logo
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৮ আশ্বিন ১৪২৭

  আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ   ২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আরও একটি প্রধান সমস্যা দেশের একশ্রেণির জনসাধারণ। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত করোনা প্রতিরোধে যা করণীয় তা তারা যেমন মানেন না ঠিক একইভাবে সবার সঙ্গে মেলামেশা, বাইরে ঘোরা বা নিজেদের বাড়িতে আবদ্ধ থাকার নিয়মও মানেন না। দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা না থাকলে এবং নিয়ম না মানলে কোনো রোগই সহজে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস
'নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়' বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের শেষপ্রান্তের এক কবি তার কবিতায় এই চরণটি লিখেছিলেন। পৃথিবীর ২১০টি দেশে মারাত্মক ব্যাধি করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশে এই ভাইরাস বৃদ্ধি পাওয়ার পর শুধু সাধারণ মানুষ নয় বিশিষ্টজনদেরও আতঙ্কিত করে তোলে।

বর্তমানে বিশ ্বকরোনাভাইরাসের ছোবলে আক্রান্ত ও বিপর্যস্ত, বৈশিক পরিবেশও পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। চীন থেকে প্রথমে করোনাভাইরাস দেখা দেয়ার পর বিশ্বের অসংখ্য দেশে তা পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে আমেরিকা, ব্রাজিল, ইটালি ও ইরান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ব্যাধি যাতে দেশে ছড়িয়ে না পড়তে পারে সেজন্য বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বেশিরভাগ দেশ।শুধু তাই নয়- ব্যাধি যাতে বিস্তার লাভ করতে পারে সে জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ, জনসমাবেশের কারণে ভাইরাস ছড়াতে পারে। এই শ্রেণির সতর্কতাই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এ পর্যন্ত বিশ্বের আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪৮ লাখ, মৃতু্যর সংখ্যা ৬ লাখ ১৩ হাজার। আমাদের দেশে আক্রান্ত দুই লাখ ১০ হাজার ৫১০ জন আর মৃতু্য ২ হাজার ৭০৯ জন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র, আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৪৪ হাজার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকায় মৃতু্যর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। লাখ ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। দ্বিতীয় অবস্থানে ব্রাজিল, আক্রান্তের সংখ্যা ২১ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। তৃতীয় অবস্থানে ভারত, আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১১ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। আক্রান্তের হিসাবে শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার তিন প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান। সত্যিকার অর্থেই যা উদ্বেগজনক। আগে ২৪ ঘণ্টায় বিশ্বে দুই লাখের কম আক্রান্ত হতো। গত কয়েকদিন ধরে দুই লাখের বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় কেবল বাংলাদেশে নয়- সারা বিশ্বে আক্রান্তের হার বাড়ছে। আগস্টে পিক টাইমের কথা যে বলা হয়েছিল, বিশ্ব সেদিকেই যাচ্ছে। এও বলা হয়েছিল এ সংক্রমণ সহজে যাবে না। মানুষকে এর সঙ্গে খাপ-খাইয়ে চলতে হবে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

কিছুদিন আগে থেকেই মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, চীনারা বাদুড়ের সু্যপ খাওয়ার পর এই রোগের বিস্তৃতি ঘটেছে। শুধু বাদুড়ের সু্যপ নয়- বিভিন্ন দেশে কাঁচা জন্তু, জন্তুর রক্ত, আধ-সেদ্ধ কাছিম থেকে অনেক জন্তু খাওয়ার অভ্যেস দীর্ঘদিন থেকে প্রচলিত। ব্যাঙ তো ফরাসিদের প্রিয় খাদ্য। এভাবে খাদ্য-জন্তুর মধ্যদিয়ে ভাইরাস ছড়ানো অসম্ভব নয়।

করোনাভাইরাস শুধু মানুষের মৃতু্য বা অসস্থতা ঘটায়নি, সারা পৃথিবীর অর্থনীতির ওপর যে আঘাত করেছে তা অতিক্রম করতে খানিকটা সময় লাগবে ঠিকই, কিন্তু দরিদ্র দেশের মানুষের ক্ষতি করবে সবচেয়ে বেশি। মানুষের আন্তঃ ও বহিঃস্থ অর্থনীতি দুভাবেই মানুষকে ক্ষতি করবে। পৃথিবীর অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেরও তুলনা করা যায়।

বাংলাদেশ পোশাক তৈরি শিল্পে যে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে, তার ওপর আঘাত এলে শিল্পপতিদের সঙ্গে সবেচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র কর্মচারীরা। যাদের সংসার পরিচালনা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়বে। যার প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাকশিল্পে যেভাবে বিশ্ববাজারে সুনাম ও অধিকার অর্জন করেছিল তা ভিয়েতনামের হাতে চলে যাবে। কারণ, ইতিমধ্যেই ভিয়েতনাম পোশাকশিল্প রপ্তানিতে বাংলাদেশকে অনেকটা পেছনে ফেলে এক নম্বরে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ যদিও পর্যটনশিল্পে অন্য দেশের মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি, কিন্তু দেশি মানুষের কাছে কক্সবাজার থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ অঞ্চল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। করোনাভাইরাসের কারণে ভ্রমণশিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত এখন জনশূন্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের হোটেলগুলোকে ক্ষতির পরিমাণ গুনতে হচ্ছে।

আগে চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য ও কাঁচামাল বাংলাদেশ আমদানি করত। বর্তমানে চীন থেকে পণ্য, ফল ও অন্যান্য কাঁচামাল আসা কমে গেছে, মাঝে বন্ধ ছিল। এরপর যদি অন্যদেশ থেকে কাঁচামাল না আসে তাহলে ওষুধশিল্পের ওপর তার প্রভাব পড়লে ওষুধের দাম বেড়ে যেতে পারে অথবা অনেক ওষুধ তৈরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে ভুগতে হবে সাধারণ মানুষকে।

করোনাভাইরাস ছোঁয়াচে বলে বেশি জনসমাবেশ হলে অন্যের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই কারণে বিভিন্ন দেশে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে যাতে করোনা ছড়াতে না পারে সেজন্য পৃথিবীর সব দেশে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সাধারণভাবে মানুষকে বাড়ির ভেতরে থাকতে বলা হয়েছে নিজেদের ব্যাধিমুক্ত থাকার উপায় হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশের একটা প্রধান সমস্যা হলো রোহিঙ্গাদের নিয়ে। রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা হলেও তাদের ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় নেই। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাদের বাইরে আসা বন্ধ করার উপায় নেই। তাদের মধ্যে করোনাভাইরাস দেখা দিলে বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এদিকে কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা মুনাফা অর্জনের দিকে অতিরিক্ত আসক্ত বলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ একটি প্রয়োজনীয় দিক। ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি করেছে। সর্বশ্রেণির মানুষ একদিকে করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ রত অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ করতে বাধ্য হবেন অসহায়ভাবে। ব্রিটিশরা অবিভক্ত ভারত শাসনের সময় সাধারণ মানুষের সুবিধে ও আর্থিক নিরাপত্তা রেশনকার্ডের মাধ্যমে রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এই ব্যবস্থা সুরক্ষিত ছিল কিন্তু এরশাদ সাহেবের সময়ে এই প্রাচীন ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর অসংখ্য রেশনের দোকানে বাজারের চেয়ে কম দামে ভোজ্যদ্রব্য বিক্রি হওয়ায় সর্বশ্রেণির মানুষ উপকৃত হন। বর্তমানে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষকে অসহায় করে তুলেছে। এর ঠিক বিপরীত অবস্থা ভারতের পশ্চিম বাংলায়। এখানে রেশনিং প্রক্রিয়া না উঠিয়ে সাধারণ মানুষকে আগের উপকারই দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কিছু কিছু প্রয়োজনীয় অভাব মেটানোর জন্য টিসিবি খোলা হয়। কিন্তু সীমিত আকারের এই প্রতিষ্ঠান সবসময় মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে পারেনি।

সারা পৃথিবীতে এখন আলোচনার একটাই বিষয়- করোনাভাইরাস। কীভাবে এই মারাত্মক ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং আক্রান্ত মানুষকে সেবাদান করে সুস্থজীবনে ফিরিয়ে আনা। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার দেশে ভাইরাস বিস্তৃতি ও আক্রান্তের ব্যাপারে বেশ সতর্ক। দেশের কথা চিন্তা করেই বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ পালনের অধিকাংশ অনুষ্ঠানই করেনি এবং এর পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, করোনা যাতে বিস্তার লাভ করতে না পারে তার জন্য লকডাউনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আরও একটি প্রধান সমস্যা দেশের একশ্রেণির জনসাধারণ। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত করোনা প্রতিরোধে যা করণীয় তা তারা যেমন মানেন না, ঠিক একইভাবে সবার সঙ্গে মেলামেশা, বাইরে ঘোরা বা নিজেদের বাড়িতে আবদ্ধ থাকার নিয়মও মানেন না। দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা না থাকলে এবং নিয়ম না মানলে কোনো রোগই সহজে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে