logo
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৮ আশ্বিন ১৪২৭

  শেখ হাফিজুর রহমান   ২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

করোনা সংকট : বাঁচতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে

মানুষকে বুঝতে হবে- প্রকৃতিকে জয় করে নয় বা পরিবেশকে ধ্বংস করে নয়, বরং প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে অনাদিকাল ধরে বিশ্বব্রহ্মান্ড তার যে সহজাত নিয়মের মধ্য দিয়ে চলমান রয়েছে, তাকে মান্য করেই তাদের বেঁচে থাকতে হবে। নইলে বারবার পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতিশোধের মুখোমুখি হতে হবে সমগ্র মানবজাতিকে।

করোনা সংকট : বাঁচতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে
প্রকৃতিকে জয় করার মনুষ্য প্রচেষ্টা যে আত্মঘাতী, সেটি মানুষ বুঝতে পারছে অনেক মূল্যের বিনিময়ে। করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারির সময়ে সেই বুঝটি আরও তীব্রতর হয়েছে। তবে করোনা মহামারি চলে গেলে মানুষের এই উপলব্ধিটা জাগ্রত থাকবে কিনা সেটি নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ আছে। গত তিন থেকে চারশ বছরের নগরায়ণ ও শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে পরিবেশের প্রতি ভয়াবহ যেসব বিপদ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে আছে- বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, গ্রিন হাউস এফেক্ট, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ওজন লেয়ারের নিঃশেষীকরণ, বন উজাড়ীকরণ ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস সাধন।

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ এবং নিজেদের আরাম-আয়েশের পাকা বন্দোবস্ত করতে গিয়ে একের পর এক বিপস্নব হয়ে গেছে- প্রথম শিল্পবিপস্নব, দ্বিতীয় শিল্পবিপস্নব, তৃতীয় শিল্পবিপস্নব ও চতুর্থ শিল্পবিপস্নব। স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছিল প্রথম শিল্পবিপস্নব; বিদু্যতের আবিষ্কার ও উৎপাদন এবং কলকারখানার মাধ্যমে ব্যাপক উৎপাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো দ্বিতীয় শিল্পবিপস্নব; তথ্যপ্রযুক্তি ও অটোমেশনের মধ্য দিয়ে মানুষের সভ্যতায় আবির্ভাব ঘটল তৃতীয় শিল্পবিপস্নবের এবং সর্বশেষ সাইবার ফিসক্যাল সিস্টেমের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে গেছে চতুর্থ শিল্পবিপস্নব। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার এবং তার হাত ধরে যে ধারাবাহিক শিল্পবিপস্নবগুলো, নিঃসন্দেহে সেটি মানবসভ্যতার এক অনন্য অর্জন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আমরা ব্যবহার করছি মানুষের আরাম-আয়েশ ও ভোগকে নিরঙ্কুশ করার জন্য।

পুঁজিবাদের পুঁজি ও মুনাফা ভোগবাদের যে দৈত্যকে উস্কে দিয়েছে, তাতে মানুষের লোভ গেছে বেড়ে, তৈরি হয়েছে নানা কৃত্রিম চাহিদা, ভোগ হয়ে গেছে বল্কগ্‌দাহীন। উদ্ভিদজগৎ, প্রাণিজগৎ, খাল-বিল-নদী-ফুল-পাখি, সমুদ্রের রহস্যময় তলদেশ ও নভোমন্ডলীর সমন্বয়ে সৃষ্টিকর্তা নিপুণ কুশলতায় যে বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করেছেন, তার কল্যাণ নিশ্চিত করা ও ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি না; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার জন্য। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও উন্নয়নের 'বাই-প্রডাক্ট' হচ্ছে বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মাটিদূষণ, পৃথিবীর গড়পড়তা উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস।

সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো, ব্রিটেন ও উত্তর আমেরিকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার এবং শিল্পবিপস্নবের সুবাদে ব্যাপক শিল্পায়ন হয়েছে, গড়ে উঠেছে চোখ ধাঁধানো উন্নত সব নগর। এভাবে ইউরোপ ও আমেরিকা সারা বিশ্বের সামনে উন্নয়নের একটি 'রোল মডেল' স্থাপন করেছে। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে এশিয়া, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো উন্নয়নের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে। নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও উন্নয়নের জন্য যে মনুষ্য-উন্মত্ততা তার অভিঘাত গিয়ে পড়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপরে। বন উজাড় করে, পাহাড় কেটে, নদী-নালা ও খাল-বিল ভরাট করে, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দেশে দেশে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে; আর পরিবেশ ও প্রকৃতি এই চাপ সহ্য করতে না পেরে সুযোগ পেলেই প্রতিশোধ নিচ্ছে।

গত তিন থেকে চারশ বছরে মানুষের উৎপাদন ব্যবস্থ'া, যোগাযোগ, অবকাঠামো, শিক্ষা-গবেষণা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, যুদ্ধাস্ত্র, শিল্প, কৃষি ও চিকিৎসাব্যবস্'া এতটা উন্নত হয়েছে, মানুষ তার সভ্যতার কয়েক হাজার বছরে সেটি করতে পারেনি। তবে দুর্ভাগ্যজনক হ"েছ, আধুনিক সভ্যতার এই সৌধ নির্মাণ করতে গিয়ে মানুষ নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস করেছে এবং করছে। ফলে দূষণ, উষ্ণায়ন, খরা, বন্যা, ভূমিকম্প, সুনামি ও দাবদাহের মতো করোনা মহামারি এসে আবির্ভূত হয়েছে প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসেবে।

বিশ্বব্যাপী 'লকডাউন'-এর মধ্যে মানুষ যখন গৃহবন্দি, তখন ভারতের ব্যস্ত শহর মুম্বাইয়ের রাস্তায় দেখা গেল একদল ময়ূর ঘুরে বেড়াচ্ছে; ইংল্যান্ডের শান্ডিনডো শহরের জনশূন্য রাস্তায় ঘুরতে দেখা গেল পাহাড়ি ছাগল; দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী কেপটাউনের ফাঁকা রাস্তায় পেঙ্গুইন দেখা গেল; আর থাইল্যান্ডের লুপবুরি শহরে লকডাউনের সুযোগে রাস্তায় বেরিয়ে এলো হাজার হাজার বানর। মহামারির আতঙ্কে যখন রাস্তা-ঘাট, সমুদ্রসৈকত, পর্যটন কেন্দ্রগুলো জনমানবশূন্য, তখন বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কঙ্বাজারের কলাতলী পয়েন্টে দেখা গেল ডলফিনের নৃত্য; মেঙ্েিকার সমুদ্রতটে রোদ পোহাতে দেখা গেল অসংখ্য কুমিরকে; দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রগার ন্যাশনাল পার্কের রাস্তায় শুয়ে মনের সুখে রোদ পোহাতে দেখা গেল সিংহ ও সিংহীর দলকে।

বিলুপ্তপ্রায় গন্ধগোকুল মালাবার সিভেটকে কেরালার রাস্তায় ঘুরতে দেখে বোঝা গেল যে পৃথিবীকে সৃষ্টিকর্তা জলচর ও স্থলচর প্রাণী, পোকা-মাকড়, জোনাকি ও অসংখ্য পাখির নির্ভয় ও আনন্দময় বিচরণের জন্য সৃষ্টি করেছেন, সেই পৃথিবীর প্রায় পুরোটাই মানুষ দখল করে নিয়েছে। ফলে মহামারির ভয়ে প্রাণিজগতের হোমো সেপিয়েন্সরা যখন গৃহবন্দি, গাড়ি-ট্রেন-লরি-জাহাজ, নভোযান ও কলকারখানা বন্ধ; তখনই বিভিন্ন দেশের ব্যস্ত নগরীর রাস্তায় রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে ময়ূর, পেঙ্গুইন, হাতি ও হরিণ; সমুদ্রসৈকতে রোদ পোহাচ্ছে কুমির, কাঁকড়া ও কচ্ছপ; বায়ু ও পানি ফিরে পাচ্ছে তার আগেকার বিশুদ্ধতা; ভারতের শহর থেকে দেখা যাচ্ছে বরফ-শুভ্র নীলাভ হিমালয়; প্রকৃতি তার নির্মল বিশুদ্ধতা, বর্ণিলবৈচিত্র্য, সহজাত স্নিগ্ধতা ও সাবলীল সৌন্দর্য নিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।

মানুষকে বুঝতে হবে- প্রকৃতিকে জয় করে নয় বা পরিবেশকে ধ্বংস করে নয়; বরং প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে অনাদিকাল ধরে বিশ্বব্রহ্মান্ড তার যে সহজাত নিয়মের মধ্য দিয়ে চলমান রয়েছে, তাকে মান্য করেই তাদের বেঁচে থাকতে হবে। নইলে বারবার পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতিশোধের মুখোমুখি হতে হবে সমগ্র মানবজাতিকে।

মানুষকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করা এবং সেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করতে গিয়ে প্রকৃতি জয়ের যে উন্মত্ত প্রচেষ্টা, সমস্যার শেকড়টি সেখানে। এ ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী দুটি তত্ত্ব রয়েছে। একটি হচ্ছে- 'এনথ্রোপোসেনট্রিসম' বা মনুষ্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব; অন্যটি হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব 'বায়োসেট্রিসম' তত্ত্ব। মনুষ্যকেন্দ্রিক 'এনথ্রোপোসেনট্রিসম' তত্ত্বের সারকথাটি অনেক প্রভাবশালী ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। এই তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে- এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের কেন্দ্রীয় বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্তা হচ্ছে মানুষ। মানুষ হচ্ছে প্রকৃতি থেকে পৃথক এবং প্রাণী, উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে উচ্চতর এবং প্রকৃতিতে বিরাজমান সবকিছু মানুষ তার কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে পারে।

তবে 'বায়োসেনট্রিক' তত্ত্বের সমর্থকরা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং বলেন, সব জীবন্ত সত্তাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিতে কেউ উচ্চতর, কেউ নিম্নতর- বিষয়টি এমন নয়। প্রকৃতিতে বিরাজমান যা কিছু আছে- পাহাড়, নদী, সাগর, কীট-পতঙ্গ, ঘাস-পাতা, শিশির, হিংস্র প্রাণী, মাছ, মানুষ, চন্দ্র-তারা, গ্রহ-নক্ষত্র তার সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। আলো, বাতাস, পানি ও চারপাশের পরিবেশ নিয়ে যে 'ইকো সিস্টেম', তার মধ্যেই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার একটি প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে প্রাণিজগৎ ও উদ্ভিদ জগতের নানা প্রজাতি বেঁচে আছে।

কয়েকশ বছরের শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে যে পরিমাণ বায়ুদূষণ, পানিদূষণ ও মাটিদূষণ হয়েছে, তাতে প্রকৃতির এই ভারসাম্য ধ্বংস হতে বসেছে। এ কারণেই ১৯৭২ সাল থেকে জাতিসংঘের পৌরোহিত্যে পরিবেশ নিয়ে যতগুলো বৈশ্বিক সম্মেলন হয়েছে, তার মূল প্রতিপাদ্য ছিল- 'লিভ ইন হারমোনি উইথ ন্যাচার' অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করো। বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশবিদসহ শত শত বিশেষজ্ঞের গবেষণার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সচেতন নাগরিকরা যেটি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন এবং জাতিসংঘও যেটিকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের জন্য অন্যতম প্রধান একটি নীতি বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেটি হচ্ছে- 'প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচো'। এটিকে যদি অনুসরণ করা না হয়, তাহলে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে হোমোসেপিয়েন্স নামের প্রজাতিটি। এমনটাই মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ ও গবেষক।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে