logo
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৩ আশ্বিন ১৪২৭

  সরকার মাসুদ   ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

ধ্রম্নপদী সাহিত্যের পাঠকভাগ্য

ধ্রম্নপদী সাহিত্যের পাঠকভাগ্য
আত্মবিশ্বাসী সৃষ্টিশীল লেখক মাত্রই যতটা না তার সমকালের, তার চেয়ে বেশি অনাগত কালের পাঠকের ওপর ভরসা করে থাকেন। এর অর্থ লেখক যেমন তার লেখালেখি নিয়ে মাথা ঘামান, তেমনি সেসব লেখার পাঠকভাগ্য নিয়েও ভাবেন। জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ রাজনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে সাধারণত চিন্তা করেন। এদের ভেতর ছোট একটি অংশ সাহিত্যের পাঠক। বাদবাকি মানুষ সাহিত্যকে অবজ্ঞা করেন আমি তা বলব না, কিন্তু তাদের এ ব্যাপারে উৎসাহ ক্ষীণ এবং ভাসা ভাসা একথা জোর দিয়েই বলা যায়।

সাহিত্যের প্রতি লোকজনের আগ্রহ কখনো কখনো তীব্র হতে পারে, হলেও তা হয় আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী। ধরা যাক, কুড়ি বছর আগে প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের কোনো একটি উপন্যাসকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তুলে দিয়েছিল যে পাঠকবর্গ তাদের যদি জিজ্ঞেস করা যায়,ওই বইটি সম্বন্ধে তারা এখন কী ভাবছেন, আমার মনে হয় না উচ্ছ্বাসপূর্ণ কোনো জবাব মিলবে। আবার এটা হওয়াও বিচিত্র নয় যে, ওই পাঠকদেরই একটা বড় অংশ ওই উপন্যাসটির কথা ভুলেই গেছে। জনপ্রিয়তা সংক্রামক ব্যাধির মতো। ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে না। কেননা, জনপ্রিয় সাহিত্যের পাঠক কেবল তার ভোক্তাই নয়, মুগ্ধ প্রচারকও।

পাঠকের মধ্যেও রকমফের আছে। যারা সাহিত্যের পাঠক, আগেই লিখেছি, তারা সংখ্যালঘু। তো সাহিত্য নিয়ে এই সংখ্যালঘুদের এত মাতামাতির কারণ কি? কারণটা বোধ হয় এই যে, এরা সাহিত্য নামক পদার্থের ভেতর দীর্ঘস্থায়ী আনন্দের উপাদান খুঁজে পান। আর এই প্রাপ্তিই তাদের সাহিত্যের প্রতি উৎসাহকে ধরে রাখে। জনপ্রিয় লেখক সম্বন্ধে হাসান আজিজুল হক একটা মজার কথা বলেছেন। তার মতে জনপ্রিয় লেখক হচ্ছেন ময়রার মতো। ময়রার মতো কেন? তার কারণ ময়রা সেই মিষ্টিই বারবার তৈরি করে- যার চাহিদা ব্যাপক। অনুরূপভাবে জনপ্রিয় সাহিত্যিকও ওইসব বিষয়বস্তু নিয়ে লেখেন, লিখেই চলেন, পাঠক সাধারণত যেগুলো খুব পছন্দ করেন। জনপ্রিয় সাহিত্যের মধ্যেও পার্থক্য আছে। দেশ ও পরিবেশভেদে তার রূপ বেশ ভালো করেই বোঝা যায়। ডি এইচ লরেন্স ও গ্রাহাম গ্রিন উভয়েই গ্রেট ব্রিটেনের জনপ্রিয় উপন্যাসিক ছিলেন। ছিলেন আমাদের শরৎচন্দ্রও। ইংল্যান্ডে শিক্ষিতের হার এবং গড়পড়তা পাঠরুচি আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত এযুগে এবং সেযুগেও। সুতরা, সিরিয়াস বিষয়বস্তুকে উপজীব্য করে সাহিত্য রচনা করলেও একজন লরেন্স কিংবা একজন গ্রিনের পক্ষে জনপ্রিয় লেখক হয়ে ওঠা সে দেশে সম্ভব ছিল। বাংলাদেশে তা সম্ভব নয়। এখানে তো প্রণব ভট্টের মতো লেখকের বইও বেশ বিক্রি হয়েছে এক সময়। পুরোপুরি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার আগেই তার অকালমৃতু্য হয়। নতুবা এতদিনে তাকেও হয়তো বইমেলায় অটোগাফ শিকারিদের কবলে পড়তে হতো, হুমায়ূন আহমেদের মতোই। আর অটোগ্রাফ শিকারি পাঠকরা, বলতে বাধ্য হচ্ছি, বাস করেন এক অন্ধকার জগতে, যেখানে চিরায়ত সাহিত্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ওই পাঠকদের মধ্যে এক ধরনের অন্ধতা তৈরি হয়। তারা দেখতে পান না তাদের আরাধ্য লেখকদের বাইরেও কিছু লেখক আছেন যারা পাঠকপ্রিয় নন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী অতিবাহিত হলো; অথচ লেখাপড়া জানা বিশাল জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ এখনো সুরুচি অর্জন করতে পারল না, জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই।

খ্যাতি এবং লেখকের রচনার মূল্য দুটি আলাদা আলাদা জিনিস। একটি লেখার সাহিত্যমূল্য কখনোই তার লেখকের বিখ্যাতি দ্বারা নিরূপিত হয় না। তা ছাড়া খ্যাতির বিড়ম্বনার শিকার শুধু লেখক হন না, হয় তার রচিত গ্রন্থও। সবাই জানি, পাঠকপ্রিয় লেখকদের গ্রন্থ প্রকাশিত হয় প্রতি বছরেই, অনেক সময় একই মৌসুমে একাধিক গ্রন্থও। এমন পরিস্থিতিতে লেখকের অন্ধ ভক্তরাও দ্বিধান্বিত হন, তারা কোনটা কিনবেন। উপরন্তু, এ ক্ষেত্রে, একটি বইয়ের বিক্রি হওয়া আরেকটি বইয়ের বিক্রি কম হওয়ার ওপর প্রভাব ফেলে। অজনপ্রিয় লেখক এবং ধ্রম্নপদী সাহিত্যের স্রষ্টাদের বেলায় এই সমস্যা নেই। তাদের বইয়ের সংখ্যা তুলনামূলক হিসেবে অনেক কম। এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এত কমসংখ্যক বই নিয়ে একজন সিরিয়াস বা ক্লাসিক্যাল লেখক কিভাবে তার অর্জিত সুনাম রক্ষা করেন। উত্তর হচ্ছে, এ ধরনের লেখকদের সুনাম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠকদের বিচারের ওপর নির্ভর করে না। সংখ্যায় অনেক কম, কিন্তু আপন সুরুচি ও বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল পাঠকবৃন্দই বন্দনা করে চলেন ক্লাসিক লেখকদের রচনা। এভাবে তারা ওই লেখকদের উঁচু ইমেজটিকে টিকিয়ে রাখেন যুগের পর যুগ। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে মনে পড়ছে। তিনি যে বড় মাপের কথাসাহিত্যিক এটা দেশবাসী জানতে পারে তার অকাল মৃতু্যর পর, তাও প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে! জীবদ্দশায় তিনি সাফল্য পেয়েছেন; অন্যান্য গুণী লেকক এবং বিদগ্ধ পাঠকসমাজ তার সৃষ্টির গুণকীর্তন করেছেন এটা ঠিক। আবার এটাও ঠিক, সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক রাহাত খান কিংবা হাসনাত আব্দুল হাইয়ের মতো দ্বিতীয় শ্রেণির লেখকদের যতখানি প্রশংসা করেছেন, ইলিয়াসকে এতখানি করেননি। অনেকেই তো তাকে বুঝতেই পারেননি বা এখনো পানের না। এর ভেতর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাহিত্য পড়ান এমন ব্যক্তিও আছেন!

মেধাবী পাঠকশ্রেণির গভীর ও সজীব আগ্রহই ধ্রম্নপদী লেখকদের গ্রন্থ পুনর্মুদ্রণে উৎসাহিত করে। এভাবে তাদের বারবার পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। মননশীল পাঠকরা আরেকটি কাজ করেন। তা হচ্ছে প্রতিভাবান লেখক খুঁজে বের করা, তাদের পুনর্মূল্যায়ন করা। যে লেখকরা মৃতু্যর পর স্বীকৃত হয়েছেন অসাধারণ সাহিত্যিক হিসেবে, তাদের ক্ষেত্রেও ওই সংখ্যালঘু পরিশ্রমী পাঠকদের অবদান অস্বীকার্য। তারা যেমন কীর্তিমান লেখকদের 'কাজ'কে নিজেরা ভোলেন না, তেমনি অন্যদেরও ভুলতে দেন না। তাদের অনিঃশেষ উদ্যম ও জেদের কারণে সাধারণ পাঠকরা কৃতী লেখকদের নাম শুনতে অভ্যস্ত হন, কখনো বা তাদের একটা/দুটো বই কেনেন। শেষ পর্যন্ত তাদের কীর্তির উচ্চতাকে মেনে নেন বিনা তর্কে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক সম্প্রদায় একজন মামুলি লেখককে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে বটে, তাদের জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রাখার বেলায় তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। সে জন্য আমরা দেখি মৃতু্যর পর জনপ্রিয় লেখকদের ভাবমূর্তি ক্রমশ ফিকে হতে থাকে। চার্লস ডিকেন্স, শরৎচন্দ্র কিংবা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো লেখকরা ব্যতিক্রম। সাহিত্যের পাঠক সাহিত্য নামক বস্তুর মধ্যে পেয়ে যান স্বল্পস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী আনন্দ। একটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থপাঠের মধুর স্মৃতি সাহিত্যের প্রতি তাদের উৎসাহকে বাঁচিয়ে রাখে। বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সমান্তরালে তাদের রুচিবোধও উন্নত হয়। শিল্প-সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে তারা আরও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন। তখন কোনো গ্রন্থ যদি তাদের কাছে সস্তা ও একঘেয়ে মনে হয়, গড়পড়তা পাঠকদের নিরন্তর স্তুতিও তাদের ওই বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারবে না যে, বইটি মানসম্পন্ন এবং পাঠ্য নয়।

একটি উৎকৃষ্ট বইয়ের অত্যাবশ্যক গুণগুলো কি কি? এক কথায় উত্তর দেয়া অসম্ভব। তবে এটা বলা যায়, সেই বইয়ে থাকা চাই সৌন্দর্যবোধ, প্রজ্ঞা, অন্তর্দৃষ্টি, কৌতুকচেতনা ও জ্ঞানের সারাৎসার। এই সমস্ত কিছু থাকলেও বইটি ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি না শেষ পর্যন্ত তা সুলিখিত হয়। অন্যদিকে গদ্য বা কাব্যভাষা যদি আকর্ষণী হয়ও, প্রাগুক্ত ধারণাসমূহের যথাযথ প্রয়োগ না ঘটাতে পারলে একটি গ্রন্থ সমৃদ্ধ হতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠকবৃন্দের এসব বিষয়ে ধারণা নেই বা থাকলেও তা ভাসা ভাসা। মনে রাখতে হবে, জনপ্রিয় সাহিত্যের সমকালিক পাঠকরা প্রধানত আবেগী পাঠক। তারা নিচুমানের বইপড়ার ভেতর দিয়ে তাদের অশুভ আগ্রহের পরিচর্যা করে চলেন। খাটো লেখকদের প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে এরা ওস্তাদ।

আমি এমন অনেক ব্যক্তির কথা জানি, যাদের পেশাগত ও সামাজিক ব্যস্ততা এত বেশি যে, তারা পড়ার সময় পান না, কিছুটা পেলেও আগ্রহের অভাব আছে। এই লোকগুলো সুশিক্ষিত নয় অথচ তাদের সেল্ফে দেখা যাবে রবীন্দ্র রচনাবলি, শেক্সপিয়ারের নাটক বা জীবনানন্দ সমগ্র। কারণ কি? কারণ যুগের পর যুগ এই লেখকদের গুণকীর্তন করা হয়েছে। আর ওই ব্যক্তিরা তা শুনেছেও। শুনতে শুনতে এক সময় বিশ্বাস করেছে যে, এরা মহৎ লেখক। পড়া হোক না হোক এদের রচিত গ্রন্থ ড্রয়িংরুমে রাখাটাও একটা মর্যাদার বিষয়। তা আভিজাত্যের প্রতীকও বটে।

ধ্রম্নপদী সাহিত্যের সব বই-ই যে সবাইকে আনন্দ দেবে এমন কোনো কথা নেই। কেউ মার্শেল প্রম্নস্ত পড়ে মজা পাবেন, কেউ বিভূতি ভূষণ। হেনরি জেমস বা কমল কুমার মজুমদারের লেখার ভেতর যদি কেউ ঢুকতে না পারেন সেটা ওই লেখকদের দোষ নয়, দোষ পাঠকের। যথেষ্ট প্রস্তুতি না নিয়ে এ ধরনের লেখকদের রচনার দিকে অগ্রসর না হওয়াই উচিত তাদের। কৌতূহল না থাকলে মনোসংযোগ সম্ভব নয়। শিল্প-সাহিত্যে প্রকৃত কৌতূহল সৃষ্টি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক এষণা থেকে এবং কৌতূহলের প্রেরণাশক্তি পাঠককে এগিয়ে দেয় নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের পথে।

ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য মানেই উঁচু দরের সাহিত্য। নতুবা বহু যুগ পাড়ি দেয়ার পরেও তার সুনাম টিকে থাকে কি করে? ক্লাসিক সর্বদাই উঁচু দরের পাঠকদের নির্মল আনন্দ দেয়। সংখ্যাগুরু জনপ্রিয় সাহিত্যের বিশাল পাঠকগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশও ওই আনন্দের স্বরূপ উপলব্ধি করে। নিছক শিল্পের বা নৈতিকতার প্রয়োজন মেটাতে ক্লাসিক টিকে থাকে না। তা টিকে থাকে মুখ্যত চিরায়ত অনুভবের অনবদ্য রূপায়ণের জন্য। পাঠক ওইসব অনুভবকে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলাতে পারেন। তাদের সীমাহীন কৌতূহল ধ্রম্নপদী সাহিত্যের মূল্যবান গ্রন্থসমূহকে পুনরাবিষ্কার ও পুনর্মূল্যায়নে নিয়োজিত রাখে। সে জন্য তারা টিকে থাকে তাদের পাঠকভাগ্য নিয়ে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে