মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সড়কে আর মৃত্যু নয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি

দুর্ঘটনা ঘটলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রম্নত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে দোষীদের শাস্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। সমাজের যে শ্রেণির মানুষই দুর্ঘটনার শিকার হোক না কেন, প্রত্যেক মানুষ আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু কোনো একটি দুর্ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়েছে কি না আমার তা জানা নেই।
সড়কে আর মৃত্যু নয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি

সড়ক মানে মৃতু্যর মিছিল; এই মৃতু্যর মিছিল নিয়ে জাতি খুবই উদ্বিগ্ন। সড়ক দুর্ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর ঈদ, পূজাসহ অন্যান্য সামাজিক উৎসব এলে সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা অনেকগুণ বেড়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের জীবনে এক আতঙ্ক। নিরাপদ সড়ক আমরা সবাই চাচ্ছি, কিন্তু পরিবহণের সঙ্গে যারা জড়িত তারা চাচ্ছে কি না সন্দেহ আছে। যদি চাইত তাহলে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা এত বৃদ্ধি পেত না। ঘর থেকে গাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশে বের হলে মনে হয়, আর বাড়ি ফিরব কি না সন্দেহ থাকে। প্রতি বছর ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করে থাকি। কিন্তু সরকারের এ দিবস অনুমোদনের পেছনে যে কারণ ছিল, অধিকাংশ তার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। কারণ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর হাজার হাজার লোক নিহত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার খবর প্রতিদিন আমাদের আহত ও ক্ষতবিক্ষত করে চলছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক, ক্ষতই সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে ওই পরিবারকে। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃতু্য পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয়। যার ক্ষতি কোনোভাবেই পুষিয়ে নেওয়া যায় না। ফলে ওই পরিবারের যে কি করুণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। আর যারা পঙ্গু হয়ে যায় তাদের পরিবারকে আজীবন তার বোঝা বহন করে চলতে হয়। গণমাধ্যমে জানতে পারি, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বছরে গড়ে বাংলাদেশের জিডিপির শতকরা দেড় ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়- যা পাঁচ হাজার কোটি টাকার সমান। বিগত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতু্যবরণ করছেন ৫৫ হাজার মানুষ। আর দুর্ঘটনাজনিত কারণে মামলার সংখ্যা ৭৫ হাজারের বেশি। কিন্তু কোনো বিচার তেমন কার্যকারিতা পায়নি। সড়ক দুর্ঘটনার ৫৩ শতাংশ ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর ৩৭ শতাংশ চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ঘটে থাকে। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতার কারণেও ১০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে আর পথযাত্রীর অসাবধানতাও এর জন্য কম দায়ী নয়। জাতীয় মহাসড়কগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৫০ শতাংশই ঘটে থাকে। সড়কে ফিটনেসবিহীন অনেক গাড়ি চলমান- যা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে- ট্রাফিক বিধি লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত বোঝাই ও চালকদের ওভারটেকিং, বিরতিবিহীন লম্বা সময়কাল গাড়ি চালানো, ছোট গাড়ির চালক বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে সতর্কতার অভাব, দূরপালস্নার সড়ক ও জনবহুল এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়কের বেহাল অবস্থা। এছাড়াও চালকের লাইসেন্স পাওয়ার সিস্টেমে দুর্বলতা এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের অভাবে সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে থাকে। আর আইনের বাস্তব প্রয়োগ তেমন কার্যকরী হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। চালকরা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে আটক হওয়ার পর জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। এছাড়াও দুর্ঘটনার দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি তেমন হচ্ছে না। কারণ আইনে তেমন শক্তিশালী শাস্তির বিধানও নেই এবং নতুন সড়ক পরিবহণ আইনও শিথিল করা হয়েছে। যার সুযোগ নিচ্ছে পরিবহণ মালিক, শ্রমিক এবং চালকরা। ফলে চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে ভয় পাচ্ছে না। এর বলি হচ্ছে মানুষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা কম নয়, এটাও একটি কারণ সড়ক দুর্ঘটনার। দুর্ঘটনা কমানোর জন্য পরিবহণের সঙ্গে জড়িত তাদের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ দেখছি না। বিশেষ করে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য দৃশ্যমান কোনো তৎপরতাই নেই। পুলিশ মাঝেমধ্যে গাড়ি থামিয়ে শুধু মাদক আছে কি না তা চেক করে থাকে। কিন্তু সড়কে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি দুটিই বেড়ে চলছে। সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে দেশের সব বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা উচিত। এর পাশাপাশি পরিবহণ মালিক, চালক, যাত্রী ও পথচারীদের সচেতন করার লক্ষ্যে লিফলেট, পোস্টার ও স্টিকার বিতরণ করতে হবে। সড়ক যেন মৃতু্যর নয় বরং নিরাপদে পদক্ষেপ জরুরি। সড়কে নিরাপত্তার স্বার্থে নতুন এবং যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হবে- যাতে গাড়িচালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে ভয় পায়। পরিবহণের সঙ্গে জড়িত সবার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মানুষের জীবনের মূল্য, পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। এছাড়াও দালাল বা তদবিরের মাধ্যমে ড্রাইভিংয়ের ভুয়া লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রম্নত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে দোষীদের শাস্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। সমাজের যে শ্রেণির মানুষই দুর্ঘটনার শিকার হোক না কেন, প্রত্যেক মানুষ আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু কোনো একটি দুর্ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়েছে কি না আমার তা জানা নেই। \হআর বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনের দুর্বলতার কারণে সড়কে মৃতু্যর মিছিল কমছে না। বরং সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই শোচনীয় অবস্থা থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করার জন্য সরকার আইনের সংশোধনপূর্বক তা প্রয়োগের মাধ্যমে সড়কে নিরাপদ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। এছাড়াও পুলিশের আইনের বিষয়ে আরও বেশি তৎপর হতে হবে। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে, কারণ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকরাই যে দায়ী তা নয়, রাস্তার পাশের দোকান ও স্কুল প্রতিষ্ঠা, অনেক সময় যাত্রী, পথচারী, শিশুদের দৌড়ে রাস্তা পার হওয়াও দায়ী। আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার আরো কঠোর হবে বলে বিশ্বাস করি। মো. শফিকুল ইসলাম : সাবেক সভাপতি-শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd


উপরে