logo
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৭ আশ্বিন ১৪২৭

  ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন   ২৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

নভেল করোনাভাইরাস নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে!

নিজে এবং পরিবারকে নিরাপদ রাখতে ঘরে আবদ্ধ থাকা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কোভিড-১৯ প্রতিরোধের একটি অন্যতম পদ্ধতি। কিন্তু জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এটি মানছেন না। সরকার বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আমাদের উদাসীনতার মধ্যে আরো অশঙ্কার খবর দিল সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। খবরে জানা যায়, করোনাভাইরাস বাতাসে ভেসে বেড়ায় ৩০ মিনিট এবং ছড়াতে পারে ১৪ ফুট।

নভেল করোনাভাইরাস নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে!
নভেল করোনাভাইরাস। চোখে দেখার বস্তু নয়। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও তাকে দেখা যায় না। একে দেখা যায়, ইলেক্ট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে। এজন্যই অনেকেরই জানার কৌতূহল হয়- এই ভাইরাসটি আসলে কতটা ক্ষুদ্রাকার। করোনাভাইরাস এক ধরনের বৃত্তাকার ভাইরাস- যার ব্যাস ১২৫ ন্যানোমিটার। এর প্রোটিন আবরণের ব্যাস ৮৫ ন্যানোমিটার এবং এর স্পাইকগুলো ২০ ন্যানোমিটার লম্বা। প্রতিটি করোনাভাইরাসে গড়পড়তায় ৭৪টি স্পাইক থাকে। অতি আণুবীক্ষণিক ভাইরাসের আকৃতি ব্যাখ্যা করতে ন্যানোমিটার বলতে যে একক ব্যবহার করা হয়েছে তা সর্বজনবোধগম্য নাও হতে পারে; তাই ন্যানোমিটার বিষয়ে হালকা আলোকপাত করা দরকার রয়েছে বলে মনে করছি। এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের একভাগ হচ্ছে এক মাইক্রোমিটার এবং এক মাইক্রোমিটারের এক হাজার ভাগের একভাগ হলো এক ন্যানোমিটার। আমরা খালি চোখে ১০০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত বস্তুকে দেখতে পাই। যেমন ঘরের ভেতর সূক্ষ্ন আলোক রশ্মি পড়লে আমরা অনেক ধূলিকণা, বায়ুবাহিত বিভিন্ন উপাদান দেখতে পাই। এখানে আরো উলেস্নখ্য, উদ্ভিদ ও প্রাণীতে রোগ সৃষ্টিকারী প্রায় সব ব্যাক্টেরিয়াই এর চেয়ে ক্ষুদ্রাকার। ব্যাক্টেরিওলজির গবেষণায় তাই আবিষ্কার হয়েছে অণুবীক্ষণ যন্ত্র। তবে ভাইরাসের অঙ্গসংস্থানগত গবেষণায় ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ লাগলেও উহার উপস্থিতি এবং শনাক্তকরণের জন্য বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়। এখন আমরা সহজেই অনুমান করতে পারছি কত সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ শত্রম্নর বিরুদ্ধে আমরা সারা পৃথিবীর মানুষ লড়ে চলেছি। এত শক্তিধর বস্তুকে শত্রম্ন বললেও জীবাণু বলা যাচ্ছে না। এটি স্বাধীনভাবে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। কেননা, এটির গঠন কোষীয় উপাদানে সম্মৃদ্ধ নয়। ভাইরাসের কেন্দ্রে থাকে ডিএনএ অথবা আরএনএ উপাদান এবং বাইরে থাকে প্রোটিনের একটি আবরণ। নভেল করোনাভাইরাস একটি আরএনএ ভাইরাস।

জীব ও জড়ের মাঝামাঝি এই ছোট্ট অণুজীবের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিশিষ্ঠ জীববিজ্ঞানী স্যার পিটার মেড্যাওয়ার বলেছেন, ভাইরাস হচ্ছে 'এ পিচ অব স্যাড নিউজর্ যাপ্‌ড আপ ইন প্রোটিন।' অর্থাৎ ভাইরাস হচ্ছে প্রোটিনে মোড়ানো এক টুকরো দুঃসংবাদ। করোনাভাইরাস নিয়ে আমার এই তাত্ত্বিক উপস্থাপনা জীববিজ্ঞানের ছোট একটি ক্লাসের বিষয়বস্তু মনে হতে পারে। কিন্তু করোনাভাইরাস নিয়ে একটু ধারণা ব্যক্ত করলাম এজন্যই যে, আমাদের সমাজে অদেখা এই বিষয়টিকে রীতিমত অবিশ্বাস করছেন অনেকে। এরা উদাসীন। অশিক্ষিত উদাসীন যেমন আছে তেমনি আছে শিক্ষিত উদাসীন। শিক্ষিত উদাসীনদের আমরা বেশি-বেশি তথ্য দিয়ে আরো সচেতন করতে পারি।

নিজে এবং পরিবারকে নিরাপদ রাখতে ঘরে আবদ্ধ থাকা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কোভিড-১৯ প্রতিরোধের একটি অন্যতম পদ্ধতি। কিন্তু জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এটি মানছেন না। সরকার বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আমাদের উদাসীনতার মধ্যে আরো অশঙ্কার খবর দিল সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। খবরে জানা যায়, করোনাভাইরাস বাতাসে ভেসে বেড়ায় ৩০ মিনিট এবং ছড়াতে পারে ১৪ ফুট।

\হকোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যবিদদের দেয়া করোনাভাইরাস বিষয়ক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার যে কথাটি ছিল সেটিও এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। গবেষকরা আরো জানতে পেরেছেন যে, শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে নির্গত হওয়ার পর ভাইরাসটি কঠিন পৃষ্ঠে কয়েকদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে এবং স্পর্শের মাধ্যমে অন্যের শরীরে চলে যেতে পারে। এর পর কেউ সেই পৃষ্ঠে অবচেতনভাবে হাত রাখার পর নিজের নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করলে তারও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে ভাইরাসটি কতক্ষণ সক্রিয় থাকবে, তা নির্ভর করছে পৃষ্ঠের ধরন ও তাপমাত্রার ওপর। প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভাইরাসটি কাঁচ, কাপড়, ধাতু, পস্নাস্টিক ও কাগজের উপর দুই থেকে তিন দিন টিকে থাকতে পারে। চীনের হুনান প্রদেশের সরকারি গবেষকদের এই গবেষণার ফল পূর্বে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যবিদদের দেয়া মানুষ থেকে মানুষের নিরাপদ দূরত্বে (তিন থেকে ছয় ফুট) থাকার পরামর্শকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। গবেষণাপত্রে গবেষকরা আরো লিখেছেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবদ্ধ পরিবেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সক্রিয়তা দূরত্ব সাধারণ স্বীকৃত নিরাপদ দূরত্বকে ছাড়িয়ে যাবে বলে নিশ্চিত করা যায়।

তাহলে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস কক্ষে বা বাসে সামাজিক দূরত্ব বলে কিছু থাকল কি? ধরুন ঘণ্টায় ৮০ কি.মি. বেগে একটি ট্রেন হঠাৎ থামলো, তাহলে ওই বগির সামনের লোকটির শ্বাস-প্রশ্বাসের জলীয় কণা পদার্থের স্থিতি জড়তার কারণে মুহূর্তে বগির পেছনে বসা লোকটির শ্বাসের গন্ডিতে চলে আসবে। মনে পড়ছে বাংলাদেশে প্রথম অসুস্থ তিন জনের একজন ছিলেন ইতালি ফেরত। তিনি বলেছিলেন, 'আমি যেখানে ছিলাম সেখানে কেউ করোনা আক্রান্ত ছিল না। তবে আমি যে এরোপেস্ননে এসেছি সেখানে দুজন কয়েকবার হাঁচি দিয়েছিল'।

\হআবার গবেষণার ফলাফলের দিকে ফিরে যাই। গবেষণা থেকে আরো জানা যায়, মানুষের মল বা শারীরবৃত্তীয় তরলে করোনাভাইরাস পাঁচ দিনেরও বেশি টিকে থাকতে পারে। ভাইরাসটি থেকে রক্ষা পেতে ঘনঘন হাত ধোয়া ও মাস্ক পরার কোনো বিকল্প নেই বলেও সতর্ক করেছেন তারা। গবেষকরা বলেছেন, করোনাভাইরাসের উপস্থিতি থাকলেও যাদের মধ্যে ১২ দিন পর্যন্ত কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু তখনো তারা ভাইরাসটির বাহক হিসেবে কাজ করবে এবং তাদের কাছ থেকে অন্যরা আক্রান্ত হতে পারে। গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, যারা ভাইরাসটির সম্ভাব্য বাহক তাদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিক আর না দিক, তারা যাতে ১৪ দিন স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে থাকেন, যাতে তাদের মাধ্যমে অন্য কেউ আক্রান্ত হতে না পারে। অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন নামে একটি বিখ্যাত চিকিৎসাবিষয়ক জার্নালে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে বেড়ানো করোনাভাইরাস নিয়ে অনেকেরই একটা সাধারণ প্রশ্ন এই ভাইরাস কী আগেও ছিল? ১৯৬০ এর দশকে প্রথম এই ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়। প্রথমদিকে মুরগির মধ্যে সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস হিসেবে দেখা যায়। পরে সাধারণ সর্দি-হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে এরকম দুধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস দুটি মনুষ্য করোনাভাইরাস ২২৯ ই এবং মনুষ্য করোনাভাইরাস ওসি ৪৩ নামে নামকরণ করা হয়। তবে অনেকের সন্দেহ যে, এই ভাইরাসটি চীন সরকার তার দেশের গরিব জনগণকে শেষ করে দেয়ার জন্য নিজেরাই তৈরি করে নিজেরাই ছড়িয়ে ছিল। এবারও করোনাভাইরাস যে প্রাকৃতিক নয়, অর্থাৎ এটি মোটেও বাঁদুর থেকে ছড়ায়নি। বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের এই মহাসংকটে চীনকে রাজনৈতিক চাপে রেখেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন- উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির এক ইন্টার্ন দুর্ঘটনাবশত করোনাভাইরাসটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। এইডস ভাইরাস (এইচআইভি) এর আবিষ্কারক ফ্রান্সের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী লুক মন্টানিয়ের ফ্রান্সের একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, উহানের ল্যাবরেটরিতে চলতি শতকের গোড়ার দিক থেকেই করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা চলছে। তিনি আরো বলেন, কোভিড-১৯ এর ভাইরাস প্রাকৃতিক নয়। এটি একটি জিন প্রকৌশলজাত ভাইরাস। করোনাভাইরাসের কোষের মধ্যে এইচআইভি ভাইরাসের কিছু জিনগত চরিত্রের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চীনও কম যায়নি, তারাও পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছে, আমেরিকা তাদের দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। এখন সাধারণভাবে একটা প্রশ্ন জাগে আমেরিকা কীভাবে এই ভাইরাস ছড়ায়- ওরাই তো মরছে বেশি!

\হ২০০৮ সালে যারা দুধের সঙ্গে মেলামাইন খাওয়ানোর অপরাধে অভিযুক্ত তারাই এক যুগ পরে আবার নতুন কোনো অপরাধ করবে না তারই বা ভরসা কি? চীনের ভেজাল চাল, ডিম, মাংস ইত্যাদির ব্যাপারে আমরা অনেকেই চীনের প্রতি আস্থাহীন। ২০১৬ সালে চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং যখন বাংলাদেশ সফরে এলেন তখন আমার একটু সন্দেহ হয়েছিল- ওরা আসল প্রধানমন্ত্রী পাঠিয়েছেতো! তবে চীনকে নিয়ে যত রসিকতাই করি না কেন, ওদের উহান থেকে আবির্ভূত করোনাভাইরাস কোনোভাবেই রসিকতার বিষয় নয়।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে