logo
বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  নূর মোহাম্মদ   ০৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন

দেশে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে

দেশে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে
বাংলাদেশে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীরা
বাংলাদেশে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। ২০১৭ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এক বছরে কমেছে ২৪৮ জন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার দিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে থাকলেও বেড়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার মান অবনমন, নিরাপত্তা সমস্যাসহ নানা কারণে বিদেশি শিক্ষার্থী আসা কমেছে বলে মনে করেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে না-এ নির্দেশনায় এ সংখ্যায় আরও ধস নামতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে তুলে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রমের সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ৪৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ২০১৮ সালের বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে। এর দুই বছর আগে ২০১৬ সালে ১ জুলাই ঢাকায় হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর বিদেশি শিক্ষার্থীদের আসার পরিমাণ কমতে থাকে। যেটা ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এসেও বহাল থাকে। তবে ২০১৯ সালে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছে মঞ্জুরি কমিশনের কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ডিসেম্বর মাসে একটি নতুন নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। নির্দেশনা অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে না। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ করে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাবে। কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার আড়ালে নানা ধরনের অপরাধমূলক, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কার্যক্রমের অভিযোগ রয়েছে। তাদের ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর না নিয়েই ভর্তি করানো হতো। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে আসার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে ভর্তি করানোর নির্দেশনা জারি করা হয়। অনুমতি দেওয়ার আগে বিদেশি শিক্ষার্থীর তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করবে। এর ফলে অসৎ উদ্দেশে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাবে।

জানা গেছে, একসময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু শিক্ষার মান, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার সমস্যাসহ নানা কারণে গত এক যুগ ধরে এ সংখ্যা কমে আসছে। মঞ্জুরি কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এ ৮ বছরের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। ২০১০ সালে যেখানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৫৯ জন, সেটি ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৮০৪ জন। তবে মাঝখানের বছরগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উঠানামা কমেছে। ২০১৭ সালে ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৬১ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করেছে। ২০১৮ সালে এসে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে

\হ৮০৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৩৪৩ জন। তাছাড়া ২০১১ সালে ২১০ জন, ২০১২ সালে ৫২৫ জন, ২০১৩ সালে ৩২৬ জন, ২০১৪ সালে ৪৩২ জন, ২১০৫ সালে ৫৯৩ জন, ২০১৬ সালে ৩৫৫ জন, ২০১৭ সালে ৪৬১ জন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে অধ্যয়নরত ছিলেন।

অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানের ৫৯১ জন কমেছে। ২০১৮ সালে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৩৮৬ জন। এর আগের বছর ২০১৭ সালে সেটি ছিল ১৯৭৭ জন। এক বছরে কমেছে ৫৯১ জন। মঞ্জুরি কমিশনের তথ্যমতে, উচ্চশিক্ষার জন্য এ পর্যন্ত মোট ৩৩টি দেশের শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। ২০১৮ সালে ৯১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও মাত্র ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল। ইউজিসি তার প্রতিবেদনে বলেছে, প্রতি বছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও ২০১৮ সালে কমছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বেশ কিছু শিক্ষার্থী তাদের ক্রেডিট শেষ করে দেশে ফিরে গেছে এবং গত বছর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগাংয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল ৬১৭ জন কিন্তু ২০১৮ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা শূন্য পাওয়া গেছে।

ইউজিসির প্রতিবেদনে আরও বলেছে, বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক ডিজিটাইলাইজেশন হয়েছে। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে উচ্চশিক্ষার কোর্স কারিকুলাম, সিলেবাস, ইত্যাদি দেখে বাংলাদেশে পড়ার জন্য উদ্ধৃত হচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে আরও দেখা যায়, বেশ কয়েকটি উন্নত দেশ যেমন আমেরিকা, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে এসেছে। সে কারণে বহির্বিশ্বে একদিকে যেমন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হারও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।

২০১৮ সালে যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পড়াশোনা করতে এসেছিল সে দেশগুলো হলো ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভূটান, মালদ্বীপ, চীন, জাপান, সৌদি আরব, ইয়েমেন, প্যালেস্টাইন, গাম্বিয়া, মরক্কো, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ত, উগান্ডা, জিম্বাবুয়ে, সিয়েরালিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান, তুর্কেমিনিস্তান, বাহরাইন, লাইব্রেরিয়া, জাম্বিয়া, জিবুতি, মিয়ানমার, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান এবং ইংল্যান্ড।

এদিকে অনুমতি ছাড়া কোনো পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে না বলে গত ১১ ডিসেম্বর একটি নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্দেশনায় বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে পূর্বেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে। এ ছাড়া সরাসরি কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি না করতে সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাযথভাবে আবেদন ছাড়াই বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগ ছিল। যা সরকারের নজরে আসার পর বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ চিঠি দিয়ে অবহিত করে। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রেই এ বিধি প্রচলিত রয়েছে। এ বিধিটি বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পালন করছে না বলে অভিযোগ ছিল।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে