logo
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৮ আশ্বিন ১৪২৭

  কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ   ২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

করোনা সংক্রমণ নিরোধ ও অর্থনৈতিক উত্তরণ

ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, পিপিই এবং হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনমতো বাড়াতে হবে। তবে দুটি বিষয়ে বিশেষ জোর দিতে হবে- নমুনা পরীক্ষার জন্য কিট এবং অক্সিজেন সরবরাহ। উভয় ক্ষেত্রে দেশে উলেস্নখযোগ্য ঘাটতি বিরাজমান। অক্সিজেনের প্রাপ্যতা উপজেলা পর্যন্ত দেশের সর্বত্র নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে করোনা-আক্রান্তরা প্রয়োজনে সহজে অক্সিজেন পেতে পারেন। বর্তমানে জেলাপর্যায়েও অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা যায়।

করোনা সংক্রমণ নিরোধ ও অর্থনৈতিক উত্তরণ
বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ উদ্বেগজনক। সাধারণত মানুষের চলাফেরায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না এবং সংক্রমণের ব্যাপকতা বা সীমিত থাকা ব্যতিরেকে এলাকা থেকে এলাকান্তরে মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। লাল, হলুদ ও সবুজ এলাকা চিহ্নিত করে লাল অঞ্চলগুলোতে কঠোরভাবে লকডাউন নিশ্চিত করার ঘোষণা অনেকটা প্রহসনের মতো হয়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে কোন প্রতিষ্ঠানের কি দায়িত্ব সে সম্পর্কে অস্বচ্ছতা রয়েছে। আর সমন্বয়হীনুা প্রকট বলে দেখা যাচ্ছে। কোনো এলাকা যে রঙে চিহ্নিত করা হোক না কেন দেখা যায় মানুষ সাধারণত নিজেদের মতো করে চলছেন এবং তাদের বাধ্য-বাধকতার মধ্যে আনার তেমন কার্যক্রম নেই। তাই সামাজিক সংক্রমণ-সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে অনেক ব্যাপক। কিন্তু তা নিরূপণ করতে অনেক বেশি নমুনা পরীক্ষা এবং সংস্পর্শতা নির্ধারণ করে তাদেরও পরীক্ষা করা জরুরি। যা করা এখনো তেমন সম্ভব হচ্ছে না এবং কবে নাগাদ যথাযথভাবে সম্ভব হবে সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা করা আছে বলে দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে করণীয়গুলো (অর্থাৎ করোনা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সক্ষমতা পর্যাপ্তভাবে উন্নীত করা) দ্রম্নত ও কার্যকর সম্পাদন করা জরুরি।

মার্চ মাসে (২০২০) অতি দুর্বল অবস্থা থেকে এ পর্যন্ত উলেস্নখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক অপ্রতুল। আশা করতে চাই, জাতীয় বাজেটে কোভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য যে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা জুলাই থেকে যুদ্ধাবস্থায় যেমন কোনো সময় নষ্ট করা যায় না সেরকমই কাজ করতে হবে এবং শিগগিরই সক্ষমতা বাড়িয়ে বাস্তবতা নিরূপণ করা সম্ভব হবে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেই অনুসারে কাজ করতে হবে। তবেই এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাস্তবানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। নজর রাখতে হবে, এই অর্থ যেন আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় আটকে না যায় দিনের পর দিন- অনেক দিন। আর ধান্দাবাজরা যাতে এই প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

\হডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, পিপিই এবং হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনমতো বাড়াতে হবে। তবে দুটি বিষয়ে বিশেষ জোর দিতে হবে- নমুনা পরীক্ষার জন্য কিট এবং অক্সিজেন সরবরাহ। উভয় ক্ষেত্রে দেশে উলেস্নখযোগ্য ঘাটতি বিরাজমান। অক্সিজেনের প্রাপ্যতা উপজেলা পর্যন্ত দেশের সর্বত্র নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে করোনা-আক্রান্তরা প্রয়োজনে সহজে অক্সিজেন পেতে পারেন। বর্তমানে জেলাপর্যায়েও অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা যায়।

বেশ কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন জীবনাবসান ঘটছে গড়ে ৪০ জনের মতো। কিছু দিন আগে এক দিন সর্বোচ্চ ৫৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। যদিও সংক্রমিতদের মধ্যে বাংলাদেশে মৃতু্যর হার (বর্তমানে ১.৩০ শতাংশ) ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কি উন্নত কি উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক কম, তবুও প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের এতজন মানুষের মৃতু্য অতীব বেদনাদায়ক।

অবস্থা উলেস্নখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল বলে ধারণা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। লকডাউন এবং চলাচলে বিধিবিধান যখন মানুষ মানছিলেন না তখন প্রয়োজন ছিল সান্ধ্য আইন দিয়ে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনার। এখনো লাল ঘোষিত এলাকায়ও কঠোরতা তেমন নেই। লাল এলাকা চিহ্নিত করা নিয়েও নানা নাটকীয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। লাল ঘোষিত প্রতিটি এলাকায় সান্ধ্য আইন জারি করা উচিত বলে আমি মনে করি। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল বলে। দেখা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার কি দায়িত্ব তা নিয়ে দড়ি টানাটানির ফলে এলাকাভিত্তিক রঙ নির্ধারণ ও সেই অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে। যদি শেষ পর্যন্ত লাল এলাকাগুলোতে লাল বলে চিহ্নিত করে লকডাউন করাও হয় ততক্ষণে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়বে এবং এলাকা থেকে এলাকান্তরে জন-যাতায়াতের ফলে অন্যান্য এলাকায়ও তা ছড়িয়ে পড়বে।

এখানে উলেস্নখ করতে চাই, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগে শিথিলতার ফলে সংক্রমণ বাড়ছে তা তো আমরা দেখছি। অন্যদিকে এ ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করার ফলে নিউজিল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং আরও কয়েকটি দেশ এই মহামারি নিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। মনে রাখতে হবে প্রতিরোধ করা সবার জন্যই, আর বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য অতি উত্তম কেননা কোভিড-১৯ চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা অনেক সীমিত।

'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' বাংলাদেশে এরকম কর্মকান্ড পরিচালনা করার কথা ছিল না। এ দেশের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা দূরদর্শিতার সঙ্গে সময়মতো প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, সিদ্ধান্ত এবং অর্থ বরাদ্দ দিয়ে আসছেন। তিনি করোনা মহামারি মোকাবিলা করাকে যুদ্ধাবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু গৃহীত কার্যক্রম বাস্তবায়ন চলছে সাধারণ সময়ের মতোই এবং সাধারণ সময়েও এ দেশে অনেক ক্ষেত্রে কাজ চলে ঢিলেঢালাভাবে- হবে, হচ্ছে, ব্যস্ত হওয়ার কি আছে এই মানসিকতার অবয়বে। উদাহরণ ১৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কর্মকান্ড (বিশেষ করে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসা) পুনঃচালু ও পুনর্গঠন করার জন্য যে সহায়তা ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন তার বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত (প্রায় আড়াই মাস পরও) শুরু করাই হয়নি। এই করোনাকালে যে যুদ্ধতুল্য অবস্থা বিরাজ করছে তার কোনো সচেতনতা এবং দ্রম্নত কাজ করার অত্যাবশ্যকতা বাস্তবায়নকারী অনেকের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। দেখা যায়, নানাভাবে একই ধরনের দীর্ঘসূত্রতায় পীড়িত করোনা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও।

এ অবস্থা চলতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধে জয়ী জাতি নিশ্চয়ই এই করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমন বলেছেন করোনা হটানো এবং আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠন একটি যুদ্ধই। এই যুদ্ধ জয় করার জন্য সরকারি নীতি ও কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা যাদের দায়িত্ব তাদের সবাইকে যুদ্ধে যেমন এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট করা যায় না (যাতে নিজেদের কোনো অনিষ্ট না ঘটে এবং শত্রম্নপক্ষকে ঘায়েল করা যায় সেজন্য) সেভাবেই কাজ করতে হবে। এ ছাড়া সমন্বিতভাবে কাজ করার যথাযথ ব্যবস্থা করে সব পেশার ও কেন্দ্রীয় থেকে স্থানীয় পর্যন্ত সব স্তরের মানুষকে এই যুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখার জন্য অন্তর্ভুক্ত করাও জরুরি। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ইতিমধ্যে যাদের জীবিকা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে তাদের সহায়তা করতে সরকারের পাশাপাশি অনেকে এগিয়ে এসেছেন। এখানে সম্ভাবনা আরও অনেক আছে।

খাদ্য ও নিরাপত্তাহীনতায় নিপতিত কোটি মানুষকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং তা অব্যাহত রাখা ও জোরদার করার জন্য জাতীয় বাজেটে (২০২০-২১) সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সংগত কারণেই বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করতে চাই। এ বিষয়ে অন্যত্র বিস্তারিত লিখেছি। গ্রাম ও শহরের অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন খাতে যে করোনাকালে বন্ধ হয়ে যাওয়া বা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১ কোটির মতো অতিক্ষুদ্র উদ্যোগ রয়েছে এগুলো আবার চারু করা এবং চাঙ্গা করে তোলার লক্ষ্যে ঋণ ও অন্যান্য সেবা দেওয়ার বিষয়ও অন্য এক লেখায় আলোচনা করেছি।

অন্য একটি বিষয় এই লেখায় উলেস্নখ করতে চাই। সরকারের প্রণোদনা ঋণ বা ব্যাংক থেকে স্বাভাবিকভাবে বিনিয়োগ করার জন্য যে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হয় সেসব ক্ষেত্রে এই করোনাকালে এবং করোনা উত্তরকালে দ্রম্নত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমি এখানে কোটি কোটি টাকার ঋণের কথা বলছি। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয়ের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। ঋণপ্রার্থীদের মধ্যে রকমফের রয়েছে। কিছু মানুষ আছে যারা ঋণ নেয় ফেরত না দেওয়ার জন্য। বিদেশে পাচার করে দেয়। এরা ঋণ পায় ব্যাংকের ভেতরে যোগসাজশের মাধ্যমে। এদের অনেকেই চিহ্নিত। এদের যেন ঋণ বা অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা না দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে কার্যকর নজরদারি করতে হবে। দ্বিতীয় একটি গোষ্ঠী আছে, যারা ঋণ নিয়ে প্রথমে সুদের টাকা আদায় করে এবং নানা ছুতোয় মূলধনের কিস্তি দেয় না। পরে নানা অজুহাত দেখিয়ে সুদও মওকুফ চায়। এদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আরও অনেকে আছে যারা সততার সঙ্গে ঋণ নেয় এবং সময়মতো কিস্তি দেয়। দেখা যায় অনেক সময় এরা ঋণ পায় না বা ঋণের জন্য অনেক ঘুরতে হয়। ব্যাংকগুলোতে বহু আলোচিত এবং আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে চিহ্নিত ব্যাংক সুশাসন নিশ্চিত করলেই ব্যাংকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আসবে এবং ধান্দাবাজদের দৌরাত্ম্য দূরীভূত হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে