logo
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৩ আশ্বিন ১৪২৭

  ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ   ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

ফলপ্রসূ সমবায় আন্দোলন বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের পথ সুগম করে

বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। সমবায় সমিতি এমন একটি জনকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে থাকে গণতন্ত্র, সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টা, ব্যাপক উৎপাদন কর্মযজ্ঞ এবং সদস্যদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির প্রয়াস।

একই বা অভিন্ন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সমবেতভাবে কাজ করার নামই হলো সমবায়। নিজেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একই শ্রেণি ও পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত সমমনা বা একই মানসিকতাসম্পন্ন কিছুসংখ্যক মানুষ যখন একত্রিত হয়ে কোনো সংগঠন বা সংস্থা গঠন করে তখন ওই সংস্থাকে সমবায় বলে। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনৈতিক সংস্থা সমবায়কে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ হুভাট ক্যালভাটের মতে 'সমবায় হলো একটি প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে মানুষ হিসেবে সততা ও সাম্যের ভিত্তিতে স্বেচ্ছায় একত্রিত হয়।' ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়ড়ঢ়বৎধঃরাব অষষরধহপব-এর মতে 'সমবায় হচ্ছে এমন কতগুলো লোকের সংস্থা, যাদের আয় সীমাবদ্ধ এবং এমন একটি প্রতিষ্ঠান যারা গণতান্ত্রিক উপায়ে নিয়ন্ত্রিত সংগঠনের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একত্রিত হয়ে কোনো সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় তহবিলে ন্যায়ভাবে অংশ প্রদান করে, আর প্রচেষ্টাজনিত ঝুঁকি ও সুযোগ-সুবিধার ন্যায্য অংশগ্রহণ করে।'

সমবায় আন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরনো। ইউরোপের শিল্প বিপস্নবের পর হাজার হাজার শ্রমিক চাকুরিচু্যত হয়ে কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হন। এ সময় ইংল্যান্ডের 'রচডেল' নামক গ্রামের ২৮ জন তাঁতি ২৮ পাউন্ড পুঁজি নিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম সমবায় সমিতি গড়ে তোলে। ১৮৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সমিতি সমবায় আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। ইংল্যান্ডের 'রচডেল' গ্রামের এই সমিতিটি পৃথিবীর প্রথম সফল সমবায় হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমবায় সমিতি বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলনের ইতিহাসও বেশ পুরনো। এ দেশে সমবায় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন স্যার পিসি রায়। তিনি খুলনা জেলার পাইকগাছায় বাড়লি গ্রামের মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন এবং আত্মনির্ভরশীল করার উদ্দেশ্যে এলাকার মানুষকে সমবায়ের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জেনারেল লর্ড কার্জন ১৯০৪ সালে সমবায় ঋণদান সমিতি আইন জারি করেন। প্রকৃতপক্ষে এই আইনের মাধ্যমেই উপমহাদেশের সমবায় আন্দোলনের অভিযাত্রা শুরু। ১৯৪০ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদে ্তুঞযব ইধহমষব ঈড়ড়ঢ়বৎধঃরাব ঝড়পরবঃু অপঃ'- নামে একটি আইন পাস হয়। সমবায় ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ১৯৮৪ সালে জারি করা হয় সমবায় অধ্যাদেশ। ১৯৮৭ সালে প্রণীত হয় সমবায় নিয়মাবলি।

বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনের মূলনীতিগুলো হলো- একতা, সাম্য, সহযোগিতা, সততা, বিশ্বাস, গণতন্ত্র ও সেবা। আন্তর্জাতিক সমবায়ের ক্ষেত্রেও কিছু মূলনীতি রয়েছে, এগুলো হলো- স্বতঃস্ফূর্ত ও অবাধ সদস্যপদ, সামাজিক অঙ্গীকার, সদস্যের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, সদস্যের আর্থিক অংশগ্রহণ, আন্তঃসমবায় সহযোগিতা, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তথ্য। বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনকে গতিশীল করার জন্য এ দেশের মানুষের সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের আলোকে মূলনীতিসমূহ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সমবায়ের স্স্নোগান হলো- 'একতাই বল' এবং মূলকথা হলো 'সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে'। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক উন্নয়নের জন্য জনসম্পৃক্ত সমবায় আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে সমবায় আন্দোলন অনেক পুরনো হলেও তা এ দেশের মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি। কিন্তু সমবায়ের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করতে পারলে জমির মালিক ও কৃষক উভয়েই লাভবান হবে। এ জন্য প্রকৃত সমবায়ীদের নেতৃত্বে সমবায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন বেশি করলে তা দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সাহায্য করবে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনকালেই জাতির পিতা সমবায়ের মাধ্যমে এ দেশের আর্থ-সমাজিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু কৃষি, ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিল্প উদ্যোগ, কৃষি ঋণ বিতরণ- সব ক্ষেত্রে সমবায় কৌশলকে কাজে লাগিয়ে স্থায়ী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি সংবিধানে সমবায়কে রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিকানার দ্বিতীয় খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, জাতির পিতার ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ দ্বিতীয় বিপস্নবের কর্মসূচি ঘোষণার একটি অংশের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন- 'গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। ভয় পাবেন না যে জমি নিয়ে যাব তা নয়। পাঁচ বছরের পস্ন্যানে বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে এই কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে।' প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার দর্শনকে ধারণ করেই সরকার প্রতিটি গ্রামে সমবায়ভিত্তিক মৎস্য খামারসহ গবাদিপশু, হাঁস-মুরগির খামার গড়ে তুলছে। সামাজিক বনায়ন, সমিতির মাধ্যমে পরিবেশের উন্নয়ন, তাঁত ও সেলাই, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কুটির শিল্প, মৃৎশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও বাস্তবায়ন করছে।

ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছেন সরকারের রাজস্ব আয়ের খুব যৎসামান্যই প্রজার হিতসাধনের জন্য উদ্বৃত্ত থাকে। রাজশক্তির সঙ্গে প্রজার এই যে অসাম্য তা কমিয়ে আনতে তিনি 'সমবায়'-এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এতটা দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে প্রজাসাধারণের আয়- রোজগার করবার উপায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা, সর্বোপরি সমাজের বিদ্যমান অসাম্যের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে একত্রিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, এমন এক সময় ছিল যখন ধনীর ধনের ওপর সমাজের দাবি ছিল। ধনী তার ধনের কল্যাণধর্মী ব্যবহার করেছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল। আজ সমাজনীতি পরিবর্তন হয়েছে। ধনের ভোগ এখন ব্যক্তিগত। রাষ্ট্রের বা সমাজের ধন এখন লোকহিতে নিযুক্ত নয়, ফলে লোকসাধারণ আপন হিত সাধনে অক্ষম। আজ ধনীরা শহরে এসে ধনভোগ করছে, ফলে গ্রামের সাধারণ লোকরা আপন ভাগ্যের কার্পণ্য নিয়ে হাহাকার করছে। তাদের ভেতরে যে লুকানো শক্তি আছে, আত্মশক্তি উদ্বোধনের মাধ্যমে তাদের যে নিজেদের বাঁচবার উপায় আছে, সেই বিশ্বাস তারা যেন হারিয়ে ফেলেছে। সে জন্য রবীন্দ্রনাথ আত্মশক্তি অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। লোকসাধারণের ঐক্যের কথা বলেছেন। সংঘবদ্ধ হতে বলেছেন। 'সমবায়' গঠনের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের সমবায় চিন্তার সারকথা প্রীতির মাধ্যমে লোকসাধারণের হিতসাধন। এই প্রীতি আর ভালোবাসা প্রজাসাধারণকে, বিশেষ করে দরিদ্র কৃষক সমাজকে আত্মশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করবে, উৎপাদন কর্মকান্ডে উৎসাহ জোগাবে, গতিময়তা আনবে। রবীন্দ্রনাথ সমবায়কে মুক্তির একমাত্র পথ বলেছেন। তিনি এটিকে মনুষ্যত্বের মূলনীতি হিসেবে দেখেছেন। গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সমবায়ের সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির সংমিশ্রণের ওপর জোর দিয়েছেন। এমনকি তিনি আয়ারল্যান্ড ভ্রমণের সেখানকার কো-অপারেটিভ পদ্ধতি দেখে অভিভূত হয়েছেন। স্বদেশে প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন। গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে 'মন্ডলী' প্রথার পাশাপাশি 'সমবায়নীতি' বাস্তবায়নে কৃষিব্যয়ক প্রতিষ্ঠা তার এক অসাধারণ পদক্ষেপ। শিলাইদহে ও পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপনের পর রবীন্দ্রনাথ কৃষকদের সমবায়ী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তা ছাড়া, সমবায়ের মাধ্যমে কুটির শিল্পেরও প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীতে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে তিনি সমবায়ে বিশেষ সফলতা লাভ করেছিলেন।

সমবায় মূলত সঞ্চয়, পুঁজি গঠন, বিনিয়োগ, লভ্যাংশ বিতরণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তি খাতের পাশাপাশি সমবায় খাতের উলেস্নখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ১৯০৪ সালে পলস্নী এলাকার উন্নয়নের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশে সমবায় কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাধীনতাত্তোর সত্তরের দশকে এ দেশের কৃষকদের সমবায়ের মাধ্যমে সংগঠিত করে উন্নত বীজ, সার ও সেচ সুবিধা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এ সময়ে কৃষি ও কৃষিজাত শিল্পায়নে সমবায়ের উপরোক্ত ধারা চলমান থাকে। যা আশির দশকে সবুজ বিপস্নব অর্জনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। নব্বইয়ের দশকে দেশে সংস্কার কর্মসূচি চালু হলে সরকারের-বেসরকারিকরণ ও উদারীকরণ নীতির আওতায় সমবায়ের জন্য নতুন ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। যার ধারাবাহিকতায় আজ গড়ে উঠেছে হাজার হাজার নতুন শ্রেণির সমবায় সমিতি। এ সব সমবায় সমিতির বেশিরভাগই ক্ষুদ্র আয়ের জনগোষ্ঠীর মাঝে আর্থিক সুবিধা প্রদান করে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অন্যদিকে কৃষিজাত শিল্পায়ন ও মৎস্য খাতে বিভিন্ন কারণে সমবায়ের কার্যক্রমে ভাটা পরিলক্ষিত হলেও দুগ্ধ খাতে সমবায়ের ক্রমেই বিস্তৃতি ঘটছে। এ ছাড়া দেশের পানি সম্পদের সুষ্ঠু ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পানিসম্পদ অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় সুবিধাভোগীদের সমন্বয়ে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি। আশ্রয়হীন ও ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে ভূমি ও বাসস্থান বরাদ্দ করে দেশের মূল ধারায় সংযুক্ত করার প্রয়াসে গড়ে উঠছে আশ্রয়ণ সমবায় সমিতি। ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে এবং নিরাপদ আবাসন স্থাপনের লক্ষ্যে গড়ে উঠছে গৃহায়ণ ও সমবায় সমিতি। সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি গ্রামের সব মানুষকে একত্রিত করে গ্রামের অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনাগুলোকে উন্মোচন করে স্থানীয় সম্পদ সৃষ্টিতে উলেস্নখযোগ্য অবদান রাখছে। পরিবহণ খাতে সংশ্লিষ্ট সমবায় তথা পরিবহণ সমবায় দেশের বেকার সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। টেকসই পরিবেশ গড়তে সমবায়ের মাধ্যমে সামাজিক বনায়নকে জনপ্রিয় করে তোলা হয়েছে।

