logo
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৪ আশ্বিন ১৪২৭

  আবু আহমেদ   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

যে কারণে অর্থনীতিতে বন্ড মার্কেট গড়ে ওঠেনি

যাদের অর্থ আছে তারা বিভিন্নভাবে অর্থকে অর্থনীতির বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে যেটা আছে সেটা হলো সরকারি বন্ড। সঞ্চয়পত্রগুলোকেও এক ধরনের বন্ড বলা চলে, যদিও এগুলোরও সেকেন্ডারি বাজার নেই। এগুলোর ক্রেতার অভাব নেই। কারণ হলো- এগুলোর ইসু্যয়ার হলো সরকার। সবাই ভাবে সরকার সুদ বা আসল অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হবে না। তাই সরকার যদি ১-৯.৫% সুদ কমিয়েও দেয় তাহলেও সঞ্চয়পত্র কেনার লোকের অভাব হবে না। তার বিপরীতে আমাদের করপোরেট হাউসগুলো যদি এর থেকে ২৫-৩০% সুদ বেশিও দেয় তাহলেও কি তারা তাদের বন্ড বেচতে পারবে? আমার তো মনে হয় না। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে অবিশ্বাসের আবহ এমন প্রবলভাবে অব্যবহিত হচ্ছে। সবাই সবখানে সঙ্গে করে।

বন্ড মার্কেটটাকে কার্যকরভাবে চালু করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিরাসহ অন্য নীতি-নির্ধারকরা যেন নড়েচড়ে বসেছেন। প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমে দেখি এই নিয়ে বৈঠক হচ্ছে। মনে হয় এতদিনে তারা বুঝলেন এই বাজার প্রয়োজন এবং এই বাজারকে যুতসই আকারে চালু করতে হবে। তবে এই চালু করার ইসু্যটি অনেক পুরনো। মাঝেমধ্যে ইসু্য হিসেবে পিছনে চলে যায়, মাঝেমধ্যে সামনে আসে। তবে সত্য হলো- এর পিছনে অনেক প্রজেক্টস নিয়ে অর্থ ব্যয় করা হলেও অর্থনীতিতে তথা পুঁজি বাজারের অংশ হিসেবে বন্ড বা ঋণপত্রের বাজার গড়ে ওঠেনি। প্রায় ১৫ বছর আগে বন্ড চালু করার একটা সেমিনারে সাভারের ব্র্যাক সেন্টারে আমিসহ অন্য অনেক বিজ্ঞজন অংশগ্রহণ করেছিল। সেই পুরনো অনেকটা জানা বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা হলো, ভেবেছিলাম আলোচনাটা যখন হচ্ছে এর একটা ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু আজতক কোনো ফলই নজরে এলোই না। ওই প্রজেক্ট ছিল সময়মতো বিশ্বব্যাংকের (ডড়ৎষফ ইধহশ) অর্থায়নে। বিশ্বব্যাংক এই দেশের অর্থনীতিতে অনেক প্রজেক্ট নিয়েছে। কোথাও ফল যদি একটু অর্জিত হয় সেটা পরে ভেস্তে গেছে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আমাদের জন্য কি করতে পারে, আমরা যদি কাজটা না করি। তারা সুন্দর, সুন্দর কাগজ বা প্রজেক্ট রিপোর্টস তৈরি করে দিয়ে তাদের কমিশন ফি নিয়ে চলে যাবে। তাদের প্রস্তুতকৃত কাগজগুলো সরকারি কর্মকর্তাদের টেবিল-আলমারিতে থাকতে থাকতে একদিন অপ্রয়োজনীয় কাগজ হয়ে যাবে। নতুন প্রশাসন এসে আবার নতুন প্রকল্প নেবে। তারাও হলো ঋণ বিক্রেতা। তারা নতুন নামে সেই পুরনো প্রজেক্ট আবার শেষ করবে। নতুন কিছু লোক পরামর্শক হিসেবে আবার সেগুলোতে যুক্ত হবে। এমনও দেখা গেছে, কিছু কাজের জন্য কোনো প্রজেক্ট পরামর্শকের দরকার নেই। তবুও আমরা নেয়ার খাতিরে ওইসব ঋণ বা প্রজেক্ট তাদের থেকে নিয়েছি। সেই পুরাতন অনুশীলন আবার চলতে থাকবে। ইতোমধ্যে শিক্ষার উদ্দেশ্যে কিছু লোকের বিদেশ ভ্রমণ হবে, প্রকল্পের জন্য গাড়িও কেনা হবে, আরও কত কি। এভাবেই চলছে আমাদের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বৈদেশিক সূত্র থেকে কারণে-অকারণে স্বল্প সুদে হলেও ঋণ গ্রহণ। বন্ড মার্কেট তো অন্য অনেক দেশেই আছে। তারা কি সব সময় হাইপরামর্শকদের পরামর্শ নিয়ে এই বাজার চালু করেছে? কিন্তু ব্যাপার আছে সেগুলো বিদেশি পরামর্শকরা কিছুতেই তাড়াতে পারবে না। তারা অনেক দেশেই কাজ করেছে কখনো বন্ডবাজার চালু করার ক্ষেত্রে, কখনো অ্যাসেট লাভের অন্য হাতিয়ারের ক্ষেত্রে। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থাটা তাদের জন্য একটু ভিন্ন বৈকি। তারা কি আমাদের ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে যে অভিজ্ঞতা আছে তা দূর করতে পারবে? পারবেন, যদি ক্রেতা বন্ডের ইসু্যয়ার বা বিক্রেতাকে বিশ্বাসই না করে তাহলে বন্ড মার্কেট চালু হবে কি করে? বন্ড তো হলো এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্র যে পত্র সাধারণত একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ দেবে বলে। সুদ দেয়ার প্রতিজ্ঞা ছাড়াও বন্ড ইসু্য করা যেতে পারে। সেটা হবে কেনার সময়েই ক্রেতা ইসু্য মূল্যের বা অভিহিত মূল্যের (চবৎাধষঁব) চেয়ে কমে কিনবে, মেয়াদান্তে ইসু্যয়ার পূর্ণ অর্থ ক্রেতাকে বা গড়পত্রে এই বন্ড তাকে ফেরত দেবে। যদি ফেরত না দেয় তাহলে কি হবে? যা বন্ডের ক্ষেত্রে তা হতে পারে। এটা যখন ফেরত দেবে তখন সুদ-আসল ঠিকমতো হিসাব করে পুরোটাই ফেরত দেবে। বন্ডের ক্ষেত্রে জামানত কি? জামানত হলো যে করপোরেট সংস্থা বন্ড ইসু্য করবে সেই করপোরেট সংস্থার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। সাধারণত পাওনার ক্ষেত্রে বন্ড হোল্ডারেরা কোম্পানির প্রদেয় থেকে অন্য দাবিদারদের থেকে আগে পাবে। ন্ড সুদ দেয়। যারা সুদ আয় চায় তারা বন্ড কেনে, আবার মূলধনপ্রাপ্তি দেখলেই মেয়াদপুর্তির আগে বেঁচেও দেয়। বেঁচার জন্য যুতসই একটা সেক্রেন্ডারি বাজার দরকার, সেটা বাংলাদেশে আজতক গড়ে ওঠেনি। সব করপোরেট হাউস একই মেয়াদের বন্ডের জন্য একই সুদহার অফার করে দেয়। যেসব করপোরেট হাউসের উপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা আছে সেসব হাউস অপেক্ষাকৃত কম সুদ প্রদান করে বন্ড বিক্রয় করতে পারে। যাদের ওপর আস্থা নেই তাদের বন্ডের জন্য ক্রেতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বন্ডেরও রেইটিং (জধঃরহম) হয়। কোন বন্ড অঅঅ গ্রেডের। মানে ক্রেতারা বন্ড বুঝে কিনতে পারে। জাঙ্ক (ঔঁহশ) বন্ডের ৭.৬ ক্রেতা পাওয়া যায় না। তবে অনেক বিনিয়োগকারী এসব বন্ডেরও জুয়ার বাজি ধরতে রাজি হয়ে যায়। যদি কোনো দিন ব্যবসায় সুদিন আসে তাহলে ওই জাঙ্ক বন্ড ধারণকারীরা অনেক লাভবান হয়। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বন্ড বাজার নেই। নাই স্বর্ণকে এডাপ্টেড বা সম্পদ হিসেবে ধারণ করার বাজারও। এই অর্থনীতিতে আনুষ্ঠানিক কোনো ঋঁঃঁৎব বাজারও নেই। ফলে সম্পদ ধারণ করার অবস্থানগুলো এই অর্থনীতিতে অতি সীমিত। আমাদের দেশ থেকে যে কিছু লোক ব্যাংক বা শেয়ার বাজার লোপাট করে অর্থকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে তার অন্যতম কারণ হলো আমরা সম্পদ ধারণের বাজারের বিস্তৃতি করতে পারিনি। আমরা অনেক ক্ষেত্রে অ্যাসেট ধারণকে বেআইন ঘোষণা করে বসে আছি।

ফলে যাদের অর্থ আছে তারা বিভিন্নবাবে অর্থকে অর্থনীতির বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে যেটা আছে সেটা হলো সরকারি বন্ড। সঞ্চয়পত্রগুলোকেও এক ধরনের বন্ড বলা চলে, যদিও এগুলোরও সেকেন্ডারি বাজার নেই। এগুলোর ক্রেতার অভাব নেই। কারণ হলো- এগুলোর ইসু্যয়ার হলো সরকার। সবাই ভাবে সরকার সুদ বা আসল অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হবে না। তাই সরকার যদি ১-৯.৫% সুদ কমিয়েও দেয় তাহলেও সঞ্চয়পত্র কেনার লোকের অভাব হবে না। তার বিপরীতে আমাদের করপোরেট হাউসগুলো যদি এর থেকে ২৫-৩০% সুদ বেশিও দেয় তাহলেও কি তারা তাদের বন্ড বেচতে পারবে? আমার তো মনে হয় না। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে অবিশ্বাসের আবহ এমন প্রবলভাবে অব্যবহিত হচ্ছে। সবাই সবখানে সঙ্গে করে। সেই জন্যই বলছি এই অর্থনীতে করপোরেট খাত চালু করার বিষয়টি অত সহজ হবে না। তবে সরকার যদি ১-২% বেশি সুদ দিতে প্রকল্পভিত্তিক বন্ড ছাড়তে চায় সেসব বন্ডের ক্রেতা পাওয়া যাবে। বন্ড বাজার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে ব্যাংকগুলো, মেয়াদি ঋণ বিক্রয় করার দ্রতসেবীতা। এই ঋণের ক্রেতা জানে পরে সব ঋণ ফেরত না দিলেও চলবে। তাই সে যে কোনো সুদে ব্যাংক থেকে টার্ম লোন দিতে আগ্রহী। যতদিন আমাদের ব্যাংকগুলো টার্ম লোন বেচার জন্য দোকান খুলে বসে থাকবে ততদিন অনেক লোক ব্যক্তি খাতের বন্ড বাজার (নড়হফ সধৎশবঃ) গড়ে উঠবে তা আশা করতে পারি না। বিশ্বে যতখানেই বন্ড বাজার গড়ে উঠেছে ওই সব দেশের ব্যাংকগুলো অত অকাতরে টার্ম লোন বেচে না। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি যে এমন পাহাড়সম উঁচু হয়ে সমাধানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, বিপদেও সেই একই কারণ ব্যাংকগুলো কর্তৃক টার্ম লোন নিবে। আসলে সবাই আগ্রহে অপেক্ষা করছে ঋণখেলাপির এই সমস্যা বাংলাদেশ কীভাবে করে। মাফ করে দিয়ে যে সমাধানের কথা বলা হচ্ছে তার বলির পাঁঠা কে হচ্ছে। সেই জনগণ নয়কি যাদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলে চলেছে? বর্তমানের অবস্ায় অর্থ বাজার চলতে থাকলে বন্ড বাজার নিয়ে কথা বলা যাবে, তবেই বাস্তবে কিছুই হবে না।

আবু আহমেদ

অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে