logo
রবিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ৬ মাঘ ১৪২৭

  সাখাওয়াত হোসেন   ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

নিরাপদ সড়ক ইসু্যতে এবার নতুন মোড়

নিরাপদ সড়ক ইসু্যতে এবার নতুন মোড়
সড়কে বিশৃঙ্খলা -ফাইল ছবি
দুই বাসের রেষারেষিতে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থীর মৃতু্যর ঘটনায় ফুঁসে ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে যানবাহনের মরণঘাতী পালস্না ঠেকাতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর কোনোটিই কাজে লাগেনি। বরং যানবাহনের রেষারেষির পাশাপাশি সড়কপথের বিশৃঙ্খলা বন্ধের নানা উদ্যোগ গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিক ও নেতাদের উলটো ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সড়কের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলায় মুখ্য ভূমিকা রাখা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের মুখোশ উন্মোচনে সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খানের প্রকাশ্য হুমকিতে সে চিত্র নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া যানবাহনের রেষারেষি বন্ধ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপরিবহণ শ্রমিকদের হাতে ট্রাফিক পুলিশের হেনস্তার ঘটনা তাদের ক্ষুব্ধ মানসিকতার স্বরূপ আরও স্পষ্ট করে তুলেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাবেক নৌমন্ত্রী ও পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান যে ভাষায় নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনকারী ইলিয়াস কাঞ্চনের মুখোশ উন্মোচনের হুমকি দিয়েছেন, তাতে মূলত এ খাতের মালিক-শ্রমিক ও নেতাদের আসল চেহারা প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলন তারা কোন দৃষ্টিতে দেখছেন তা-ও শাজাহান খানের বক্তব্যে স্পষ্ট। পরিবহণ মালিক-শ্রমিক ও নেতাদের এ ধরনের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে গণপরিবহণের রেষারেষি শেষ পর্যন্ত ভয়াবহভাবে ভিন্ন দিকে মোড় নেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন পরিবহণ খাতের পর্যবেক্ষকরা।

তাদের এ আশঙ্কা যে একেবারে অমূলক নয়, তা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তার আভাস পাওয়া গেছে। ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বাধীন সংগঠন 'নিরাপদ সড়ক চাই'-এর যুগ্ম মহাসচিব লিটন এরশাদ স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইলিয়াস কাঞ্চন সম্পর্কে শাজাহান খান জঘন্যতম মিথ্যাচার করেছেন। এ জন্য তাকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর আগেও শাজাহান খান শ্রমিকদের উসকে দিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের কুশপুত্তলিকায় আগুন জ্বালিয়েছিলেন। এরপর গোটা দেশজুড়ে প্রতিবাদে-বিক্ষোভে সবাই ফেটে পড়লে তিনি ইলিয়াস কাঞ্চনের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। এবারও তার হুমকির কারণে তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। না হলে এই মিথ্যা ও জঘন্যতম বক্তব্যের প্রতিবাদে নিসচা কর্মী ও ভক্ত সমাজ রাজপথে নামতে বাধ্য হবে বলে হুঁশিয়ার করেন লিটন এরশাদ।

এদিকে ইলিয়াস কাঞ্চন সম্পর্কে সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদে এরইমধ্যে বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে নিসচার কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ ব্যাপারে শাহাজান খান প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইলে দেশব্যাপী বড় ধরনের কর্মসূচি দেবে বলে হুশিয়ারিও জানান তারা।

অন্যদিকে এ নিয়ে নিসচার আন্দোলন কর্মসূচি প্রতিহত করতে পরিবহণ মালিক-শ্রমিকরাও গোপনে নানামুখী ছক কষছে বলে গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা মনে করছেন- নতুন সড়ক আইনে বেশকিছু অসঙ্গতি রয়েছে। যা তারা সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। এসব অসঙ্গতি দূর করে সড়ক আইন সংশোধনের ব্যাপারে প্রশাসনের মৌন সম্মতিও রয়েছে। অথচ 'নিরাপদ সড়ক চাই' সংগঠনটি এসব অসঙ্গতি রেখেই আইন কার্যকরের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। এ নিয়ে তারা সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। জনগণের মধ্যে পরিবহণ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তাই এ সংগঠনটি এখন গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে- যোগ করেন গোয়েন্দারা।

তাদের আশঙ্কা নিসচার কর্মীরা বড় ধরনের কোনো আন্দোলনে নামলে গণপরিবহণ শ্রমিকরা তাদের ওপর গোপন হামলা চালাতে পারে। এমনকি ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা প্রকাশ্যে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন গোয়েন্দারা।

এদিকে গণপরিবহণের বেপরোয়া গতি ও রেষারেষি ঠেকাতে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশও প্রায়ই ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের হাতে নানাভাবে হেনস্তা হচ্ছেন। বিশেষ করে নগর সার্ভিসের বাস-মিনিবাসে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক সদস্যরা জানান, একই রুটের এক পরিবহণের বাসের সঙ্গে অন্য পরিবহণের বাস পালস্না দিয়ে নিত্যদিন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে। তারা (ট্রাফিক পুলিশ) তা প্রতিহত করার চেষ্টা করলে বেয়াড়া চালকরা তাদের গায়ের ওপর গাড়ি তুলে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে। এমনকি অনেক সময় তারা গাড়ি থামিয়ে দলবদ্ধভাবে ট্রাফিক পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির কারণে কখনো তারা হেনস্তা করতে ব্যর্থ হলে সুযোগ বুঝে অন্য সময় দেখে নেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে।

রাজধানীর মালিবাগ বিশ্বরোডে দায়িত্বরত একজন ট্রাফিক কনস্টেবল জানান, বাহন ও ছালছাবিলসহ বিভিন্ন পরিবহণের বাস-মিনিবাস স্টপেজ থেকে যাত্রী তুলতে সারা রাস্তাতেই চালকরা বেপরোয়া গতিতে পালস্না দিয়ে গাড়ি চালায়। তারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে উলটো তাদের ভয় দেখায়। গত সপ্তাতে মালিবাগ সোহাগ কাউন্টারের সামনে ছালছাবিল পরিবহণের দুটি বাসের রেষারেষি থামাতে গিয়ে তিনি নিজেই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছিলেন- জানান ওই ট্রাফিক কনস্টেবল।

একই ধরনের অভিযোগ তুলে রামপুরা রোডে দায়িত্বরত একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, 'তাদের বিশৃঙ্খল কর্মকান্ডে বাধা দিতে গিয়ে আমরা এখন গণপরিবহণ শ্রমিকদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছি। বেয়াড়া চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর সময় কখন যেন আমাদের গায়েই গাড়ি তুলে দেয়, সব সময়ই এ ভয়ে থাকছি।'

ওই ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, সপ্তাহ দুয়েক আগে তার সহযোগী একজন কনস্টেবল সায়েদাবাদ-কুড়িল বিশ্বরোড রুটের দুটি বাসের রেষারেষি ঠেকাতে গিয়ে চালকদের ক্ষোভের শিকার হন। তারা তাকে হেনস্তার চেষ্টা চালায়। তবে তিনি দ্রম্নত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ায় সে যাত্রায় ওই ট্রাফিক কনস্টেবল রক্ষা পান। গণপরিবহণ শ্রমিকদের এ ধরনের বেপরোয়া ভূমিকার কারণে তারা অনেকে এসব ঘটনা দেখেও চোখবুজে থাকেন- যোগ করেন ওই ট্রাফিক সার্জেন্ট।

পরিবহণ খাতের পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, পরিবহণ শ্রমিকদের উচ্ছৃঙ্খলতা, চালকদের বেপরোয়া আচরণ এবং সব ধরনের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মালিকদের চুক্তিভিত্তিক গাড়ি পরিচালনার মনোভাব- এর কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয়নি। বরং সড়কে হত্যাযজ্ঞের চিত্র দিন দিন আরও কদর্য হচ্ছে। সম্প্রতি বেপরোয়া পরিবহণ শ্রমিকরা প্রকাশ্যে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে খোদ রাজধানীতে পুলিশের সামনে জাতির মুখে চুনকালি মেখে দেওয়ার মতো রাজপথে চলমান মানুষের মুখে পোড়া কালো মবিল লাগিয়ে পৈশাচিক ?উলস্নাস করেছে। অথচ এজন্য কোনো অপরাধীর শাস্তি হয়নি। যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।

এদিকে নতুন সড়ক আইনে অসঙ্গতির ধোঁয়া তুলে গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা তা কার্যকরের পথে প্রতিবন্ধকতার পাহাড় গড়ে তুললেও গণপরিবহণে রেষারেষির প্রধান যে কারণ, সেই টার্গেট ট্রিপ বন্ধে তারা দীর্ঘদিনেও কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

শ্রমিকরা বেতনে কাজ করবে, তাদের নিয়োগপত্র থাকবে, পরিচয়পত্র থাকবে- সরকারের সঙ্গে বৈঠকে গণপরিবহণ মালিকরা এ ধরনের প্রতিশ্রম্নতি দিতে সামান্য দ্বিধা না করলেও বাস্তবে তার সামান্যটুকুও পূরণ করেনি। ফলে বাস-মিনিবাসের রেষারেষি আরও পোক্ত রূপ নিয়েছে।

ছাত্র আন্দোলনের পর ঢাকায় বাস স্টপেজের জন্য ১২১টি স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিল দুই সিটি করপোরেশন। প্রথম কয়েক দিন এসব স্টপেজে বাস দাঁড়ালেও বর্তমানে বেশিরভাগ স্টপেজেই বাস থামছে না। একই অবস্থা চলন্ত অবস্থায় বাসের দরজা লাগিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও। বরং এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে হেনস্তা হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য যাত্রী। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অনেক সময় এর হাত থেকে রক্ষা পাননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, 'মালিকদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। ট্রিপ অনুযায়ী অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ দৈনিক টাকা দেওয়ার ভিত্তিতে চালকদের হাতে গাড়ি দিয়ে দেওয়াই সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ।?চালকরা যেহেতু নির্দিষ্ট বেতন পান না তাই তারা বেশি ট্রিপ মেরে বেশি টাকা আয় করতে চান।?

তিনি আরও বলেন, 'এখন এই মালিকরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের কেউ সংসদ সদস্য অথবা তারা আমলা বা পুলিশের লোক। ফলে আইন করে পরিবহণ ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনা কঠিন।?
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে