রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

গোল্ডেন মনির একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাকারবারি ও ভূমির দালাল : র‌্যাব

গোল্ডেন মনির একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাকারবারি ও ভূমির দালাল : র‌্যাব

অবৈধ অস্ত্র ও মাদকসহ রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় গাড়ি ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। রাতভর অভিযানের পর শনিবার বেলা দুপুরে ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করেন র‌্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তিনি মূলত একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাকারবারি এবং ভূমির দালাল। তার একটি অটোকার সিলেকশন শোরুম আছে। পাশাপাশি রাজধানীর গাউছিয়ায় একটি স্বর্ণের দোকানের সাথে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। আমরা তার বাসা থেকে অনুমোদনবিহীন বিলাসবহুল দুটি বিদেশি গাড়ি জব্দ করেছি, যার প্রত্যেকটি দাম প্রায় তিন কোটি টাকা। এর পাশাপাশি কার সিলেকশন শোরুম থেকেও আমরা তিনটি বিলাসবহুল অনুমোদনবিহীন গাড়ি আমরা জব্দ করেছি।

অভিযান সম্পর্কে আশিক বিল্লাহ বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব-৩ এর একটি দল শুক্রবার দিবাগত রাত ১১টায় মেরুল বাড্ডা ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় অবস্থান নেয়। অভিযানের মূল কারণ ছিল অবৈধ অস্ত্র ও মাদক। মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতারের পর তার হেফাজত থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, কয়েক রাউন্ড গুলি, বিদেশি মদ এবং প্রায় ৯ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যায়। তার বাসা থেকে আট কেজি স্বর্ণ ও নগদ এক কোটি ৯ লাখ টাকা নগদ জব্দ করা হয়েছে।

গোল্ডেন মনির ওরফে মো: মনির হোসেন সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ অবৈধপথে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন গোল্ডেন মনির। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে তার স্বর্ণ চোরাকারবারের রুট ছিল ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত। এসবই তিনি করেছেন ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে। যেখানে তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির।

আশিক বিল্লাহ বলেন, গ্রেফতারকৃত মনির ১৯৯০ এর দশকে রাজধানীর গাউছিয়ায় একটি কাপড়ের দোকানের কর্মচারী ছিলেন। সেটা ছেড়ে দিয়ে তিনি রাজধানীর মৌচাকে ক্রোকারিজের একটি দোকানে কাজ শুরু করে পরবর্তী সময়ে তা নিজ ব্যবসায় রূপ দেন। ওই ব্যবসা করতে করতে লাগেজ ব্যবসা শুরু করেন। তিনি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে কাপড়, কসমেটিকস, ইলেকট্রনিকস পণ্য, কম্পিউটার সামগ্রী, মোবাইল, ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বিদেশ থেকে দেশে আনতেন। এভাবে একপর্যায়ে তিনি স্বর্ণ চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বায়তুল মোকাররমে একটি জুয়েলারি দোকানও দেন। যে দোকানটি তার চোরাকারবার করার কাজে লাগত। এভাবে মনির থেকে তিনি হয়ে ওঠেন গোল্ডেন মনির। এভাবে তিনি মোট এক হাজার ৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। স্বর্ণ চোরাকারবারে জড়ানোয় ২০০৭ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়।

আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘গোল্ডেন মনিরের বাসায় অভিযান চালিয়ে ৬০০ ভরি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। এই স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় আট কেজির মতো। আমরা জানতে পেয়েছি গাউছিয়ার একটি স্বর্ণের দোকানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।’

গোল্ডেন মনিরের আরেকটি পরিচয় তিনি ভূমিদস্যু। রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। ঢাকা শহরে ডিআইটি প্রজেক্টের পাশাপাশি বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় তার দুই শতাধিক প্লট আছে। ইতোমধ্যে তিনি তার ৩০টি প্লটের কথা র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, রাজউকের কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি করে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ করেছেন এবং স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৫০ কোটি টাকা। আমরা প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন, বিআরটিএ, মানি লন্ডারিংয়ের জন্য সিআইডি এবং ট্যাক্স ফাঁকি ও এ-সংক্রান্ত বিষয়ে এনবিআরকে অনুরোধ জানাব। মূলত তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ অর্থাৎ অনুমোদনবিহীন বিদেশি মুদ্রা রাখায় বাড্ডা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা দায়ের করবে র‌্যাব। পাশাপাশি অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে আশিক বিল্লাহ বলেন, মূলত ফৌজদারি অপরাধের কারণে অর্থাৎ অনুমোদনবিহীন বিদেশি অস্ত্র ও মাদক রাখার অপরাধে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তার এই আইনবহির্ভূত আয়-উপার্জন অর্থসম্পদ গড়াসহ কারা কারা জড়িত, যোগসাজশ এবং সহযোগিতা করেছে সেটি তদন্ত করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানাবে র‌্যাব। তার অর্থ-সম্পদ গড়ার পেছনে এনবিআর, বিআরটিএ, রাজউকের কোন কোন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা বা যোগসাজশ রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অনুরোধ জানাব।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গোল্ডেন মনিরের সাথে প্রাথমিকভাবে আমরা একটি রাজনৈতিক দল ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে জানতে পেরেছি। সেই দলটিতে তিনি অর্থের জোগান দিতেন। মো. মনিরের বিরুদ্ধে দুটি মামলা ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে- একটি মামলা হচ্ছে রাজউক সংক্রান্ত। রাজউকের ভুয়া সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতি ভূমিদস্যুতা এবং আরেকটি হচ্ছে দুদকের একটি মামলা চলমান। গোল্ডেন মনিরকে এখন র‌্যাব-৩ কার্যালয় হেফাজতে নেয়া হচ্ছে। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd


উপরে