আশির দশকের শুরুর দিকে এ ধরনের দ্বিস্তর সমবায়ের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটলেও বিংশ শতকের শুরুর দিকে সমবায়ের এ ধারাটিও মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯০৪ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সমবায় পদ্ধতির নানামুখী প্রয়োগ লক্ষ্য করা গেলেও কার্যত টেকসই সমবায় মডেল গড়ে ওঠেনি। সমবায় সেক্টরে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হলেও জাতীয়ভাবে টেকসই গ্রাম উন্নয়নের কার্যকর পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ বিশ্বব্যাপী সমবায় একটি স্বীকৃত উন্নয়ন কৌশল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যাপক সফলতা অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের ১৩(খ) অনুচ্ছেদে সম্পদের মালিকানার অন্যতম খাত হিসেবে সমবায়কে স্বীকৃতি দেয়া হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েই সমবায়কে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে এবং শোষিত মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সমতা ভিত্তিক উন্নয়ন দর্শনের আওতায় সমবায়কে অন্যতম কৌশলিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে গ্রাম উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে সমবায়কে বেছে নেয়া হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩ অনুসারে রাষ্ট্রে উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টন প্রণালিসমূহের মালিক জনগণ। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায় মালিকানা ও ব্যক্তিগত মালিকানা- এ তিন ধরনের মালিকানা ব্যবস্থা সংবিধানে স্বীকৃত। সমবায়ী মালিকানা হচ্ছে আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমবায়সমূহের সদস্যদের পক্ষে সমবায়সমূহের মালিকানা, যা সমষ্টিগত বা যৌথ মালিকানা। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব মেহনতী মানুষকে, কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তি দান করা। এ ক্ষেত্রে সমবায় ব্যবস্থা বড় ভূমিকা পালন করতে পারে, কেননা, সমবায়, সমবেত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সবার দ্বারা দুর্বলকে শোষণ থেকে মুক্ত করে তার ক্ষমতায়নে সহায়তা করে। যুগোপযোগী সমবায় নীতির আওতায় বিকশিত সমবায়ের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে সামাজিক সাম্য ও সমতা অর্জনসহ মালিকানা সম্পর্কিত সাংবিধানিক স্বীকৃতির সফল রূপায়ণ সম্ভব। দেশের সমৃদ্ধ ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও এর উযোগিতা বৃদ্ধি, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, উৎপাদিত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে সমবায় প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এসব উদ্দেশ্য এবং সমবায় আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে সমবায় সমিতিকে গণমুখী ও বহুমুখী করার উদ্দেশ্যে সমবায় অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে জাতীয় পলস্নী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতিতে সমবায়ের প্রভাব ও পরিমাণ বিস্তৃত করার লক্ষ্যে সমবায়বান্ধব নীতি আবশ্যক।

দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী একটি পরীক্ষিত স্বীকৃত মাধ্যম হচ্ছে সমবায়। বর্তমানে অর্থনীতির প্রায় সব শাখায় সমবায় তার কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও 'রূপকল্প-২০২১' বাস্তবায়নে সমবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে আর্থিক ও সেবা খাতে নতুন কার্যক্রম গ্রহণ, বিদ্যমান কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন ও সময়োপযোগীকরণের মাধ্যমে সমবায় অধিদপ্তর বেশ কিছু মৌলিক লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখতে পারে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা আনয়ন, প্রশিক্ষণ ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন বিশেষত নারী উন্নয়নে সমবায় নিকট ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। পৃথিবীতে অনেক উন্নত রাষ্ট্রই সমবায়ের কৌশলকে অবলম্বন করে স্বাবলম্বী হয়েছে। বাংলাদেশও সমবায়ী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হলে, অনুপ্রাণিত হলে ড. আকতার হামিদ খানের প্রণীত পলস্নী উন্নয়নের কৌশলকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে একমাত্র সমবায়ী চেতনায় মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে যে কোনো কঠিনতর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা উপহার দিয়ে বিশ্ব দরবারে তাকে এক সুনাম ও সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। সমবায় সমিতি এমন একটি জনকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে থাকে গণতন্ত্র, সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টা, ব্যাপক উৎপাদন কর্মযজ্ঞ এবং সদস্যদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির প্রয়াস।

আধুনিক কৃষির জন্য যে পুঁজি ঝুঁকি এবং যৌথ মেধার দরকার তার জন্য প্রয়োজন গণমুখী কৃষিভিত্তিক সমবায় ব্যবস্থা। খাদ্য নিরাপত্তা ও মানুষের দারিদ্র্য দূর করতে হলে কৃষি সমবায়ের কোনো বিকল্প নেই। যথাযথ নীতি এবং সার্বিক সহযোগিতা পেলে কৃষি সমবায় খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।

দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ বিপর্যয় প্রতিরোধ এবং খাদ্য নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টিতে অন্যতম এবং উৎকৃষ্ট পদ্ধতি হলো সমবায়ী উদ্যোগ। এ জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের জন্য, নিজের জন্য সমবায় প্রতিষ্ঠা। অষষ ভড়ৎ বধপয ধহফ বধপয ভড়ৎ ধষষ এই মর্মবাণী ধারণ করে সমবায় আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের সবার একান্ত দায়িত্ব।

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ: লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক। সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে