়ভাবে পরিচর্যা করেন নানা প্রজাতির চারা। তার পাশেই প্রকল্পটির একজন পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা গাজী নুরুল ইসলামও কাজ করেন। পাশে আরও চারা উৎপাদনের লক্ষ্যে বেড তৈরি করছেন কয়েকজন শ্রমিক। হাসান আহমদ পরামর্শ দিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হাওড় জেলা সুনামগঞ্জে ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনার সঙ্গে প্রাকৃতিক সমস্যা এখন প্রকট হয়েছে। বছরের বেশিরভাগ সময়ই বন্যা থাকে। এতে সবজি চারা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থা বিবেচনা করে কৃষকদের ১২ মাস সবজি চাষে উৎসাহিত করে উৎপাদন বাড়িয়ে সরকারের অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে এই চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। দেশ থেকে আমদানিকৃত ইউভি সুস্থিত পলি ও শেডনেট দিয়ে দৃষ্টিনন্দন পলিহাউস তৈরি করেছেন। সীমান্তের পাদদেশে সবুজাভ দৃষ্টিনন্দন এই পলিহাউস দেখতেও মানুষ ভিড় করছেন।

ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, আধুনিক এই পলিহাউসে পস্নাস্টিক ট্রেতে মাটির বদলে নারিকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি কোকোপিট প্রক্রিয়াজাত ও জীবাণুমুক্ত করে বীজ বপন করা হচ্ছে। রোদের তাপ থেকে চারা সুরক্ষার জন্য ওপরে শেডনেট জুড়ে দিয়ে তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কৃত্রিম উপায়ে। ওই শেডনেট ভেতরের উত্তাপ ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে চারা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া গ্রিন হাউসের ভেতরে রয়েছে কৃত্রিম দাঁড়কাক। কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে পোকা ঢুকলে ওই দাঁড়কাক শুষে নেবে সহজে। সংশ্লিষ্টরা জানান, পলিহাউসের ভেতরে উৎপাদিত চারা ২০ দিন পর রোপণযোগ্য হয়ে ওঠে। চারাগুলো শতভাগ শেকড়যুক্ত থাকায় রোপণের পর মৃতু্যহার প্রায় শূন্য এবং মাটিবাহিত রোগ-জীবাণু থেকেও মুক্ত। উন্মুক্ত জমির চারার তুলনায় এই চারা থেকে ফসল দ্রম্নত তোলা যায়। একটি টমেটো চারা থেকে ১০-১২ কেজি টমেটো পাওয়া যাবে। প্রতিটি টমেটো, ফুলকপি, মরিচ ও বেগুনের চারার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ থেকে তিন টাকার মধ্যে। লাউ এবং করলার চারার দাম আট থেকে ১০ টাকা। শীতকালীন সবজি চারা উৎপাদন শুরু করলেও গ্রীষ্মকালীন সবজি চারা ও গ্রাফটিং বা জোড়কলম পদ্ধতির টমেটো চারা উৎপাদন করার চিন্তা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু গ্রাফটিং টমেটো চারা অধিক ফলনে সক্ষম বলে জানান তারা।

প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে চারজন শ্রমিক রাতদিন টানা কাজ করছেন। চারাগুলোতে দিনে অন্তত তিনবার সেচ দিতে হয়। তাপমাত্রা ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করতে হয়। মাঝে মধ্যে ভিটামিন দিতে হয়। শীতকালীন সবজি চারা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে টমেটো, চেরি টমেটো, করলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মরিচ, বেগুন, লাউ চারা এখন উৎপাদন করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া মিষ্টি কুমড়া, ঝিংগা, গ্রীষ্মকালীন গ্রাফটিং টমেটো, চিচিঙ্গা, শসা, পেঁপে, ক্যাপসিকাম ও স্ট্রবেরির চারাও উৎপাদন করা হবে পর্যায়ক্রমে। সবজি চারা উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমপাড়া এলাকার কৃষক আবদুল মন্নাফ বলেন, চারবারের বন্যায় তার সবজি চারা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে চারা তৈরি করার সময় নেই। তাই এখান থেকে আগাম টমেটো চারা নিতে এসেছেন। তিনি আরও বলেন, ১২ মাস চারা পেলে সুনামগঞ্জ জেলায় সবজি উৎপাদন আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।

প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান আহমদ বলেন, বৃহত্তর সিলেট বিভাগে গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে 'গ্রিনহিল সিডলিং ফার্ম' প্রথমবারের মতো উচ্চফলনশীল চারা উৎপাদন শুরু করেছে। বারবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা এখন হতাশ। তারা কৃষি উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। কৃষকরা যাতে বন্যা ও বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সে জন্য ১২ মাস সবজি চারা সরবরাহ করে কৃষি বিপস্নবের স্বপ্ন দেখছি আমরা। তিনি জানান, আগামীতে তার প্রতিষ্ঠান কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করবে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সফর উদ্দিন বলেন, তার জানামতে গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে উচ্চফলনশীল সবজি চারা উৎপাদন সুনামগঞ্জে প্রথমবারের মতো হচ্ছে। তিনি বলেন, ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য ঘাটতি দূর করতে উচ্চফলনশীল কৃষির বিকল্প নেই। হাওড়াঞ্চলে এ প্রক্রিয়ায় কৃষকরা অবশ্যই লাভবান হবেন। কৃষিতে বিরাট পরিবর্তন আসবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd


উপরে