logo
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৮ আশ্বিন ১৪২৭

  মোনায়েম সরকার   ২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

করোনা ও আমাদের করণীয়

বিজ্ঞানসম্মতভাবে যা যা পদক্ষেপ সরকার-সমাজ ও ব্যক্তি মানুষের রোগ প্রতিরোধে নেওয়া দরকার তা নিতেই হবে। তবে অযথা 'প্যানিক' করার দরকার নেই। করোনায় কোনো মৃতু্যই এ দেশে বা বিদেশি কাম্য নয়। তারপরেও কতো লোক মারা গেল। কিন্তু করোনা ছাড়াও অন্যান্য অসুখ-বিসুখে প্রতিদিন লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছে। শুধু ম্যালেরিয়ায় পৃথিবীতে প্রতি বছর ২ লাখের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এই জীবনগুলো নিশ্চয় মূল্যহীন নয়।

করোনা ও আমাদের করণীয়
পৃথিবীতে সবাই এখন আতঙ্কিত। এই আতঙ্কের কারণ কোভিড-১৯, যার পরিচিত নাম করোনাভাইরাস। এই ভাইরাসটি জনজীবন তছনছ করে দিচ্ছে। জনপদে হানা দিয়ে মানুষকে দিশেহারা করছে। বিজ্ঞানীরা দিনরাত চেষ্টা করছেন অভিনব এই ভাইরাসের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে। বিজ্ঞানীরা একদিন সফল হবেন আমরা সেই আশাই করি, কিন্তু তার আগে ঝরে যাবে অনেক মানুষের প্রাণ। যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। আমি চিকিৎসক নই, লেখক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ইন্টারনেটে করোনা নিয়ে এ পর্যন্ত যেসব তথ্য পেয়েছি এই লেখা মূলত তারই সংক্ষিপ্ত সার।

নোভেল করোনার প্রকোপে মৃতু্যর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। এতদিন যা ছিল চীনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ এখন তা ছড়িয়ে গেছে ২১০টি দেশে। অবশ্য ব্যাপক সতর্কতার সঙ্গে তা মোকাবিলারও চেষ্টা হচ্ছে। এই মোকাবিলা করতে গিয়ে সারা পৃথিবীই এখন হিমশিম খাচ্ছে। এ পর্যন্ত বিশ্বের আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪৮ লাখ, মৃতু্যর সংখ্যা ৬ লাখ ১৩ হাজার। আমাদের দেশে আক্রান্ত দুই লাখ ১০ হাজার ৫১০ জন আর মৃতু্য ২ হাজার ৭০৯ জন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র, আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৪৪ হাজার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকায় মৃতু্যর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। লাখ ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। দ্বিতীয় অবস্থানে ব্রাজিল, আক্রান্তের সংখ্যা ২১ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। তৃতীয় অবস্থানে ভারত, আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১১ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। আক্রান্তের হিসাবে শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার তিন প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান। সত্যিকার অর্থেই যা উদ্বেগজনক। আগে ২৪ ঘণ্টায় বিশ্বে দুই লাখের কম আক্রান্ত হতো। গত কয়েকদিন ধরে দুই লাখের বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, কেবল বাংলাদেশে নয়- সারা বিশ্বে আক্রান্তের হার বাড়ছে। আগস্টে পিক টাইমের কথা যে বলা হয়েছিল, বিশ্ব সেদিকেই যাচ্ছে। এও বলা হয়েছিল- এ সংক্রমণ সহজে যাবে না। মানুষকে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হবে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

জাতিসংঘ মনে করছে, দুটি মহাযুদ্ধের সময়ও শিক্ষাক্ষেত্রে এই সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কথা ঘোষণা করেছিল চীন। এরপর আক্রান্ত অন্যান্য দেশ। সেখানেই প্রথম করোনাভাইরাস ছড়াতে শুরু করে এবং ক্রমে তা মহামারির দিকে যেতে থাকে। সমগ্র বিশ্ব এখন করোনা আতঙ্কে কাঁপছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপদ দেখা দিয়েছে- আমেরিকা ব্রাজিল ও ভারতে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রথম দিকে মিডিয়া জানান দিচ্ছিল, মাস্ক-স্যানিটাইজার বাজার থেকে উধাও; চলছে কালোবাজারি। পরে অবশ্য এটা হয়নি, তবে করোনা পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতি করেছে তিনটি প্রতিষ্ঠান। জেকেজি, রিজেন্ট ও সাহাবুদ্দি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। অভিযুক্ত সাহেদ, সাবরিনা আরিফ ধরা পড়েছে। আমরা চাই, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বলা যায়- করোনা সংক্রামিত হলেও মানুষ অত সহজে মরবে না। কারণ করোনা গ্রম্নপের এই ভাইরাসে মৃতু্যহার অনেক কম, শতকরা ৪ থেকে ৬ জন। আর গুরুতর অসুস্থ হতে পারেন ১০ থেকে ১৪ জন। অর্থাৎ ১০০ জন সংক্রামিত হলে গড়ে ১২ জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন ও তার মধ্যে থেকে গড়ে ৫ জন মারা যেতে পারেন। অর্থাৎ গড়ে ৯৫ জন সুস্থ হবেন। আর ৮৬-৮৮ জন বিশেষ রোগভোগ ছাড়াই। এই করোনাভাইরাসকে 'নোভেল' বলা হচ্ছে কেন? কারণ ডিসেম্বরের (২০১৯) আগে তার অস্তিত্ব জানা ছিল না। এই গোত্রের অন্য করোনাভাইরাস বিশ্ব আগে দেখেছে সার্স (২০০২) নামে। সার্স অর্থাৎ সিভিয়র অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম এবং মার্স মানে 'মিডিল ইস্ট অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম'। দুটির প্রকোপেই মৃতু্যহার ছিল অনেক বেশি।

করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) রূপান্তর এত দ্রম্নত হয় যে অবিশ্বাস্য গতিতে তা ছড়ায়, কিন্তু সুবিধা এই যে, যত বেশি রূপান্তর ঘটে বা চেহারা বদল করে, তত তার সংক্রমণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। ক্রমশ নির্বিষ হয়। তাই চীন যেমন নিবিড় বৈজ্ঞানিক তৎপরতায় আর কঠোর শৃঙ্খলা প্রণয়ন করে এই ভয়ংকর সংক্রমণকে বাগ মানিয়েছে, অন্য দেশ সেভাবে পারেনি। প্রথমে ভাবা হয়েছিল বাদুড় থেকে সাপে, পরে বলা হচ্ছে ম্যাঙ্গোলিন এবং কালাজ জাতীয় সাপের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে তান্ডবনৃত্য শুরু করেছে। কোভিড-১৯ এর রূপান্তর এত দ্রম্নত বলেই কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ আবিষ্কার আজ পর্যন্ত হয়নি। তবে চেষ্টা চলছে। হয়ত অচিরেই সফলতা আসবে। সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে সংক্রমিত ব্যক্তিকে আটকে দেওয়া বা আইসোলেট করাই সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়।.

এই মুকুটরূপী ভাইরাসের ওপর বর্মের মতো যে কাঁটাগুলো থাকে তা মানুষের কোষের এসিই-টু রিসেপ্টরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কোষে প্রবেশ করে, কোষকে পুরো দখল করে নিয়ে লাখ লাখ সংখ্যায় বংশ বিস্তার করে। ভাইরাস আক্রান্ত কোষগুলোকে দ্রম্নত মারতে থাকে। আর এই এসিই-টু রিসেপ্টর মানুষের ফুসফুসে, পৌষ্টিকতন্ত্র ও লিভারে বেশি সংখ্যায় থাকে বলে এই অঙ্গগুলো বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুরুতর অসুখে নিউমোনিয়া হওয়ার এটাই কারণ। যাদের সিওপিডি, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, হৃদরোগ বা অন্যান্য ক্রনিক অসুখে ভোগার ফলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়- তাদের অসুখ গুরুতর হয়ে মৃতু্যর সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

'ফেসাল মাস্ক'-সার্জিক্যাল বা 'এন-৯৫' সাধারণভাবে সবার ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। যারা ভিড় জায়গায় যাচ্ছেন বা অন্যান্য প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসকারী অসুখ-বিসুখে ভুগছেন তারা সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক পরতে পারেন। জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে যারা সংক্রামিত হয়েছে, তার পারিপার্শ্বিক মানুষজন এবং চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা মাস্ক পরবেন। চিহ্নিত রোগীকে আইসোলেট করে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা এবং সন্দেহভাজনদের ২ সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখা (কোয়ারেন্টিনে) তাই রোগ প্রতিরোধের সেরা উপায়। এই রোগের এখনো কোনো প্রত্যক্ষ ওষুধ নেই। ৪ থেকে ১০ দিন রোগের ইনকিউরেশন পিরিয়ড (জীবাণুর শরীরে প্রবেশ থেকে রোগের লক্ষণ প্রকাশের সময়)। তাই গড়ে ২ সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখা ও টেস্ট করা হচ্ছে। তবে বিপদ এই যে, রোগের লক্ষণ প্রকাশ হওয়ার আগেই ৫, ৬, ৭ দিনের মাথায় রোগজীবাণু ছড়ানোর ক্ষমতা সব থেকে বেশি। আরো সমস্যা ৬০ থেকে ৮০ ভাগ সংক্রামিত রোগীর কোনো রকম উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। কিন্তু তারা রোগ ছড়াতে সক্ষম থাকবে। সার্স বা মার্সে এই সমস্যা ছিল না। রোগ-উপসর্গ ফুটে ওঠার পরই জীবাণুর অন্যকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা বাড়ত। তাই যাকে সন্দেহ করছি না বা নিজেও জানে না সে সংক্রমিত, সেও রোগ ছড়াতে সক্ষম। তাই আপাতত হ্যান্ডসেক, হাগিং, আলিঙ্গন, চুম্বন ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। অন্তত রোগমুক্তির প্রয়োজনে যদি চোখ-মুখ-নাকে হাত দেওয়া বন্ধ রাখি তাতে অন্যান্য বহু অসুখ-বিসুখ থেকেও মুক্ত থাকা যাবে। গোমূত্র, আয়ুর্বেদ, ইউনানি বা হোমিওপ্যাথিতে রোগ প্রতিরোধ করা যাবে বলে যে সব দাবি উঠেছে তা বিজ্ঞানসম্মত নয়।

বিজ্ঞানসম্মতভাবে যা যা পদক্ষেপ সরকার-সমাজ ও ব্যক্তি মানুষের রোগ প্রতিরোধে নেওয়া দরকার তা নিতেই হবে। তবে অযথা 'প্যানিক' করার দরকার নেই। করোনায় কোনো মৃতু্যই এ দেশে বা বিদেশি কাম্য নয়। তারপরেও কতো লোক মারা গেল। কিন্তু করোনা ছাড়াও অন্যান্য অসুখ-বিসুখে প্রতিদিন লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছে। শুধু ম্যালেরিয়ায় পৃথিবীতে প্রতি বছর ২ লাখের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এই জীবনগুলো নিশ্চয় মূল্যহীন নয়।

তাই করোনাভাইরাস নিয়ে গেল গেল রব তোলার কোনো যুক্তি নেই। সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। চিকিৎসকদের পরামর্শ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। গুজবে কান না দিয়ে সবাই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে