logo
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০ ১২ কার্তিক ১৪২৭

  তানভীর হাসান   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০  

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে ১২ সুপারিশ গোয়েন্দাদের

রাজধানীতে ৩২ কিশোর গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা সাড়ে ৫০০

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে ১২ সুপারিশ গোয়েন্দাদের
পুলিশের হাতে আটক কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন -ফাইল ছবি

রাজধানীতে বেপরোয়া হয়ে ওঠা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের লাগাম টানার মাধ্যমে সুপথে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ১২ দফা সুপারিশ তৈরি করেছে। সুপারিশে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান, জুমার খুতবায় কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করা, কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে নিয়মিত কাউন্সিলিং করাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। গত সপ্তাহে তৈরি করা প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে শিশু-কিশোরদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে অভিভাবকদের আরও যত্নবান হওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। পারিবারিক বন্ধন জোরদারের পাশাপাশি সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কাদের সাথে মিশছে এ ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। খারাপ প্রকৃতির ছেলেদের সাথে সন্তানকে না মেশার জন্য পরামর্শ দেওয়াসহ কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা ও বিতর্ক \হপ্রতিযোগিতার আয়োজন করার কথা বলা হয়েছে। স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করার পাশাপাশি শিক্ষকদের মোটিভেশনাল ভূমিকা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ ও অনুষ্ঠান পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশু-কিশোরদের সুশিক্ষার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর-তরুণদের গ্যাং কালচার থেকে ফিরিয়ে আনতে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ কর্তৃক কিশোর গ্যাং নির্মূলে হটস্পট চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিবিদরা যেন কিশোরদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে। কমিউনিটি পুলিশিং, বিট পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারসহ তাদের শনাক্তকরণে পাড়া-মহলস্নায় অভিভাবকসহ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা, কিশোর গ্যাংবিরোধী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা। জুমার খুতবায় ইমাম কর্তৃক কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করা, শিক্ষার্থীরা যাতে লেখাপড়ার বাইরে অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারে সে ব্যাপারে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৫ মার্চ গার্মেন্ট ও শিল্পকারখানা বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার চাপ নেই। অনেক কিশোর করোনার কারণে কর্মসংস্থান হারিয়েছে। একদিকে স্কুল-কলেজ বন্ধ, অন্যদিকে বেকার হয়ে পড়ায় কিশোররা একত্রে পাড়া-মহলস্নার অলিগলিতে আড্ডা দেয়। নিজেদের গ্রম্নপ ভারী করার জন্য তারা উঠতি বয়সি কিশোরদের দলে টানছে। পাড়া-মহলস্নায় নারী ও কিশোরী মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। এতে এক পক্ষের সাথে অপর পক্ষের সামান্য কারণে কথা কাটাকাটির কারণে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। শুধু ঢাকার ডেমরা, সূত্রাপুর, সবুজবাগ, খিলক্ষেত, কোতোয়ালি, উত্তরা পশ্চিম, তুরাগ, খিলগাঁও, দক্ষিণখান ও টঙ্গি থানা এলাকায় ৩২টি কিশোর গ্যাং বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। করোনার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পর তাদের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের তৎপরতা আরও বেড়ে গেছে। তাদের মাঝে গ্যাং কালচার ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। একই স্কুলে অধ্যয়নরত ও একই পাড়া-মহলস্নায় বসবাসরত কিশোর-তরুণরা ফেসবুকসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাহারি ও চটকদার নাম দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গ্যাং তৈরি করছে। এরপর তারা মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেওয়ার পাশাপাশি ইন্টারনেটে অশ্লীল ছবি দেখার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আধিপত্য বিস্তারসহ নানা কারণে একে অপরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে, যা উদ্বেগজনক। ঢাকার ৩২ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এখন সাড়ে ৫ শতাধিক। গত কয়েক মাসে এসব কিশোর সন্ত্রাসীর হাতে ১৩টি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটেছে। তাদের এমন কর্মকান্ডের ফলে সমাজে অস্থিরতাসহ এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার করেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশে বলা হয়, কিশোর সন্ত্রাসীরা কখনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আবার কখনো বড় মাপের সন্ত্রাসীদের ছত্রছায়ায় অবস্থান করে অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালাচ্ছে। তাদের এরূপ কর্মকান্ডের কারণে সমাজে অস্থিরতাসহ এলাকাবাসীর মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাদের কারণে সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে ছিনতাই, ছাত্রী অপহরণ, এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। সুতরাং দেশের তরুণ সমাজকে গ্যাং কালচার থেকে ফেরানো সম্ভব না হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে। সাম্প্রতিক ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে ওই প্রতিবেদনে কিছু ঘটনা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, তারা গত কয়েক মাসে ১৩টি খুনের ঘটনা ঘটনায়। এছাড়া মারামারি ও আহত করার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে শতাধিকের ওপরে। রেফারেন্স বলা হয় গত ১০ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলায় সামান্য কারণে কদমরসুল কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম ওরফে নিহাদ (১৮) ও বিএম ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র জিসান আহম্মেদকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা খুন করে। এর আগের মাসে কামরাঙ্গীরচরে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে খুন করা হয় সজিবকে। মামলার এজাহারভুক্ত ১১ আসামির অধিকাংশ কিশোর সন্ত্রাসী। চলতি মাসের ৮ তারিখে সবুজবাগ এলাকায় ছুরিকাঘাতে জব্বার আলী নামে এক কিশোর খুন হয়। গত ২৭ আগস্ট উত্তরখানের খ্রিষ্টানপাড়া ডাক্তার বাড়ি মোড় এলাকায় খুন করা হয় সোহাগকে। পহেলা এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুলস্নার আদর্শনগর এলাকায় ৩০ বছর বয়সি শরিফ হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে কিশোর সন্ত্রাসীরা। গত ২৩ ফেব্রম্নয়ারি তেজগাঁও কৃষি প্রশিক্ষণায়তের সামনে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে হাসান নামে এক যুবক খুন হন। এভাবে তারা চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ জনকে খুন করে। এর আগের বছরেও তারা ঢাকা, চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড ঘটায়। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ১০ মে তারা চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকায় বখাটে কিশোরদের দ্বন্দ্ব মেটাতে গিয়ে খুন হন মোস্তাক আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তি। একই বছরের ২৬ আগস্ট খুলশী থানা এলাকায় জাকির হোসেন সানি নামের এক কিশোরকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয়। গাজীপুরের রাজদীঘি পাড় এলাকায় দুই কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে নুরুল ইসলাম নুরুকে কুপিয়ে হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর ও ৪ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর এবং মান্ডায় মহসিন ও মাহিম নামের দুই কিশোরকে হত্যা করে প্রতিপক্ষরা। এসব ঘটনা ওই বছরের আলোচিত বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে