মূল হোতাসহ চক্রের ১৮ জন গ্রেপ্তার

'মা আস্থা রাখো' বলে টাকা হাতিয়ে নেন দরবেশ বাবা

প্রকাশ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

যাযাদি রিপোর্ট
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে চক্রের ১৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়
পারিবারিক সমস্যায় থাকা এক নারী চিকিৎসক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে এক দরবেশের দ্বারস্থ হন। আর সমস্যা সমাধানের কথা বলে ওই দরবেশ হাতিয়ে নেন নারী চিকিৎসকের ২৫ লাখ টাকা। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে গত বছরের ৭ নভেম্বর রাজধানীর খিলগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী ওই নারী চিকিৎসক। মামলার সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তের এক পর্যায়ে ১৮ ফেব্রম্নয়ারি চক্রের হোতা আশিকুর রহমানকে মাগুরা জেলা থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জ থেকে চক্রের আরও ১৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিআইডিপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া। সিআইডিপ্রধান বলেন, দরবেশ পরিচয় দেওয়া এ চক্রের ১৯ সদস্যকে মাগুরা ও ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে প্রতারণা করছিলেন। চক্রের সদস্যদের প্রতারণায় রয়েছে দুটি ভিন্ন কৌশল। প্রথমত তারা দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে বা ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত অথবা অর্থ সম্পদশালী ব্যক্তিদের দারোয়ান বা ড্রাইভারের সঙ্গে প্রথমে সম্পর্ক গড়েন। পরে তাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারের গোপন তথ্য সংগ্রহ করেন। পারিবারিক সমস্যাগুলো কৌশলে জেনে নিয়ে একই বাড়ির মালিক ও স্ত্রীর নম্বর সংগ্রহ করে চক্রটি। তারপর শুরু করে প্রতারণার খেলা। স্ত্রীর কাছে স্বামীর বদনাম এবং স্বামীর কাছে স্ত্রীর বদনাম বলে কান ভারী করেন। তখন উভয়ের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং প্রত্যেকে তাদের সমস্যা নিরসনের জন্য পথ খুঁজতে থাকেন। এ সুযোগে চক্রের সদস্যরা মসজিদে নববির ইমামের নাম নিয়ে প্রতারণা করতে থাকেন। অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, চক্রটির দ্বিতীয় কৌশল হলো গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চমকপ্রদ ও চোখ ঝলসানো বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রলুব্ধ করা। লটারি পাইয়ে দেওয়া, ভাগ্য বদল, পাওনা টাকা আদায়, মামলায় জেতানো, পারিবারিক সমস্যা সমাধানের কথা বলা হয় তাদের বিজ্ঞাপনে। আধ্যাত্মিক ও তান্ত্রিক ক্ষমতাবলে বিপদগ্রস্ত লোকদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারবে- এমন বিজ্ঞাপন দেয় চক্রটি। এসব বিজ্ঞাপন দেখে কোনো ভুক্তভোগী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই শুরু হয়ে যায় প্রতারণা। নানা কৌশলে চক্রটি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। সিআইডিপ্রধান বলেন, এভাবেই চক্রটি পারিবারিক সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার কথা বলে এক নারী ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। 'দরবেশ বাবা' পরিচয়ে কয়েক ধাপে তার কাছ থেকে এ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। খিলগাঁও থানায় দায়ের করা একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এই চক্রের সন্ধান পায় সিআইডি। ভুক্তভোগী ওই নারী পারিবারিক সমস্যায় থাকায় মুক্তির পথ খুঁজছিলেন। এ অবস্থায় ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন দেখে তার চোখ আটকে যায়। বিজ্ঞাপনে দরবেশ বেশধারী এক সুদর্শন ব্যক্তি নিজেকে সৌদি আরবের মসজিদে নববির ইমাম পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি কোরআন-হাদিসের আলোকে মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করেন। বিজ্ঞাপনটি মন কাড়ে ওই নারী চিকিৎসকের। পরে বিজ্ঞাপনে দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করেন তিনি। অন্য প্রান্তে থাকা দরবেশ বাবা বেশধারী ব্যক্তি সুন্দরভাবে কথা বলে তার পারিবারিক সমস্যা শুনতে চান। ভুক্তভোগী চিকিৎসক তার পরিবারের সমস্যার কথা তুলে ধরেন কথিত দরবেশ বাবার কাছে। সমস্যার কথা শুনে দরবেশ তাকে বলেন, 'মা তোমার সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। বাবার ওপর আস্থা রাখো। তোমাকে মা বলে ডাকলাম। আজ থেকে তুমি আমার মেয়ে। তবে কিছু খরচ লাগবে। খরচের কথা কাউকে জানানো যাবে না। জানালে সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং সমস্যা আরও বাড়বে এবং তোমার ছেলে-মেয়ে ও স্বামীর ক্ষতি হবে।' নারী চিকিৎসক ভন্ড দরবেশের কথায় তার ভক্ত হয়ে যান। এর পর থেকে বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন সময়ে অলৌকিক সমস্যার কথা বলে প্রলোভন ও ভয়ভীতির মাধ্যমে মোট ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্রটি। পরে এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস) নম্বরের সূত্র ধরে মাগুরা জেলা থেকে আশিকুর রহমান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তিনি চক্রের হোতা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তাদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। চক্রের বিভিন্ন টেকনিক্যাল সাপোর্ট, বেনামে রেজিস্ট্রেশন করা সিম এবং ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার কাজ করেন গ্রেপ্তারকৃত আশিকুর। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে কথিত দরবেশ পরিচয় দেওয়া ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ২০২০-২১ সাল থেকে তারা এ প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। প্রথম দিকে তারা বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিতেন। পরে তারা পত্রিকা এবং বিভিন্ন চ্যানেলের পাশাপাশি ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিতে থাকেন। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ তাদের দেওয়া মোবাইল নম্বরে কল দিলে সমস্যা সমাধানের নামে ভয়ভীতি ও নানা প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিত তাদের চক্রটি। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে প্রতারণায় জড়িত ৪১টি মোবাইল ফোন, বিপুলসংখ্যক সিমকার্ড ও ডিজিটাল আলামত উদ্ধার করা হয়।