logo
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ০৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

রুম্পার মৃতু্য: এক মাসেও কোনো উত্তর মেলেনি

রুম্পার মৃতু্য: এক মাসেও কোনো উত্তর মেলেনি
রুবাইয়াত শারমিন রুম্পা
ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্রী রুবাইয়াত শারমিন রুম্পার মৃতু্যর ঘটনায় আশপাশের ভবন থেকে উদ্ধার করা ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খুব বেশি এগোতে পারেনি পুলিশ।

তদন্তকারীরা বলছেন, রুম্পার বন্ধু আব্দুর রহমান সৈকতকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তেমন কোনো তথ্য মেলেনি। ময়নাতদন্তের একটি প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। কিন্তু বাকি পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্তের গতি থমকে আছে।

পুলিশ পরিদর্শক রোকনউদ্দিনের বড় মেয়ে রুম্পা আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে- সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।

অবশ্য রুম্পার পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ, এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। পুলিশ এখনও তদন্ত শেষ করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

রুম্পার বাবা রোকনউদ্দিন শুক্রবার বলেন, 'পুলিশ সৈকতকে গ্রেপ্তার করে চারদিন রিমান্ডে নিয়েছিল। কিন্তু কী পেল তার কাছ থেকে?'

আর তদন্তে ঢিলেমির অভিযোগ এনে রুম্পার মা নাহিদা আক্তার পারুল বললেন, 'মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এ পর্যন্ত মাত্র একদিন তাদের বাসায় গিয়েছেন কথা বলতে। এভাবে আমার মেয়েকে হত্যা করা হলো, আর তদন্ত হচ্ছে এত ধীরগতিতে! আমরা তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে দিতে আবেদন করব।'

গত ৪ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোডে আয়েশা শপিং কমপেস্নক্সের পেছনের গলি থেকে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী রুম্পার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

আশপাশের কোনো ভবন থেকে পড়ে ওই তরুণীর মৃতু্য হয়েছে বলে ধারণা করলেও সেই রাতে তাকে শনাক্ত করা যায়নি। পরদিন পরিবারের সদস্যরা মর্গে গিয়ে রুম্পাকে শনাক্ত করেন।

ঘটনাটি রহস্যজনক হওয়ায় রমনা থানার এসআই আবুল খায়ের সেই রাতেই অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর ১১ ডিসম্বের রুম্পার বন্ধু আব্দুর রহমান সৈকতকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের বিবিএর ছাত্র সৈকতের সঙ্গে রুম্পার প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রীর সহপাঠীদের ভাষ্য। সৈকতও আগে স্ট্যামফোর্ডে পড়তেন।

রুম্পার লাশ শনাক্ত হওয়ার পর স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একে হত্যাকান্ড দাবি করে তার বিচারের দাবিতে সড়কে নামে। তাদের মুখে আসে সৈকতের নাম, পস্ন্যাকার্ডে ধর্ষণের অভিযোগও লেখা হয়।

১২ ডিসেম্বর সৈকতকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক শাহ মো. আকতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, '৪ ডিসেম্বর রাতে রুম্পার লাশ পাওয়ার আগে বিকালে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাসের বাইরের রাস্তায় তাকে সৈকতের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। তখন প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কথা উঠলে আসামি সৈকত কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য রুম্পাকে অনুরোধ করলে তাদের মধ্যে মনোমালিন্যসহ বিরোধ চরম আকার ধারণ করে মর্মে সাক্ষ্য-প্রমাণ আসিতেছে। এরই প্রেক্ষিতে উক্ত মনোমালিন্যের পর রাত ২২:৪৫ ঘটিকায় ভিকটিমকে উক্ত আসামিসহ তার সহযোগী অজ্ঞাতনামা আসামিরা মিলে হত্যাকরত লাশ ছাদ থেকে ফেলে দেয় মর্মে জোর সন্দেহ করা হইতেছে।'

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটো টিউশনি করতেন রুম্পা। সেদিনও সন্ধ্যার আগে শান্তিবাগের বাসা থেকে টিউশনিতে বেরিয়েছিলেন। পরে সাড়ে ৬টার দিকে বাসার নিচে এসে ফোন করে পুরনো একজোড়া স্যান্ডেল পাঠিয়ে দিতে বলেন। স্যান্ডেল বদলানোর সময় কানের দুল, আংটি, মোবাইল ফোন দিয়ে আবার বেরিয়ে যান তিনি।

যে তিনটি ভবনের মাঝে রুম্পার মৃতদেহ পাওয়া গেছে, সেখানকার একটি ভবনের প্রবেশমুখে সন্ধ্যা ৬টা ২৭ মিনিটে রুম্পার শারীরিক গঠনের মতো একজনকে ঢুকতে দেখা গিয়েছিল সিসিটিভি ভিডিওতে। কিন্তু তিনি রুম্পাই কিনা, সে বিষয়ে অস্পষ্ট ওই ছবি দেখে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শামসুল আরেফিন বলেন, 'ঘটনাস্থল থেকে চারটি সিসিটিভির ফুটেজ আমরা সংগ্রহ করেছি। কিন্তু আয়েশা শপিং কমপেস্নক্স অনেক বড়, আর প্রবেশপথও অনেকগুলো। যেসব ফুটেজ পেয়েছি সেগুলোর মানও ভালো না। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না- কে ঢুকছে আর কে বের হচ্ছে।'

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, 'সেখানে দুই ভবনের মধ্যে একটি কানেকটিং ব্রিজে ক্যামেরা আছে, কিন্তু ঘটনার সময় সেগুলো ছিল বিকল। ফলে সেই ফুটেজ সংগ্রহ করা যায়নি। আর সবগুলো ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও আমরা পাইনি। সব পাওয়া গেলে তদন্ত আরও বেগবান হবে।'

রুম্পার ময়নাতদন্তের তিনটি প্রতিবেদনের মধ্যে একটি ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন ঢাকা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ।

সে সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'ময়নাতদন্তের সময় যেসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছিল পরীক্ষার জন্য। তার মধ্যে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল রিপোর্ট এসেছে, সেখানে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। আরও দুটি বাকি আছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হবে।'

রুম্পাকে হত্যা করা হয়েছে, না তিনি আত্মহত্যা করেছেন- সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার আগে করতে চাননি এই চিকিৎসক।

তদন্তে ঢিলেমির অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. ইলিয়াসে হোসেন শুক্রবার বলেন, 'কি বলব, উনি উনার মেয়েকে হারিয়েছেন, তাই অভিযোগ করা স্বাভাবিক। তবে তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে এটুকু বলতে পারি। আমার হাতে গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি মামলা রয়েছে।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে