logo
বুধবার ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯, ১০ মাঘ ১৪২৫

  ওবায়দুর রহমান   ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০  

নতুন প্রজাতির ‘ভেনামি’ চিংড়ি উৎপাদনে পাইলট প্রকল্প আসছে

বিদেশি রোগের আমদানি ঘটার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ বিশ্বব্যাপী ৬৭টি দেশে এ প্রজাতির চিংড়ি চাষ হচ্ছে আন্তজাির্তক বাজারের ৭৭ শতাংশ এই প্রজাতির দখলে বাগদা ও গলদার হেক্টর প্রতি উৎপাদন সক্ষমতা ৩০০-৪০০ কেজি। আর ভেনামির উৎপাদন সক্ষমতা ১০-১৫ টন দাম বেশি হওয়ায় বাজার হারাচ্ছে দেশের বাগদা ও গলদা

নতুন প্রজাতির ‘ভেনামি’ চিংড়ি  উৎপাদনে পাইলট প্রকল্প আসছে
রপ্তানিকারক ও চিংড়ি চাষিদের দীঘর্ প্রতীক্ষার পর অবশেষে বিশ্বখ্যাত ‘ভেনামি’ নামের সাদা চিংড়ি চাষের পদক্ষেপ নিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। দ্রæতই এর সম্ভাব্যতা যাচাই করে বাগদা চিংড়ির পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে এ জাতের চিংড়ি চাষে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে অধিদপ্তর। এ জন্য খুলনা বিভাগের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বাংলাদেশ মৎস্য গবষেণা ইনস্টিটিউটের পুকুর ব্যবহার করা হবে।

এরই মধ্যে রপ্তানিকারকদের দীঘির্দনের দাবী এবং বাস্তবতার নিরিখে ‘ভেনামি’ চাষের কাযর্ক্রম শুরু করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক সুবিধা থাকায় দেশের উপক‚লবতীর্ খুলনা এবং কক্সবাজারে এই জাতের চিংড়ি চাষ শুরু করা হবে। এদিকে চিংড়ির বড় ক্রেতা দেশগুলোয়ও এখন অথৈর্নতিক মন্দাবস্থা বিরাজ করছে। ভোক্তারাও এখন বেশি দামের বাগদার বদলে ভেনামি চিংড়ি কিনছে। ফলে ভেনামি ব্যাপকভাবে দখল করে নিয়েছে বিশ্ববাজার।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাগদা চিংড়ির উৎপাদন হেক্টরপ্রতি তিন থেকে ছয় হাজার কেজি। অন্যদিকে ভেনামি বা সাদা চিংড়ি উৎপাদন হয় ১০ থেকে ৩০ হাজার কেজি। ফলস্বরূপ বিশ্বব্যাপী বাগদার স্থান দখল করে নিচ্ছে ভেনামি। চিংড়ির বিশ্ববাণিজ্যে ৭৭ শতাংশ অবদানই ভেনামির। বাগদার অবদান ১৩ শতাংশ। ভেনামির মোট ৭২ শতাংশই উৎপাদিত হয় এশিয়ায়। এশিয়ার সব দেশেই সাদা এই চিংড়ির উৎপাদন বেড়েই চলেছে, কেবল বাংলাদেশ বাদে।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের (ডিওএফ) মহাপরিচালক আবু সাঈদ মো. রাশেদুল হক বলেন, ভিনদেশি এই জাতের চিংড়ি চাষের জন্য খুলনা বিভাগের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বাংলাদেশ মৎস্য গবষেণা ইনস্টিটিউটের পুকুর ব্যবহার করার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। কারিগরি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, তারা পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রকল্পটি এই প্রজাতির জন্য নতুন প্রাকৃতিক পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার জন্য সহায়ক হবে।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের আগস্টে ভেনামি প্রজাতির চিংড়ি চাষের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং নতুন প্রজাতির উপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা ভেনামি চিংড়ি চাষের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের সুপারিশ করে। এর মধ্যে রয়েছে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, জৈব নিরাপত্তা, হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা, পোনা আমদানি, উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেয়া। পরীক্ষামূলক চাষের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ব্যাপকভিত্তিক উৎপাদনে যাওয়ার বিষয়ে কমিটি সুপারিশ করে। কমিটি চিংড়ির রেণু উৎপাদন বাড়ানোর জন্য স্থানীয় কিছু হ্যাচারিকে জীবাণুমুক্ত পোনা আমদানির অনুমতি দেয়ার সুপারিশ করে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী এশিয়ার অনেক দেশে বিদেশি রোগের আমদানি ঘটবে এমন আশঙ্কায় ভেনামি প্রজাতির চিংড়ি চাষের বিরোধিতা করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতি (বিএফএফইএ) ইতিবাচক যুক্তি তুলে ধরে আন্তজাির্তক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অনেক দিন থেকেই ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনের বিষয়ে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে।

বাংলাদেশ ইনটেনসিভ কালচার এসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ হাসান পান্না বলেন, ভেনামি চাষের জন্য বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই অনেক দেরি করে ফেলেছে। এই প্রজাতির ব্যাপক উৎপাদন এর মূল্য কমিয়ে দিয়েছে। অনেক ভারতীয় কৃষক তাদের ক্ষতি কমানোর জন্য ভেনামি চাষে ফিরে এসেছে। তবে দেশীয় প্রজাতির বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারের প্রণোদনা দেয়া উচিত বলে মনে করেন পান্না।

বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতির (বিএফএফইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাজি বেলায়েত হোসেন বলেন, ভেনামির চেয়ে দেশীয় প্রজাতির চিংড়ি চাষের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। এমনকি চাষে প্রণোদনা দেয়া সত্তে¡ও। এই কারণে তারা আন্তজাির্তক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। কারণ ক্রেতারা কম দামে চিংড়ি কিনতে চায়। তিনি বলেন, বতর্মানে বিশ্বব্যাপী ৬৭টি দেশে ভেনামি চিংড়ি চাষ হচ্ছে এবং ২০১৭ সালের হিসাবে আন্তজাির্তক বাজারের ৭৭ শতাংশ এই প্রজাতির দখলে। এই যদি হয় চিত্র, তাহলে তার প্রশ্নÑকেন তারা ভেনামি চাষে যাবেন না?

জানা গেছে, ভেনামি চিংড়ি প্রথম ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচিতি পায়। ১৯৮০ সালের দিকে এই প্রজাতির বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। এরপর থেকে চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারতের মতো অনেক এশিয়ার দেশে ব্যাপকভিত্তিক চাষ শুরু হয়।

তবে সমালোচকরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখেরও বেশি ছোট ও মাঝারি আকারের চিংড়ি খামার রয়েছে। যা সাধারণত চাষি পযাের্য় পারিবারিক সদস্য দ্বারা পরিচালিত। যদি ভিনদেশি চিংড়ির মাধ্যমে প্রচলিত চিংড়ি চাষের ওপর কোনো প্রকার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাহলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অসংখ্য খামারির জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। দেশে চিংড়ি চাষের সঙ্গে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার লোকের কমর্সংস্থান জড়িত।

এফএও ও গেøাবাল অ্যাকুয়াকালচার অ্যালায়েন্সের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী মোট ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ভেনামি ছিল ৭৭ শতাংশ বা প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টন। এ ছাড়া প্রায় ১২ শতাংশ বাগদা বা প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার টন, গলদা ৫ শতাংশ বা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টন এবং অন্যান্য জাতের চিংড়ি ছিল ৬ শতাংশ বা প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন। এর ওপর গত বছর হঠাৎ করে গলদার দাম পড়ে যায় প্রায় ৩০ শতাংশ। আবার চলতি মৌসুমে হঠাৎ করে বাগদার দামও পড়ে যায়। উপরন্তু ক্রেতা দেশগুলো থেকে অডাের্রর পরিমাণও অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। এ প্রেক্ষাপটে এই খাতকে বঁাচাতে হলে উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।

এদিকে বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি খাতের বতর্মান অবস্থা খুবই নাজুক। স্বাধীনতার পর থেকে ২০১০ সাল পযর্ন্ত এ খাতে রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়টি অব্যাহত ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে স্থবিরতা বজায় রাখার পর বতর্মানে এটি নিম্নমুখী। ফলে একদিকে যেমন দেশের রপ্তানি আয় কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি খাতে নিয়োজিত কারখানাগুলোও দিন দিন রুগ্ণ থেকে রুগ্ণতর হয়ে পড়ছে।

মৎস্য অধিদপ্তর এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই হিমায়িত চিংড়ির রপ্তানির পরিমাণ ও এ থেকে আয় কমছে। ২০১৩-১৪ অথর্বছরে মোট ৪৭ হাজার ৬৩৫ টন হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি হয়, যার মূল্য ছিল ৫৫ কোটি ডলার। ২০১৪-১৫ অথর্বছরে রপ্তানির পরিমাণ দঁাড়ায় ৪৪ হাজার ২৭৮ টন। এ থেকে আয় হয় ৫১ কোটি ডলার। এরপর ২০১৫-১৬ অথর্বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪০ হাজার ২৭৬ টন হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি হয়। এসব চিংড়ির রপ্তানি বাবদ আয়ের পরিমাণ ৪৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অথর্বছরে মোট ৩৯ হাজার ৭০৬ টন হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশ, যা থেকে আয়ের পরিমাণ দঁাড়ায় ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে