সুশাসনের অভাবে গণতন্ত্রের পথ অমসৃণ হয়েছে

এ জন্য প্রয়োজন নির্বাচনব্যবস্থা স্বচ্ছ, অবাধ, গ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের করা। রাজনীতি কল্যাণমুখী করা; কিন্তু বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এর বিপরীত কাজগুলোই হচ্ছে। যদি তা না হতো তাহলে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সুখদ গণতন্ত্রের আলোয় আলোকিত হয়ে হিংসা-প্রতিহিংসার পরিবর্তে জনস্বার্থ এবং জাতীয় স্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠত।
সুশাসনের অভাবে গণতন্ত্রের পথ অমসৃণ হয়েছে

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল- এ কথা বলা যাবে না। রাজনীতিতে এক ধরনের গুমোটভাব বিরাজ করছে। স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মুক্ত মতের প্রতিফলন ঘটানো যেখানে কঠিন, সেখানে এরকম অবস্থাই বিরাজ করবে। তবে এর চূড়ান্ত পরিণতি ভালো হওয়ার কথা নয়। দেশে অবাধ রাজনীতির পথটা মোটেও মসৃণ নয়। এর পক্ষে যত কথাই বলা হোক না কেন, বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে এবং সচেতন মহল মাত্রই এ সম্পর্কে সবই জ্ঞাতও। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাসূত্র মোতাবেক যদি আমাদের রাজনীতিকরা বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালকরা চলতেন, তাহলে নির্বাচনের কথাই যদি বলি, তা অস্বচ্ছ চিত্র দেখা যেত না।

ইংল্যান্ডের প্রথিতযশা কবি জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১) তার ঊহফুসরড়হ গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছেন : 'অ :যরহম ড়ভ নবধঁঃু রং ধ লড়ু ভড়ৎ বাবৎ :/ওঃং ষড়াবষরহবংং রহপৎবধংবং; রঃ রিষষ হবাবৎ/ঢ়ধংং রহঃড় হড়ঃযরহমহবংং.' অর্থাৎ 'একটি চমৎকার জিনিস সব সময়ের জন্য আনন্দদায়ক/এর চমৎকারিত্ব বৃদ্ধি পেতেই থাকবে/কোনো দিন তা অর্থহীন হয়ে উঠবে না।' কবি জন কিটসের এই লাইনগুলো ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত এবং এর প্রথম পঙ্‌ক্তিটি লাখ লাখ ব্যক্তি উদ্ধৃত করেছেন কারণে অথবা অকারণে। আমিও এই লেখাটি শুরু করছি জন কিটসের অমর এই লাইনগুলো উদ্ধৃত করে।

আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটানা দীর্ঘদিন ভালো থেকেছে- এমন নজির কম। একমাত্র গণতন্ত্রই সবার আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে। সারাজীবনকে স্পর্শ করে। সবার জন্য রচনা করে এক বলিষ্ঠ জীবনবোধ। একবার এই চমৎকার জিনিসটির মূল সমাজজীবনের গভীরে প্রবেশ করলে সব সময়ের জন্য এর চমৎকারিত্ব দ্রম্নতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং হিংসা-প্রতিহিংসার মতো রূঢ়, অমানবিক-অনাকাঙ্ক্ষিত চেতনা মাটির সঙ্গে মিশে গেলে সমগ্র জাতির জন্য অনাবিল আনন্দের আবহ সৃষ্টি করবে। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর আমাদের রাষ্ট্র পরিচালক, রাজনীতিবিদ, রাজনীতির নীতিনির্ধারকরা কতটা নিষ্ঠ ছিলেন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের ক্ষেত্রে? স্বাধীনতার কয়েক বছর পরই গণতন্ত্রের পথ অমসৃণ হয়ে গেল। নব্বই-পরবর্তী নতুন করে আশার সঞ্চার ঘটেছিল। কিন্তু তাও হোঁচট খেল। গণতন্ত্রের পথ মসৃণ করার কথা সবাই বলেছেন, বলছেন; কিন্তু এরপর সমস্যা-সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। গণতন্ত্রের নামে যা চলছে, তা কোনোভাবেই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সূত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদি তাই হতো, তাহলে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত চিত্র আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হতো না। গণতন্ত্রের লেবাসে স্বৈরতন্ত্র কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, এই অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে। সামাজিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের রমণীয়তা ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করলে এবং এর গভীরতা জাতীয় মননের সঙ্গে মিশে গেলে কোনো দিন তা আলগা হয়ে ভেদবুদ্ধি বা বিভাজনের করাল গ্রাসে অর্থহীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এ জন্য চাই জাতীয় নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি এবং সুস্পষ্ট এক ভিশন। দুই বা তিন যুগ পর আমরা দারিদ্র্য, অশিক্ষা, ব্যাধির মতো ব্যত্যয়ের ওপর কতটুকু বিজয় অর্জন করব বা সার্বিক অগ্রগতির পথে কতটুকু অগ্রসর হবো, এই দিকনির্দেশনার জন্য নেতৃত্বের সৃজনশীলতাই সেই খরতাপ। নেতৃত্বের দৃষ্টি যদি স্বচ্ছ হয়, তাহলে হিংসা-প্রতিহিংসা-আবর্জনা রাজনৈতিক জীবনকে আর কলঙ্কিত করবে না। আলো যদি উজ্জ্বল হয়, তাহলে দুর্নীতির অভিশাপ অর্থনীতির গতি মন্থর করবে না। সন্ত্রাসের কালো ছায়ায় সমাজজীবনের মৌল সূত্রগুলো আর আচ্ছন্ন হবে না। অতীতমুখী প্রবণতা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নকে আর আবছা করতে পারবে না। সর্বোপরি সূর্যের খরতাপ এবং আলো অর্থাৎ আমাদের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যদি সমাজের সর্বস্তরে কার্যকর করতে হয়, তাহলে নতুন জীবনীশক্তির পরশমণির ছোঁয়ায় জাতির চিতশক্তিকে নতুনভাবে জাগ্রত করতে হবে।

এ জন্য প্রয়োজন নির্বাচনব্যবস্থা স্বচ্ছ, অবাধ, গ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের করা। রাজনীতি কল্যাণমুখী করা; কিন্তু বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এর বিপরীত কাজগুলোই হচ্ছে। যদি তা না হতো তাহলে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সুখদ গণতন্ত্রের আলোয় আলোকিত হয়ে হিংসা-প্রতিহিংসার পরিবর্তে জনস্বার্থ এবং জাতীয় স্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠত।

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হতো নতুনভাবে প্রাণবন্ত। এসব সত্য এড়ানোর পথ নেই। আমাদের রাজনীতিকরাও অবশ্যই এসব বোঝেন এবং জানেন। কিন্তু অন্তর দিয়ে এসব বিষয় কয়জন অনুভব করেন, এ নিয়ে কথা উঠতেই পারে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতীয় রাজনীতিকে সৃজনশীল ধারায় প্রবাহিত করতে অনুপ্রেরণা লাভ করবে। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দলীয় আনুগত্য পরিহার করে জাতীয় স্বার্থের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠবেন- এমনটাই কাম্য। অবশ্যই প্রত্যাশা করি, হাজারও শর্তে বিভক্ত জাতি আবারও ঐক্যবদ্ধ হবে। নিজেদের অধিকার উপভোগ করে জনগণ সার্বিক নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার সুফল ভোগ করবে। কিন্তু এর জন্য তো করণীয় রয়েছে অনেক কিছু, যা সংশ্লিষ্ট কারোরই অস্বীকারের পথ নেই। ভিন্নমতের দমন-পীড়ন গণতন্ত্রের সব মাধুর্য নষ্ট করে দেয় এবং এখানে তো হয়েছেও তাই।

অবশ্যই সত্য যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই সব প্রত্যাশার পূর্ণতা দিতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তো আকাশ থেকে টুপ করে পড়ার কোনো বিষয় নয়। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানারকম জটিলতা ছিল। সবার অংশগ্রহণে ওই নির্বাচনযজ্ঞ সম্পন্ন হোক, দেশ-বিদেশের সব মহলের এই প্রত্যাশা ছিল। শেষ পর্যন্ত নানারকম প্রতিকূলতা-প্রতিবদ্ধকতা ডিঙিয়ে ওই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনটি প্রশ্নমুক্ত করা যায়নি। দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক দাগটা আরও মোটা করল। অবস্থার ভিত যেটুকু ছিল তাও ধ্বংস করে দেওয়া হলো। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শ্রদ্ধাহীনতার বিষয়টি খুব অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পুষ্ট হয়ে উঠেছে। একটা কথা নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীন মহলের নীতিনির্ধারকরা স্বীকার করবেন বলে আশা করি, সমঝোতা ও বিভিন্ন মতাদর্শীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানবোধ ছাড়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের যেটুকু ঘাটতি রয়েছে এর নিরসন প্রয়োজন। ওই দুটি জাতীয় নির্বাচনের পূর্বাপর স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনেও দেখা গেল অনাকাঙ্ক্ষিত সব চিত্র। গণতন্ত্রের অর্থ হলো কণ্টকাকীর্ণ।

এখন এমন সময় উপস্থিত যে, কোনো কিছু গোপন রাখা খুব দুরূহ। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষে কিংবা বিকাশে মানুষ খুব সহজেই ইচ্ছামতো যে কোনো বিষয় জেনে নিতে পারে। এর ফলে খুব দ্রম্নততম সময় জনমতও সংগঠিত হচ্ছে এবং এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই রয়েছে। সরকার বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভুল-ভ্রান্তি কিংবা অন্যায় কোনো কর্মকান্ড সম্পর্কে আগে সাধারণ মানুষ তেমন কিছুই জানতে পারত না। এখন কিন্তু তা নয়। সাধারণ মানুষও এখন অনেক কিছুই সহজে জানতে পারছে। এমতাবস্থায় পরস্পরকে দোষারোপ করে সত্য আড়াল করার কিংবা সত্যকে মিথ্যায় কিংবা মিথ্যাকে সত্যে রূপান্তরের অবকাশ নেই। সুষ্ঠু, অবাধ, প্রশ্নমুক্ত এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিতকরণের পথ সুগম করতে পারে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশ-জাতির সার্বিক উন্নতি-অগ্রগতির জন্য কতটা অপরিহার্য এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। খুব দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এমন কিছু উপসর্গ রয়েছে, যেগুলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে খুব প্রতিবন্ধক। এই প্রতিবন্ধকতার প্রেক্ষাপট সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। ভিন্নমতাবলম্বীদের মুক্ত বিচরণ, মতপ্রকাশ, সভা-সমাবেশ করার মতো পরিস্থিতি যাতে বিদ্যমান থাকে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত হবে।

আবারও বলতে হচ্ছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই সব প্রত্যাশার পূর্ণতা দিতে পারে। আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার পথে এটিই মূল বিষয়। আবারও ফিরে যেতে হয় প্রথিতযশা কবি জন কিটসের কবিতার পঙ্‌?ক্তির কাছে। সত্যিই তো, একটি চমৎকার জিনিসই সব সময়ের জন্য আনন্দদায়ক। ইতিমধ্যে জনপ্রত্যাশা বহুবার হোঁচট খেয়েছে। আর যেন এমনটি না ঘটে রাজনীতিকদের সম্মিলিত প্রয়াসে, তাই নিশ্চিত হোক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে, একদলীয় প্রভাব বিস্তারে শাসকমহল যদি কৌশল অবলম্বন করে চলে, তাহলে কী করে গণতন্ত্রের বিকাশ কিংবা এর পথ মসৃণ করা সম্ভব? এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে, দেশের রাজনীতি কোন পথে। এর সহজ-সরল জবাব হলো, রাজনীতির যে চালচিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা গণতন্ত্রের জন্য কোনো সুবার্তা বহন করে না। যত মত তত পথ- এই বাণী দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় অচল। আমাদের শাসকদের সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা অনেক কম। ব্যক্তির আত্মকেন্দ্রিকতায় দলের ক্ষতি ছাড়া লাভ হয় না। এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে অনেক আছে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অস্বস্তি রয়ে গেছে। এখন সরকার যদি মনে করে, বিদেশিরা এ জন্য সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে ছেদ টানেনি, তাই কোনো প্রশ্ন নেই বা উঠতে পারে না। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ কিন্তু নেই। বিদেশি বিভিন্ন মহল কিন্তু ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাহীনতার কথা বলছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থবিরতা আগামীতে বহুবিধ সমস্যার জন্ম দিতে পারে- এ কথাটা সরকারের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা দরকার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd

close

উপরে