logo
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৮ আশ্বিন ১৪২৭

  ড. শাহ্‌ মো. আহসান হাবীব   ২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

করোনাযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা ও আর্থিক অস্থিতিশীলতা

নীতিনির্ধারকদের সব অংশীদারি পক্ষের ও নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক ক্ষতির বিবেচনায় নিজেকে প্রস্তুত করার সময় এখন। এ যেন করোনাযুদ্ধ জয়ের পর ভালোভাবে বাঁচার জন্য আরেক বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অর্থনীতি ও আর্থিক খাত রক্ষায় মুদ্রানীতি কর্তৃপক্ষ নয়, বরং সরকারকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে হবে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু সহযোগী হিসেবে থাকবে।

করোনাযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা ও আর্থিক অস্থিতিশীলতা
বিশ্ব অর্থনীতিগুলো করোনাযুদ্ধে, আর সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসছে অর্থনৈতিক মন্দা। করোনাযুদ্ধের কৌশল হিসেবে সামাজিক দূরত্ব ও ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণকে এখন পর্যন্ত কার্যকরী বলে মনে করা হচ্ছে। সরকার ও নীতিনির্ধারকরা এ কৌশল অবলম্বনের পাশাপাশি আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে এবং নিম্নআয়ের মানুষ ও ছোট ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় এগিয়ে আসার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এর ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে অথবা অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে সমূহ অর্থনৈতিক মন্দার দিকে। দীর্ঘকালীন বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচার কৌশল হিসেবে এ স্বল্পকালীন অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না। উপরন্তু, করোনাযুদ্ধ পরিস্থিতির প্রকৃত ফল এখনো নিশ্চিত নয়; যা বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনীতিকে বাঁচানোর কৌশল পরিবর্তিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

বিশ্ব অর্থনীতির মোট উৎপাদন সামনের মাসগুলোয় উলেস্নখযোগ্য হারে কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার ফল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দাকে হার মানাবে বলে পূর্বাভাসে ব্যক্ত করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী অনেকাংশে। উৎপাদন ধারা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে ও হচ্ছে এবং ব্যবসার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বমুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, ২০১৯-এর ডিসেম্বরের তুলনায় বর্তমানে উৎপাদন ও খুচরা বিক্রয় বিপুল হারে কমেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনের সময়গুলোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামের ওপর প্রভাব পড়বে, যদি না এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সার্বিক বিবেচনায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি ২০২০ সালে সারা বিশ্বকে গ্রাস করবে। জে পি মরগানের একটি সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, বছরের দ্বিতীয় তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় উৎপাদন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশীয় উৎপাদন যথাক্রমে ১৪ ও ২২ শতাংশ হারে কমবে। সব লক্ষণ প্রকৃতপক্ষে একটি সমূহ অর্থনৈতিক মন্দার ইঙ্গিত প্রদর্শন করছে; যা স্বাভাবিক নিয়মে আর্থিক অস্থিতিশীলতায় রূপান্তর হতে চলেছে।

উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধের প্রাথমিক প্রভাব পড়েছে তারল্য সংকটের মধ্যদিয়ে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা তাদের সরবরাহকারীদের মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে, বেতন পরিশোধ করতে পারছে না এবং ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যদিও এসব ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান সফলভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। সুতরাং করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে তারা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসতে পারবে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। সুতরাং এ সময়টায় এসব ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত ছোট আকারের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে আর্থিক দৈন্যের মধ্যে পড়েছে এবং সামনের মাসগুলোয় বড় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এমন আর্থিক দৈন্যের মধ্যে পড়তে হতে পারে। স্বাভাবিকভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে মন্দ ঋণ, এসংক্রান্ত অতিরিক্ত জমা এবং ব্যাংক মূলধনের ঘাটতি রোধে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এগিয়ে এসেছে। ফলে ব্যাংকগুলো ঋণ পরিস্থিতি সামলে নিলেও আমানতের ঘাটতি ব্যাংক তারল্যে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। কারণ অনিশ্চয়তার কারণে আমানতকারীরা অধিক পরিমাণ অর্থ নিজের কাছে সংরক্ষণ করছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এমন অবস্থান ও সহায়তা স্বল্পকালীন পর্যায়ে আর্থিক খাতের জন্য সহনীয়। এ ছাড়া সরকার ও বিভিন্ন দেশে সাধারণ মানুষ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা শুরু করেছে বা এসংক্রান্ত ঘোষণা দিয়েছে। এ ধরনের বিশেষ সহায়তা এবং ব্যবস্থা যে কোনো দেশের জন্য দীর্ঘকালীন পর্যায়ে বিপত্তিকর। বিশেষত স্বল্পআয়ের এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশের সরকারের জন্য তা সম্ভবপর নয়।

আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন এবং বিশ্ববাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে চীনে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই। গত দুই দশকে চীন বিশ্ববাণিজ্যে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শুধু তৈরি পণ্যের রপ্তানিকারক হিসেবে নয়, চীন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মধ্যবর্তী পণ্য সরবরাহকারী দেশ; যা শিল্পোৎপাদনের জন্য একান্ত জরুরি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় জোট, জাপান, কোরিয়াসহ অনেক দেশের শিল্পোৎপাদন ও বৈদেশিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যবর্তী পণ্য সরবরাহের অভাবে। এ ছাড়া অনেক উন্নয়নশীল দেশ বহুলাংশে তাদের আমদানির জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববাণিজ্যের সব বড় শক্তি এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশ্ব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকোচন মানে হলো, ব্যাংকগুলোর এসংক্রান্ত আর্থিক সেবার সংকোচন। বিশ্ববাণিজ্য সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের আয়ের উৎসও হারাচ্ছে, যা এ বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

আর্থিকভাবে ব্যাংকিং সেবার সংকোচন ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে। ব্যাংকিং সেবার সময়কাল কমানো হয়েছে এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত দূরত্বের সীমাবদ্ধতার আওতায় স্বল্পসংখ্যক গ্রাহককে সেবা প্রদান করছে ব্যাংক। অনেক ধরনের ব্যাংকিং সেবা বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে এবং ঋণ পরিশোধের কিস্তির সময়সীমা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো। ঋণ ফেরতের অনিশ্চয়তা ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিপর্যায়ের ঋণের ক্ষেত্রে বেশি। বিশেষত একটি অংশের ব্যক্তিপর্যায়ের ঋণগ্রহীতা এরই মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন। অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের চাহিদা বেড়েছে যথাযথ কারণে, কিন্তু এ সংক্রান্ত অনেক সেবা বিনা মূল্যে দিতে বাধ্য হচ্ছে সেবাপ্রদানকারী ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো। সার্বিকভাবে এ পরিস্থিতি ব্যাংকের ঋণ সেবা ও ফি সেবাসংক্রান্ত আয়ের জন্য হুমকির কারণ; যা সম্পূর্ণ আর্থিক খাতকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

যেকোনো অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ও আর্থিক খাতের যে কোনো অংশের সমস্যার প্রতিফলন ব্যাংকিং খাতে দেখা যায়। যেমন ইকুইটি, বন্ড, মিউচু্যয়াল ফান্ড ইত্যাদি বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রভাব ব্যাংকিং বাজারে পড়ে। শেয়ারবাজারের ওপর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের নেতিবাচক প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে প্রতিফলিত হলেও ব্যাংকিং খাতে তা একটু সময় নিয়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করে এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক খাত ও অর্থনীতির বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলোয় শেয়ারবাজারের ধস এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির চিন্তার কারণ হয়েছে। আর সামনের সময়গুলোয় ব্যাংকিং খাতে তার প্রভাব বেশ বড় আকারে প্রতিফলিত হবে- এমনটাই পূর্বাভাসগুলোয় উঠে এসেছে। উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংকভিত্তিক আর্থিক খাতের জন্য এমন ধাক্কা সামলানো আরও বেশি কঠিন, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেশির ভাগ ব্যাংকিং খাতনির্ভর।

করোনাযুদ্ধের ঘটনাচক্র নির্দেশ করছে যে অর্থনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে আর্থিক তথা ব্যাংকিং খাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক মন্দার আর্থিক অস্থিতিশীলতায় রূপান্তর বা আর্থিক মন্দার অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব সবসময়ই অনুমেয়।

বিশ্বব্যাপী মুদ্রানীতি কর্তৃপক্ষ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও অন্যান্য সমস্যা চিহ্নিত করে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সরকারও অর্থনীতি ও আর্থিক খাতকে বাঁচানোর লড়াইয়ে বড় অঙ্কের অর্থ সাহায্যের ঘোষণা করেছে ও করছে। তবে নীতি-নির্ধারকদের কার্যক্রম ও কৌশলের কার্যকারিতা এবং ফলাফল এখনো নিশ্চিত নয়। যেহেতু করোনা পরিস্থিতির ক্ষতির পরিমাণ এখন পর্যন্ত অনুমাননির্ভর মাত্র। বর্তমানে চীন ও উন্নত বিশ্ব করোনাযুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত। নভেল করোনাভাইরাসের সরাসরি প্রভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় কী পরিমাণ মানুষ প্রাণ হারাবে তা অনিশ্চিত। তবে করোনাযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ও আর্থিক মন্দা উন্নত ও উন্নয়ন বিশ্বকে মোটামুটি একইভাবে গ্রাস করবে বলে মনে হয়। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হবে। আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনো সেভাবে প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করেনি; যা উন্নত বিশ্বে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বা তারা দেখতে বাধ্য হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে করোনাযুদ্ধ লড়াইয়ের পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী প্রস্তুতির বিকল্প নেই। এজন্য প্রকৃত বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপ করার কাজ এগিয়ে নিতে হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে।

নীতিনির্ধারকদের সব অংশীদারি পক্ষের ও নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক ক্ষতির বিবেচনায় নিজেকে প্রস্তুত করার সময় এখন। এ যেন করোনাযুদ্ধ জয়ের পর ভালোভাবে বাঁচার জন্য আরেক বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অর্থনীতি ও আর্থিক খাত রক্ষায় মুদ্রানীতি কর্তৃপক্ষ নয়, বরং সরকারকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে হবে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু সহযোগী হিসেবে থাকবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে