logo
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৮ আশ্বিন ১৪২৭

  ড. আর এম দেবনাথ   ২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

মধ্যবিত্তশূন্য অর্থনীতির কী হবে

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটেও মধ্যবিত্তের জন্য সুখবর কিছুই নেই। তাদের জন্য প্রণোদনার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমন একটা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তাদের সঞ্চয়ের ওপর আয় হ্রাস পেয়েছে। এদের বাঁচানোর ব্যবস্থা কী? এরা ছাড়া কি বাজার অর্থনীতি সচল করা যাবে? বড় বড় শহরই দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ। শহর মধ্যবিত্তশূন্য হলে কি অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যাবে?

মধ্যবিত্তশূন্য অর্থনীতির কী হবে
জুন মাসের ২৫ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক খবর পড়লাম। এর মধ্যে বড় একটি খবর 'প্রণোদনার টাকা পাচ্ছে কারা, প্রকৃত ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা হতাশ, শ্রমিক-কর্মচারীর রোষানলে মালিকরা, আলোচনায় নেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।' দ্বিতীয় খবরটির শিরোনাম, 'করোনায় এলোমেলো রাজস্ব আদায়'। তৃতীয় খবরটির শিরোনাম : 'করোনার মধ্যেও রেকর্ড রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল'। এর পরের খবরটির শিরোনাম : দেশে কোটিপতি ৮৪ হাজার। এদিকে গত ২০ তারিখের একটা খবরের শিরোনাম : 'সঞ্চয় কেন এত জরুরি'। দৈনিক ইত্তেফাকেরই ২৩ তারিখের খবর : 'দুশ্চিন্তায় মধ্যবিত্ত আর্থিক সামাজিক চাপে ভেঙে পড়াই জীবনব্যবস্থা'। ২৭ তারিখের আরেকটি খবর : কাজ হারিয়ে ঢাকা ছাড়ছেন বহু মানুষ' সপরিবারে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে ৩৬ শতাংশ মানুষ রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন।' এগুলো পাঠ করলে দেশের কী অবস্থা তার একটা চিত্র পাওয়া যায়। রাজস্ব আদায় নেই, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন নেই, দেশে কোটিপতির সংখ্যা কত, দিন দিন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতি বাড়ছে। 'প্রণোদনার টাকা নিয়ে হতাশা'- এসব খবর বলা যায় নিয়মিত খবর। যে দুটো খবর অন্তত আমার নজর কেড়েছে, তা হচ্ছে মধ্যবিত্ত-সম্পর্কিত। এর একটিতে সঞ্চয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আরেকটি খবর, যা রীতিমতো ভাবনার বিষয়, তা হচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিকের মতো মধ্যবিত্তের ঢাকা শহর ত্যাগ। এটি একটি নতুন ঘটনা। মধ্যবিত্ত গ্রাম থেকে ঢাকায় আসে। ঢাকায় এসে রোজগার করে মধ্যবিত্ত হয়। এদের ছেলেমেয়েরা ভালো লেখাপড়া করে। এখন উল্টো খবর শুনলাম মধ্যবিত্তের গ্রামে যাত্রা! রীতিমতো দুর্ভাবনার বিষয়। যেই মধ্যবিত্ত ঢাকার প্রাণ, যেই মধ্যবিত্ত অর্থনীতির প্রাণ, তারা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত পড়েছি যে, শ্রমিকশ্রেণির লোক, গার্মেন্টে কর্মচারীরা গ্রামে যাচ্ছে। এখন দেখা যাচ্ছে, এমন মধ্যবিত্ত ঢাকা ছাড়ছেন যিনি ১৫ হাজার টাকায় ঢাকাতে এক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। 'দুশ্চিন্তায় মধ্যবিত্ত' শিরোনামীয় খবরটিতে মধ্যবিত্তের একটা অস্থির সময়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই কর্মচু্যত হচ্ছেন। অনেকের কোনো কাজ নেই। তাই ফিরে যাচ্ছে গ্রামে। শুধু ইত্তেফাকের খবর নয়, ব্যক্তিগতভাবেও এ ধরনের দুঃসংবাদ পাচ্ছি। বন্ধুবর বিখ্যাত সাহিত্যিক অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ থাকেন পৈতৃক বাড়ি গেন্ডারিয়ায়। তার স্ত্রী খুকুভাবী কয়েক দিন আগে আমার স্ত্রীকে ফোন করে বলেছেন, দিদি- বহু ভালো ভালো পরিবার গেন্ডারিয়া ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে আরেক খবর পেলাম এক অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি চাকরিজীবী মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বিনা কাজে রেখে শেষ পর্যন্ত তার ড্রাইভারকে বিদায় দিয়েছেন অতি কষ্টে। দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত হচ্ছে। ভোগ কমাচ্ছে। শিশুদের জন্য গরুর দুধ রাখত তা বন্ধ করেছে। দুই কেজি চিনির বদলে এক কেজি চিনি খাচ্ছে। সব খরচে মিতব্যয়ী হচ্ছে। এটা নতুন ঘটনা নয়। অর্থনৈতিক সব সংকটে মধ্যবিত্তরা তা-ই করে। তবে কখনো সে ঢাকা ছাড়েনি। এবার ছাড়ছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত হচ্ছে। নিম্নবিত্ত দরিদ্র হচ্ছে। দরিদ্র হচ্ছে অতিদরিদ্র, আর অতিদরিদ্র আশ্রয় নিচ্ছে পথে-প্রান্তরে। ইত্তেফাকে বলা হয়েছে ৩৬ শতাংশ মানুষ ঢাকা ছাড়ছে।

বহু লোকের বেতন কাটছাঁট হচ্ছে। যারা টিউশনি করে সংসার চালাত মোটামুটি ভালোভাবেই, তাদের কাজ নেই। ছোট ছোট কারখানার মালিক, মধ্যবিত্ত, বিলাসবস্ত্রের দর্জির কোনো কাজ নেই। শত শত ধরনের মধ্যবিত্ত লোকজন বস্তুত এখন চোখের সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ দেখছেন। তাদের গোছানো সংসার তছনছ হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত রোজগার করে। কিছু ভোগ করে। কিছু সঞ্চয় করে। সঞ্চয় তার দুর্দিনে কাজে লাগে। কারণ আমাদের দেশে সরকার লোকজনের ভরণপোষণ করে না। খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসা ইত্যাদি সব নিজের হাতে। বেকার হলেও সরকার দেখে না। মধ্যবিত্ত পরিবার বস্তুত বিশাল পরিবার। বাবা-মা, ভাইবোন, বিধবা আত্মীয়স্বজন নিয়ে তাদের বসবাস। তাদের এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীদেরও দেখতে হয়। এমন বাস্তবতায় মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কেই অগ্রাধিকার দেয়। আমাদের মা-মামি, খালা-ফুফুরা শাড়ির আঁচলে টাকা সঞ্চয় করে। ছেলেমেয়েদের খেলনা হচ্ছে মাটির ব্যাংক। সঞ্চয় বস্তুত আমাদের রক্তে। মধ্যবিত্তের এখন সেই সঞ্চয়ে টান পড়েছে। অনেকের সঞ্চয় প্রায় শেষ। যাদের এই অবস্থা তারা ঢাকা ত্যাগ করে গ্রামে আশ্রয় নিচ্ছে। জীবনের কাছে পরাজয় আর কি! অথচ এদের দুঃখের কথা নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। মিডিয়াও এদের নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে রাজি নয়। সবাই বলে গরিবের কথা। একসময় 'লাল মিঞারা' (কমিউনিস্ট) গরিবের কথা বলত। এখন তারা মাঠে নেই। বলত এনজিওরা। তারা পয়সা এনেছে বিদেশ থেকে গরিবের কথা বলে। অথচ ভাগ্য গড়েছেন নিজেদের। এমতাবস্থায় গরিবের কথা বলে সরকার। আমার জানামতে, সরকার ১০০-এরও বেশি ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে 'সামাজিক সুরক্ষার' খাতে। দরিদ্রদের বিনামূল্যে খাবার দিচ্ছে। তাদের জন্য 'ওপেন মার্কেট অপারেশন'-এ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দেওয়া হচ্ছে। তৈরি করা খাবার দেওয়া হচ্ছে তাদের। বিধবা ভাতা, পঙ্গু ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা থেকে শুরু করে গরিবদের জন্য শত প্রকার সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে। এসব কর্মসূচি প্রশংসনীয়। গরিবদের বাঁচানোর যত ব্যবস্থা করা যায় ততই ভালো। কিন্তু গরিবদের বাইরেও অনেক লোক আছে যারা বিপদে পড়লেও মানুষের কাছে হাত পাততে পারেন না। চাকরি যায় তাদের। মুখ খুলতে পারেন না। পেটে ভাত নেই, কাউকে বলতে পারে না। কাঁচাবাজারের টাকা নেই, বলা যায় না। ছেলেমেয়ের স্কুলের বেতন নেই। তাদের টিউশন বন্ধ। নিজের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। রিকশায় ওঠার পয়সা নেই। দেশের বাড়ি থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া সম্ভব নয়। এ ধরনের লোকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়।

অর্থমন্ত্রীরা গর্ব করে বলেন, আমাদের ১৬ কোটি জনমানুষের মধ্যে ২৫ শতাংশই মধ্যবিত্ত। এরাই বাজার। এরাই মুক্তবাজার অর্থনীতির নিয়ামক শক্তি। এই হিসাবে এদের সংখ্যা হয় ৪ কোটি। বিশাল সংখ্যা। এদের কোনো সংগঠন নেই। এদের আমানতের ওপর সুদের হার কমালে 'প্রতিবাদ' করার কেউ নেই। এদের 'সঞ্চয়পত্র' কেনা প্রায় বন্ধ করলেও কেউ আপত্তি করার নেই। এরা চিকিৎসা পায় না। বস্নাড টেস্ট করার টাকা নেই এদের। কত গবেষণা প্রতিষ্ঠান। কই, তারা তো এদের কথা বলতে পারে। তারা তো এদের আয় যাতে সংকুচিত না হয়- এ কথা বলতে পারে। সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ঊর্ধ্বসীমা অর্ধেকে হ্রাস করা হয়েছে। এর ওপর সুদের হার কমানো হয়েছে। এমনকি ডাকঘর সঞ্চয়ের ওপরও সুদ কমানো হয়েছে। ব্যাংকের আমানতের ওপর সুদের হার ৯-৬-এর নামে মূল্যস্ফীতির নিচে নামানো হয়েছে। কই জোরালো আপত্তি কী কেউ করেছে? বলা হচ্ছে এতে বিনিয়োগ বাড়বে। অল্প সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ীরা শিল্প গড়বেন। অথচ দেখা যাচ্ছে, ধনী ব্যবসায়ীদের বড় অংশ দেশে টাকা রাখছেন না। তারা পরিবার সব বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এসব দেখে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দুঃখ-রাগ প্রকাশ করেছেন। এক সভায় তিনি ব্যাংকারদের বলেছেন, যাদের ছেলেমেয়ে বিদেশে তাদের ঋণ না দিতে। এবারের বাজেট দেওয়ার পর ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেছেন, যারা দেশে টাকা খাটান না তারা বিদেশে চলে গেলেই পারেন। বোঝা যায় দেশে টাকা খাটাতে চান না কেউ। অথচ টাকা বিনিয়োগের কথা বলেই সস্তায় ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবং তা করতে গিয়ে আমানতকারীদের আমানতের ওপর সুদ কমানো হয়েছে। এতে বিপাকে মধ্যবিত্ত। এই সুদ আয় ছিল মধ্যবিত্তের অন্যতম আয়। সংসার চালাত অনেকে এই সুদ আয় দিয়ে। সেই সুদ আয় গত কয়েক বছরে অর্ধেকের কম হয়েছে। কোথাও লাভজনকভাবে টাকা খাটানোর ব্যবস্থা নেই। চোখে-মুখে অন্ধকার। করের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তের কোনো ছাড় নেই। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাদের কোনো সুবিধা নেই। ট্রেন ভাড়া, লঞ্চ ভাড়ায় তাদের কোনো রেয়াত নেই। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত, বয়স্ক লোকদের জন্যও এসব ক্ষেত্রে কোনো সুবিধা নেই।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটেও মধ্যবিত্তের জন্য সুখবর কিছুই নেই। তাদের জন্য প্রণোদনার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমন একটা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তাদের সঞ্চয়ের ওপর আয় হ্রাস পেয়েছে। এদের বাঁচানোর ব্যবস্থা কী? এরা ছাড়া কি বাজার অর্থনীতি সচল করা যাবে? বড় বড় শহরই দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ। শহর মধ্যবিত্তশূন্য হলে কি অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যাবে?
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে