logo
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৭ আশ্বিন ১৪২৭

  এস এম খালিদ হোসেন   ১৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

১৫ আগস্ট : ইতিহাসের এক অন্ধকারতম দিন

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উদীয়মান শক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই ধারায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে অগ্রসর হতে হবে সামনের দিকে। ভালো থাকুক ৩০ লাখ শহিদ ও জাতির পিতার পরিবারের রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের এই মানচিত্রটি।

১৫ আগস্ট : ইতিহাসের এক অন্ধকারতম দিন

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। মাত্র তিন বছর সাড়ে সাত মাসের ব্যবধানে একটি স্বাধীন দেশের পরিচিতিই যেন পাল্টে গেল। পাল্টে গেল দেশের চিত্র। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যিনি বীরের বেশে ফিরেছিলেন সদ্য স্বাধীন দেশে, পেয়েছিলেন বীরোচিত সংবর্ধনা। মানুষের ভালোবাসার সঙ্গে নিজের অশ্রম্নবিন্দুকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন, সেই মহান নেতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলেন সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী ও উচ্চাভিলাষী বিশ্বাসঘাতক অফিসারদের হাতে। ১০ জানুয়ারির সকালটা ছিল বাঙালি জাতির কাছে এক সাগ্রহ অপেক্ষার সকাল- প্রিয় নেতা দেশে ফিরবেন। আর ১৫ আগস্টের সকালটা ছিল একেবারেই অন্যরকম বিষাদে মাখা। সবাই জানে বাংলাদেশে সকাল আসে পাখির গানে; ভোরের আকাশ রাঙা হয় আবির মেখে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যেন পাখির কান্নার শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল বাঙালি জাতি। ভোরের পুব আকাশে আবির নয়, যেন মাখানো ছিল ছোপ ছোপ রক্ত। বাঙালির ইতিহাস এমনিতেই রক্তের অক্ষরে লেখা। সেদিনের সকালও যেন এসেছিল রক্তরাঙা হয়ে। সে রক্ত ছিল জাতির জনকের, তার প্রিয়তমা স্ত্রী ও প্রিয় সন্তানদের। বাংলার আকাশ-বাতাস আর প্রকৃতিও অশ্রম্নসিক্ত হওয়ার দিন। কেননা পঁচাত্তরের এই দিনে আগস্ট আর শ্রাবণ মিলেমিশে একাকার হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর রক্ত আর আকাশের মর্মছেঁড়া অশ্রম্নর পস্নাবনে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে নিজ বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের বৃষ্টিতে ঘাতকরা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, তখন যে বৃষ্টি ঝরছিল, তা যেন ছিল প্রকৃতিরই অশ্রম্নপাত। ভেজা বাতাস কেঁদেছে সমগ্র বাংলা। ঘাতকদের উদ্যত অস্ত্রের সামনে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলাদেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিল শোকে আর অভাবিত ঘটনার আকস্মিকতায়। কাল থেকে কালান্তরে জ্বলবে এ শোকের আগুন। ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের রচনা হয়েছিল সেদিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালোরাতে ঘাতকের হাতে নিহত হন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্নেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হকসহ আরও অনেকে। জাতি আজ গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করে সব শহিদকে। দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান করায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরেছিলেন নায়কের বেশে। পেয়েছিলেন বীরোচিত সংবর্ধনা। তাকে কেন প্রাণ দিতে হলো নিজের দেশে ঘাতকের হাতে? সদ্য স্বাধীন দেশ তখনো বিধ্বস্ত, মুছে ফেলা যায়নি যুদ্ধের ছাপ। ভেঙে যাওয়া অর্থনীতির চাকা সচল করার চেষ্টা চলছে। চলছে দেশকে নতুন করে গড়ার পরিকল্পনা। মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেই সময়ে কেন দেশের স্থপতিকে খুন করা হলো? প্রণিধানযোগ্য বিশ্লেষণ দিয়েছেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী। তিনি লিখেছেন, 'বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের নব্য ধনী, নতুনভাবে গড়ে ওঠা সিভিল এবং মিলিটারি বু্যরোক্র্যাসি এবং তখন নিষিদ্ধ ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠী এই ভেবে ভীত হয়ে উঠেছিল, শেখ মুজিব কেবল দেশের রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন করেই ক্ষান্ত হবেন না, তিনি তার প্রতিশ্রম্নত অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার পথে এগোবেন। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত আমলাতন্ত্রের কাঠামো ভেঙে প্রশাসনের একেবারে নিচুতলা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বশীল শাসনের ব্যবস্থা করবেন। লুটেরা ধনিক শ্রেণিকে দমন করার লক্ষ্যে তিনি সমাজতন্ত্রের লাল ঘোড়া দাবড়াবেন। রাজনীতিতে সামন্তবাদী ধর্মীয় প্রভাব ও ধর্মের নামে রাজনৈতিক ব্যবসা তিনি উচ্ছেদ করবেন। ফলে এই চক্রগুলো সংগঠিত হয় এবং স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যগুলোসহ বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উচ্ছেদের জন্য চক্রান্ত শুরু করে। পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা নয়, তার আদর্শকেও নির্বাসনে পাঠানোর গভীর ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। ঘাতকের বুলেট সেদিন ধানমন্ডির ওই বাড়িতে শেখ পরিবারের কাউকেই রেহাই দেয়নি। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু বা তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষীগত করে হত্যাকারীদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করেছিল, পুরস্কৃত করেছিল। খুনিদের রক্ষা করার জন্য দেশের সংবিধানেও হাত দেওয়া হয়েছিল। এই পৈশাচিক হত্যাকান্ডের বিচার রহিত করা হয়েছিল ইনডেমিনিটি আইন পাস করার মাধ্যমে। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা শুধু ব্যক্তি মুজিবকে হত্যার প্রয়াস ছিল না, ছিল জাতির স্বাধীনতার শক্তিকে হত্যার অপচেষ্টা। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে খুন করে তারা একটি আদর্শকে খুন করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে দৈহিকভাবে হত্যা করা হলেও তার মৃতু্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব। কেননা একটি জাতি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্থপতি তিনিই। যতদিন এ রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন অমর হয়ে থাকবেন তিনি। সমগ্র জাতিকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় প্রস্তুত করেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তিনি চিরঞ্জীব এ জাতির চেতনায়। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন, এক মহান আদর্শের নাম। যে আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল গোটা দেশ। বাঙালি। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনে দেশের সংবিধানও প্রণয়ন করেছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শোষক আর শোষিতে বিভক্ত সেদিনের বিশ্ববাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন শোষিতের পক্ষে। পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন- সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার যে ডাক দিয়েছিলেন তা অবিস্মরণীয়। সেদিন তার বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' এই অমর আহ্বানেই স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিপীড়িত কোটি বাঙালি। সেই মন্ত্রপূত ঘোষণায় বাঙালি হয়ে উঠেছিল লড়াকু এক বীরের জাতি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বা ইনডেমিনিটি আইন বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার এবং ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মামলা করেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল তৃতীয় বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিম ২৫ দিন শুনানির পর অভিযুক্ত ১২ জনের মৃতু্যদন্ডাদেশ নিশ্চিত করেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বাদী- বিবাদীর আপিলের প্রেক্ষিতে চার দফায় রায় প্রকাশ হয়, সর্বশেষ আপিল বিভাগ ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর থেকে টানা ২৯ কর্মদিবস শুনানি করার পর ১৯ নভেম্বর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে এরই মাধ্যমে ১৩ বছর ধরে চলা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের আইনি ও বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তারা হলেন- লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি), লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)। ২০২০ সালের ৭ এপ্রিল ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১২ এপ্রিল তার মৃতু্যদন্ড কার্যকর করা হয়। ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতে গ্রেপ্তার হন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। ২০০১ সালের ২ জুন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুল আজিজ জিম্বাবুয়েতে মারা যান বলে কথিত আছে। তবে তার মৃতু্য নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। এ ছাড়া এখনো ১২ জনের মধ্যে চারজন বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। পলাতকরা হলেন- কর্নেল খন্দকার আব্দুল রশিদ, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী, লে. কর্নেল এসএইচ নূর চৌধুরী। আজকের দিনে বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পরীক্ষিত বাঙালি। বাঙালি জাতির মঙ্গল কামনায় উৎসর্গ করেছেন তিনি তার সারাটি জীবন। আজ ১৫ আগস্ট পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই মহান বাঙালিকে, যার পরিচয়ে বাঙালি পরিচিত। আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সামনে রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ নিতে হবে। জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে দেশ নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উদীয়মান শক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই ধারায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে অগ্রসর হতে হবে সামনের দিকে। ভালো থাকুক ৩০ লাখ শহিদ ও জাতির পিতার পরিবারের রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের এই মানচিত্রটি। এস এম খালিদ হোসেন : শিক্ষক ও গবেষক, আর্মি আইবিএ সাভার (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস) ংসশযড়ংংধরহ১৯@মসধরষ.পড়স

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে