logo
রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

যুদ্ধাপরাধ: বাবা-ছেলেসহ ৫ রাজাকারের ফাঁসির রায়

যুদ্ধাপরাধ: বাবা-ছেলেসহ ৫ রাজাকারের ফাঁসির রায়
ক্লকওয়াইজ- মো. আবদুল জব্বার মন্ডল, মো. জাছিজার রহমান, মো. আবদুল ওয়াহেদ মন্ডল, মো. রঞ্জু মিয়া, মো. আজগর হোসেন খান (মৃত) ও মো. মনতাজ আলী বেপারি -সংগৃহীত
যাযাদি রিপোর্ট

একাত্তরে গাইবান্ধা সদরে অপহরণ, নির্যাতন, লুটপাট, হত্যা ও দেশত্যাগে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে বাবা-ছেলেসহ পাঁচ আসামির ফাঁসির রায় এসেছে যুদ্ধাপরাধ আদালতে।

বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল মঙ্গলবার এ মামলার রায় ঘোষণা করে।

সর্বোচ্চ সাজার আদেশ পাওয়া পাঁচ আসামি হলেন- মো. রঞ্জু মিয়া, আবদুল জব্বার মন্ডল, তার ছেলে মো. জাছিজার রহমান খোকা, মো. আবদুল ওয়াহেদ মন্ডল ও মো. মনতাজ আলী বেপারি ওরফে মমতাজ। তাদের মধ্যে কেবল রঞ্জু মিয়া রায়ের সময় আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন, বাকিরা মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

পাঁচ আসামির সবাই গাইবান্ধা সদর উপজেলার নান্দিনা ও চক গয়েশপুর গ্রামের বাসিন্দা। একাত্তরে তারা সবাই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সদস্য।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ নিয়ে তারা রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখান এবং ওই এলাকার বিভিন্ন গ্রামে যুদ্ধাপরাধ ঘটান বলে উঠে এসেছে এ মামলার বিচারে।

১৭৬ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত বলেছে, আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা চারটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগেই আসামিদের দেওয়া হয়েছে মৃতু্যদন্ড।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাইবু্যনালের প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, "তাদের অপরাধ বিবেচেনা করে আদালত মৃতু্যদন্ডের রায় দিয়েছে; এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।"

অন্যদিকে আসামি রঞ্জু মিয়ার আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, "আমরা সংক্ষুব্ধ। কারণ আমার যিনি মক্কেল, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৪ বছর। শান্তিবাহিনী গঠন বা রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার মতো বয়স তখন তার ছিল না।"

আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল হাসানই এ মামলার পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে শুনানি করেন।

তাদের বিষয়ে আবুল হাসান বলেন, "রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে তাদের এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা সর্বোচ্চ আদালতে যাব।"

নিয়ম অনুযায়ী, রায়ের এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন আসামিরা। তবে সেই সুযোগ নিতে হলে পলাতকদের আগে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনালে এ পর্যন্ত রায় আসা ৪০টি মামলার ১০২ জন আসামির মধ্যে ছয়জন বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মোট ৯৪ জনের সাজা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬৭ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার রায় এসেছে।

যুদ্ধাপরাধী বাবা-ছেলে: এ মামলায় মোট আসামি ছিলেন ছয়জন। তাদের মধ্যে আজগর হোসেন খান মামলার তদন্ত চলাকালেই মারা যান। ২০১৮ সালের ১৭ মে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বাকি পাঁচ আসামির যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে ট্রাইবু্যনাল।

আসামিদের মধ্যে গ্রাম্য চিকিৎসক আব্দুল জব্বার মন্ডলের বয়স এখন ৯০ বছর। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে থেকেই তিনি জামায়াতে ইসলামীতে সক্রিয় ছিলেন।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে শান্তি কমিটি এবং রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। পরে জেলা সদরের শাহপাড়া ইউনিয়নের রাজাকার বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব পান।

তার ছেলে জাছিজার রহমান ওরফে খোকার বয়স ৬৫ বছর। বাবার মতো তিনিও জামায়াতে ইসলামীতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গাইবান্ধা জেলা সদরে যে নৃসংশতা চালায়, তাতে রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন তিনি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে দালাল আইনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বাবা-ছেলে দুজন। কিন্তু তখন তাদের বিচার হয়নি।

পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে জাছিজার পুলিশে যোগ দেন, ২০১৪ সালে তিনি অবসর নেন।

এছাড়া আসামি মো. আব্দুল ওয়াহাব মন্ডল, মো. মনতাজ আলী বেপারী ওরফে মমতাজ এবং মো. রঞ্জু মিয়াও একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে উলেস্নখ করা হয় মামলার অভিযোগপত্রে।

মামলা বৃত্তান্ত

গাইবান্ধার ছয় আসামির বিরুদ্ধে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হয় ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর।

প্রসিকিউশনের আবেদনে ২০১৬ সালের ২৯ মে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তার আগেই সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ওই বছরের ১৭ ফেব্রম্নয়ারি মো. রঞ্জু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পরে ওই বছরের ২৭ জুলাই তাকে ট্রাইবু্যনালে হাজির করা হলে ট্রাইবু্যনাল তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

২০১৭ সালের ৭ মার্চ তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন প্রসিকিউশনে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তার আগেই ২০১৬ সালের ৩ ডিসেম্বর আসামি মো. আজগর হোসাইন খান মারা যান।

ফলে ২০১৭ সলের ৯ মার্চ প্রসিকিউশন আজগরকে বাদ দিয়ে বাকি ৫ আসামির বিরুদ্ধে ট্রাবু্যনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।

প্রসিকিউশন ও আসামি পক্ষের আইনজীবীর শুনানির পর গত বছরের ১৭ মে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

কোন অভিযোগে কার সাজা

১৯৭১ সালের ১৪ জুন সকাল ১০টার দিকে আসামিরা হেলাল পার্ক আর্মি ক্যাম্প থেকে এসে গাইবান্ধা সদর থানার বিষ্ণুপুর গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালায়।

তারা অম্বিকা চরণ সরকারের বাড়িতে ঢুকে তাকে বন্দি করে অমানবিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের পর অম্বিকা চরণকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যাওয়ার সময় আসামিরা বাড়িতে লুটপাট চালায়।

আসামিরা সেদিন একই গ্রমের দ্বিজেন চন্দ্র সরকার ও আব্দুল মজিদ প্রধানকে তাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে এবং তাদের বাড়িতে লুটপাট চালায়।

ওই গ্রামের ফুল কুমারী রানী ও তার ননদ সাধনা রানী সরকারকে (বর্তমানে মৃত) আটক করে জোর করে ধর্মান্তরিত করে আসামিরা।

এছাড়া আব্দুল মজিদ প্রধান ও দ্বিজেন চন্দ্র সরকারকে সেদিন ধরে গাইবান্ধা পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে হত্যা করা হয়। আসামিরা সাহাপাড়া ইউনিয়নের তিন থেকে চারশ হিন্দু লোকজনকে দেশত্যাগ করাতে বাধ্য করে।

এ অভিযোগে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটতরাজ, হত্যা, দেশত্যাগে বাধ্য করার দায়ে পাঁচ আসামি রঞ্জু, জব্বার, খোকা, ওয়াহেদ ও মমতাজকে মৃতু্যদন্ড দিয়েছে আদালত।

অভিযোগ-২

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে আসামিরা ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে গাইবান্ধা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনা গ্রামে হামলা চালায়।

তারা ওই গ্রামের আবু বক্কর, তারা আকন্দ, আনছার আলী এবং নছিম উদ্দিন আকন্দকে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

এছাড়া একই গ্রামের সামাদ মোলস্না, শাদা মিয়া, ফরস উদ্দিন ও সেকান্দার আলী মোলস্নাকে বাড়ির সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয়। ৪০ থেকে ৫০টি বাড়ির মালামাল লুট করার পর সেগুলো পুড়িয়ে দেয় আসামিরা।

এ অভিযোগে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার দায়ে জব্বার, খোকা, ওয়াহাব ও মমতাজকে মৃতু্যদন্ড দিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবু্যনাল।

অভিযোগ-৩

১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর আসামিরা ২৫ জন সশস্ত্র রাজাকার ও ৩০ জন পাকিস্তানি সেনাকে নিয়ে জেলা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে লাল মিয়া বেপারী, আব্দুল বাকী এবং খলিলুল রহমান, দুলাল মিয়া, মহেশ চন্দ্র মন্ডলকে হত্যা করে।

এ ঘটনায় অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামি জব্বার, খোকা, ওয়াহাব ও মমতাজকে প্রাণদন্ড দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ-৪

১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর আসামিরা জেলা সদরের সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনা, মিরপুর, সাহারবাজার, কাশদহ, বিসিক শিল্পনগরী, ভবানীপুর ও চকগায়েশপুর গ্রামে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক, ইসলাম উদ্দিন এবং নবীর হোসেনসহ মোট সাতজনকে গুলি করে হত্যা করে।

এ ঘটনায় অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার দায়ে পাঁচ আসামির সবাইকে প্রাণদন্ড দিয়েছে আদালত।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে