মানবতা, মানবাধিকার ও সুশাসন

দেশে দেশে সুশাসনের অভাবের কারণেও মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রতিটি রাষ্ট্রে সুশাসনের নিশ্চয়তা, জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা থাকলে মানবতার জয় নিশ্চিত। সুশাসনকে একটি দেশের উন্নয়নের দিকনির্দেশনা প্রদানকারী হিসেবে দেখা হয়। পেস্নটোর 'রিপাবলিক' গ্রন্থে প্রথম সুশাসনের ধারণা পাওয়া যায়। সুশাসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যা একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে, উন্নয়ন ঘটায়।
মানবতা, মানবাধিকার ও সুশাসন

রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, কোনো অসুস্থ মানুষকে, বিপদে পড়া মানুষকে কিংবা কোনো কুকুর-বেড়ালের জন্যও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন, এটা মানবতা। কাউকে নির্যাতিত হতে দেখে এগিয়ে এলেন, প্রতিবাদ করলেন, সেটা মানবতা। তা পরিবারে হোক, সমাজে হোক কিংবা রাষ্ট্রে। এরকম অজস্র ছোট ছোট সহযোগিতাগুলোই মানবিক হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই, যেমন সত্য, তেমনি মানুষ আর মানবতার বিপক্ষেও কোনো কথা থাকতে পারে না। যদিও এই পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই মানবিকতা ও অমানবিকতার খেলা চলে আসছে নিজেদের স্বার্থে। অমানবিকতাকে নিজেদের জয় ভেবেই তুষ্ট যারা তারা কোনোদিন মানুষের ভালোবাসা পায় না। জয়ী হওয়া আর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার যে পার্থক্য তা অনুধাবন করার মতো মেধাও তাদের নেই। মানবতা তাদের কাছে শুধু একটি আভিধানিক শব্দ, স্বার্থটা মুখ্য।

পৃথিবীতে যুগে যুগে কিছু লোভী, স্বার্থপর ও সুযোগসন্ধানী মানুষের আবির্ভাব ঘটার কারণেই নানা রকম সংকট সৃষ্টি হয়ে বারবার মানবতা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। সে কারণে আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে সংকটময় অবস্থায় আছে মানবতা। অথচ শান্তিপূর্ণ পৃথিবী পেতে চাইলে বেশি প্রয়োজন মানবতার। এজন্যই মনীষীরা, শিল্প সংস্কৃতির মানুষ মানবতাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের শিল্প সাধনা করে গেছেন এবং করে যাচ্ছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামই বোধহয় সবচেয়ে বেশি মানবিকতার কথা বলেছেন।

প্রতিটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, সম্মান রেখে প্রচলিত ধর্ম না মেনে যদি কেউ শুধু মানবধর্মে বিশ্বাসী হয়, তবে খুব কি দোষের হবে? ধর্ম ছাড়াও তো একজন মানুষ ন্যায় ও নীতিপরায়ণ সম্পন্ন হতে পারে, মানবিক হতে পারে। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়, সে একজন মানুষ। এই যে বিভক্তি, মানুষে মানুষে, সমাজে সমাজে, ধর্মে ধর্মে, কে সৃষ্টি করেছে? মানুষ। এ থেকে মুক্তির একটাই পথ- মানবিক হওয়া। মানবিক হলে এসব বিভক্তি অনেকটাই ম্স্নান হয়ে যাবে। জাত-পাত, উঁচু-নিচুর যে অলিখিত প্রচলন, ধর্মে ধর্মে যে কোন্দল, তার বিনাশ করতে হলে মানবতার চর্চা করতে হবে। মানকাধিকারের কথা বলতে হবে। বর্তমান বিশ্বে চলমান সংকটে মানবতাই অন্যতম।

মনীষীরা, বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কোনো অসহায় জীবের পাশে দাঁড়ানো, কারও দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ না করার নাম দিয়েছেন মানবতা। অনাত্মীয়, বিধর্মী, শুধু মানুষ হিসেবে, জীব হিসেবে বিবেচনা করেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার নাম দিয়েছেন মানবতা। মানুষকে সম্মান করতে পারাটা বোধহয় সবচেয়ে বড় মানবতা। অনেক সময়ই মানুষ এমন সব কাজ করে থাকে যা ভীষণ অমানবিক, ব্যাপারটা সে উপলব্ধিও করতে পারে না কিংবা করতে চায় না। এড়িয়ে যেতে চায়। এড়িয়ে যাওয়াটাও অমানবিকতা। মানবিক হতে খুব বেশি কি পরিশ্রম করতে হয় কিংবা খুব বেশি অর্থের অপচয় হয়? একদমই না। এই যে যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে অথবা বর্ণবাদের দোহাই দিয়ে রে রে করে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন কিছু মানুষ জাস্ট নিজের বিবেক থেকে অন্য ধর্ম বা অন্য বর্ণের মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, খুব বেশি কি ক্ষতি হয় তার কিংবা অর্থ অপচয়? না, কোনোটারই সমস্যা হয় না। সামান্য যদিবা কিছু ক্ষতি হয়, তাতে তার বিবেক, মনুষ্যবোধের বিনাশ হয় না। বরং জাগ্রত থাকে যা তাকে মানুষ হিসেবে পরিচিত করে। প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে সঙ্গে মানবিকতার কথা বলা সত্ত্বেও মানুষ তা অগ্রাহ্য করে আসছে নিজেদের স্বার্থে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অমানবিক কাজ সংগঠিত হয় ধর্মের নামে। বাকিগুলোর বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয়। মানুষ ধর্মের নাম ভাঙিয়ে নানা রকম অমানবিক কাজ করে সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করে। একজন আরেকজনকে দমিয়ে রেখে মানুষের জীবনে সংকট তৈরি করে। সত্যি কথা বলতে কি, মানুষ যত ধর্মনিরপেক্ষ হয় ততবেশি মানবিক হয়। মানবতাই যে একটা বিরাট ধর্ম সেটা বেশির ভাগ মানুষেরই বোধগম্য নয়। তবে যাদের ভেতরে সুস্থ চিন্তা করার, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস আছে, তাদের মানবিক বোধও আছে। এই বোধ অবশ্য তৈরি হয় জন্ম থেকেই, পরিবার থেকে। যে পরিবারের যেমন শিক্ষা তাদের বোধও সেভাবেই তৈরি হয়। মানবিক বোধসম্পন্ন কোনো পরিবারের বাচ্চাদের আলাদা করে মানবিকতা শেখানোর প্রয়োজন পড়ে না, তারা দেখেই বাচ্চাকালেই এসব বোধ অর্জন করে। কারণ পরিবার থেকেই মানুষ প্রথম শিক্ষা গ্রহণ করে।

যেসব পরিবারে মাকে অপমানিত হতে দেখে বাচ্চারা বড় হয়, গৃহকর্মীর ওপর অন্যায়-অত্যাচার হতে দেখে বড় হয়, সে সব পরিবারের ছেলেমেয়েরাও পরে কখনোই মানবিক হয় না, মগজে তাদের অমানবিতার বীজ রোপিত হয়ে যায়।

এই সময়ের সবচেয়ে অমানবিকতা হলো নারীর প্রতি অন্যায়-অবিচার, তাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত যৌন সন্ত্রাস। নারী-পুরুষের ক্ষমতা ও সমতার ভারসাম্যহীনতাই এর মূল কারণ। পুরুষ এটা জেনেই বড় হয় যে নারীর চেয়ে সে শক্তিশালী, নারীকে অবদমন করাতেই তার পুরুষত্ব। নারীর প্রতি বৈষম্যও যে মানবতার লঙ্ঘন, বেশির ভাগ পুরুষই তা জানে না। পুরুষ মনে করে এটা তাদের অধিকার, এখানে অমানবিকতার কিছু নেই!

সে কারণে মানবতার প্রশ্নে মানবাধিকারের বিষয়গুলো উঠে আসে। মানবাধিকার প্রতিটি মানুষের অধিকার যেটা তার জন্মগত। এখানে নারী-পুরুষের কোনো বিভক্তি নয়, সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, এটা প্রতিটি মানুষের রাষ্ট্র কর্তৃক আইনগত অধিকার। বর্তমানে মানুষের অধিকারগুলো আঞ্চলিক যুদ্ধ ও হানাহানির জন্য বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ক্ষমতাধর শাসকরা যারা নিজেদের পৃথিবীর মোড়ল মনে করছে, তারা অবলীলায় মানুষের অধিকারগুলো হরণ ও দমন করছে।

দেশে দেশে সুশাসনের অভাবের কারণেও মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রতিটি রাষ্ট্রে সুশাসনের নিশ্চয়তা, জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা থাকলে মানবতার জয় নিশ্চিত। সুশাসনকে একটি দেশের উন্নয়নের দিকনির্দেশনা প্রদানকারী হিসেবে দেখা হয়। পেস্নটোর 'রিপাবলিক' গ্রন্থে প্রথম সুশাসনের ধারণা পাওয়া যায়। সুশাসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যা একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে, উন্নয়ন ঘটায়। তৃতীয় বিশ্বে সুশাসনের গুরুত্ব অনেক বেশি হলেও এর অভাব লক্ষণীয়। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে সম্পদের স্বল্পতার কারণে যতটা নয় তার চেয়েও বেশি হলো অব্যবস্থাপনা ও রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। প্রশাসনিক দক্ষতা, আইনের অনুশাসন, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে সুশাসন আশা করা বৃথা। দক্ষভাবে, নিরপেক্ষভাবে শাসন পরিচালনা করার ওপরে নির্ভর করে সুশাসন। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহার সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায়।

জাতিসংঘের মতে, সুশাসনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মৌলিক স্বাধীনতার উন্নয়ন। সুশাসনকে বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ম্যাককরনির মতে, সুশাসন বলতে রাষ্ট্রের সফঙ্গ সুশীল সমাজের, সরকারের সঙ্গে জনগণের, শাসকের সঙ্গে শাসিতের সম্পর্ককে বোঝায়। মোদ্দাকথা, সুশাসন নাগরিকদের অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা প্রদান করে।

বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে পুরোপুরি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না। বর্তমানে ব্যাপক দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জবাবদিহিতার অভাব ইত্যাদির কারণে সুশাসন মুখ থুবড়ে পড়েছে। নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিটি বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী সরকারকে দোষারোপ করে নিজেদের কর্তব্য এড়িয়ে যাওয়া। বিশ্বব্যাংকের মতে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এনজিওগুলোকে তাদের ভূমিকা পালনের জন্য যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে। কারণ শাসনের মূল দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের ওপরে হওয়ায় এনজিওগুলোকে বিভিন্ন বিধিনিষেধের মধ্যে কাজ করতে হয়।

সুশাসনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যই দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে বলে বিজ্ঞজনের অভিমত। সরকার এবং জনগণ একত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই সুফল পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে জরুরি-দুর্নীতি প্রতিরোধ, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন, রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- রাজনৈতিক দল, সংসদ, আমলাতন্ত্র, নির্বাচন কমিশন প্রভৃতি যদি তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করে তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অবশ্যই সম্ভব। যে রাষ্ট্র যত বেশি সুশাসন দ্বারা পরিচালিত হয়, সেই রাষ্ট্র তত বেশি উন্নতির দিকে ধাবিত হয়। আসল কথা সুশাসন হলো একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সুশাসন বলতে গণতান্ত্রিক শাসন ও গণতান্ত্রিক সরকারকে বুঝিয়েছেন।

মানবিকতা, মানবাধিকার ও সুশাসনের সামঞ্জস্য না হলে রাষ্ট্র কিরকম ভারসাম্যহীন হয়ে যায়, পেন্ডামিক কোভিড-১৯ এসে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। মানুষ সমষ্টিগতভাবে কতটা মানবিক হতে পারে, সে উদাহরণও যেমন আমাদের সামনে এসেছে, মানুষ কতটা অমানবিক ও নিকৃষ্ট হতে পারে, লোভী হতে পারে, ধান্ধাবাজ হতে পারে সেসবও প্রত্যক্ষ করেছি। প্রত্যেকটি মানুষ নিজেই এক একটি রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব আছে, সেই দায়িত্ববোধ থেকেই যে যার ভূমিকা মেনে চললে রাষ্ট্র এতটা ভারসাম্যহীন হতে পারে না। সবার ওপরে আছে মানবাধিকার ও সুশাসন। রাষ্ট্রে প্রত্যেকের সমান অধিকার ও সুশাসন থাকলে, স্বচ্ছতা থাকলে, জবাবদিহিতা থাকলে রাষ্ট্র কখনো এতটা ভারসাম্যহীন হতে পারে না। সবার ওপরে প্রতিটি মানুষের ভেতরে মানবতা থাকলে পৃথিবী এতটা কলুষিত হতে পারত না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd

close

উপরে