logo
শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদ ত্রাণের জন্য হাহাকার

বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদ ত্রাণের জন্য হাহাকার
বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠেছে ভেলা। ছবিটি ফরিদপুরের গদাধরডাঙ্গী এলাকা থেকে তোলা -যাযাদি
ফরিদপুর, শেরপুর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। নতুন করে পস্নাবিত হয়েছে রাজবাড়ীর বিস্তীর্ণ এলাকা। জামালপুরের বকশীগঞ্জে বন্যার পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে শিশুসহ আটজনের মৃতু্য হয়েছে। দুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ না পৌঁছানোয় জনদুর্ভোগ বেড়েছে চরমভাবে।

আমাদের স্টাফ রিপোর্টার, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

সদরপুর (ফরিদপুর): ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা আড়িয়াল নদে সম্প্রতি পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনটি চরাঞ্চল পস্নাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার। পানি ঘরে ওঠায় চরম বিপাকে রয়েছে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। দুর্যোগ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে খেটে খাওয়া হতদরিদ্ররা।

চরনাছিরপুর ইউনিয়নের মোল্যাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রাজ্জাক জানান, নদের পানি বসতঘরে ঢুকে পড়ায় পানির ওপর বাঁশের খুঁটি গেড়ে খোলা আকাশের নিচে পরিবার নিয়ে কোনমতে টিকে আছেন।

পদ্মা আড়িয়াল নদীতে ভাঙন অব্যাহত হয়েছে। ভাঙনের মুখে শতাধিক ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ায় এসব বাড়ির মানুষ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত পস্নাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। উপজেলার চরনাছিরপুর, দিয়ারা নারিকেল বাড়িয়া, ঢেউখালী ও চরমানাইর চারটি ইউনিয়নে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। তলিয়ে গেছে প্রায় তিন হাজার বিঘা ফসলি জমি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে এ বছর চরমানাইর ইউনিয়নে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি ইউনিয়নের বেশকিছু গ্রাম। আড়িয়াল খাঁ নদের পানির তীব্র স্রোতে উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া এলাকায় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। নদে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। পানিবন্দি থাকায় চরাঞ্চলের ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১টি মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে অপ্রতুল ত্রাণের অভিযোগ করেছেন পানিবন্দি মানুষেরা। তাদের দাবি, সরকারিভাবে যে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার পূরবী গোলদার বলেন, বন্যায় পানিবন্দি পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

শেরপুর: শেরপুরের সদর উপজেলার ১৪ ইউনিয়নের সবগুলোই বন্যাকবলিত হয়েছে। রোববার সকাল থেকে পানি বৃদ্ধি না হলেও বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বাড়িঘরসহ রাস্তা-ঘাট, ক্ষেত-খামার তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে বানভাসিরা।

বন্যাকবলিত এলাকা ও আক্রান্ত মানুষের তুলনায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের পরিমাণ খুবই অপ্রতুল। তিন দিন ধরে বন্যার্তদের ত্রাণ দিচ্ছেন স্থানীয় প্রশাসন। খাবার স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের অভাবে বিশুদ্ধ পানির অভাব লক্ষ করা গেছে।

চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) : ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যার কারণে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। অনেক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে বন্যাকবলিত মানুষ।

উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, সদর ইউনিয়নের মোল্যা ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফাজেলখার ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরঝাউকান্দা ইউনিয়নের উ: নবাবগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয়, বাহারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যার কবলে পড়েছে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল মো. বাহাউদ্দীন বলেন, বন্যাকবলিত বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই চরাঞ্চলে অবস্থিত। নিম্নাঞ্চল হওয়াতে বিদ্যালয়গুলো পস্নাবিত হয়েছে। কিছু বিদ্যালয়ে বন্যাকবলিত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। যে কারণে সাময়িকভাবে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) : কুড়িগ্রামের চিলমারীতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েক গুণ। রোববার দুপুরে ব্রহ্মপুত্রের পানি কমলেও চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি কমলেও খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, গো-খাদ্য, জ্বালানি ও শৌচাগারের অভাব তীব্র হচ্ছে। চিলমারী উপজেলার ৩০ হাজার ৯৩৯টি পরিবারের মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি পরিবার পুরোপুরি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

রাজবাড়ী : রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার। পস্নাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। উঁচু স্থান ও শহর রক্ষাবাঁধের ওপর আশ্রয় নিচ্ছে মানুষ। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট, পাংশা উপজেলার হাবাসপুর, কালুখালী উপজেলার কালিকাপুর, রতনদিয়া, গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া, দেবোগ্রাম ইউনিয়নসহ মোট ৭টি ইউনিয়নের প্রায় ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পয়ে পড়েছে। ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন অনেকে। রাজবাড়ীর পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি প্রবেশ করায় এরই মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার ফুরসাহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোয়ালন্দ উপজেলার তেনাপচা ও চান খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে এবারের বন্যা মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার পাঁচটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা করা হয়েছে। জেলার আশ্রয়ণ শেল্টারগুলোকে প্রস্তুত করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে ৪৯টি মেডিকেল টিম।

বকশীগঞ্জ (জামালপুর) : জামালপুরের বকশীগঞ্জে ভয়াবহ বন্যায় গত পাঁচ দিনে প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় পানিতে ডুবে এখন পর্যন্ত পাঁচজন শিশুসহ সাতজনের মৃতু্যর খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বিষাক্ত সাপের কামড়ে একজন নিহত হয়েছেন।

জানা গেছে, বুধবার মেরুরচর ইউনিয়নের জাগিরপাড়া গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে মাসুদ মিয়ার ছেলে মিনহাজ উদ্দিন (৫) মারা যায়। একই দিন সাধুরপাড়া ইউনিয়নের বটটলা গ্রামের ফারুক মিয়ার মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলে মাজ্জাদ হোসেন (১১) পানিতে ডুবে নিখোঁজ হলে একদিন পর তার লাশ ভেসে ওঠে। বৃহস্পতিবার সকালে সাধুরপাড়া ইউনিয়নের উত্তর ধাতুয়া কান্দা গ্রামের শহীরুদ্দিনের মেয়ে শরীফা আক্তার (৫) পানিতে ডুবে মারা যায়।

শুক্রবার সকালে মাছ ধরতে গিয়ে পানিতে ডুবে আবু বক্কর (৫৫) নামে এক ব্যক্তি মারা যান। তার বাড়ি বগারচর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে। একই দিন বিকালে শাকিব খান (৫) নামে এক শিশুর মৃতু্য হয়। গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ হয় সুজন মিয়া (২৫) নামে এক পান ব্যবসায়ী। শুক্রবার বিকাল ৫টায় মেরুরচর ইউনিয়নের ঘুঘরাকান্দি ব্রিজের নিচে গোসল করতে যায় সে। বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করার সময় প্রবল স্রোতে ভেসে যায় সুজন। পরে রোববার সকালে উপজেলার মাইছানিরচর এলাকায় তার মরদেহ ভেসে ওঠে। তার বাড়ি বকশীগঞ্জ পৌর এলাকার চর কাউরিয়া সীমারপাড় গ্রামে।

শনিবার সকাল ১১টার দিকে নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কুশলনগর গ্রামে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রাহাত মিয়া (১০) নামে এক শিশুর মৃতু্য হয়। রাহাত ওই গ্রামের হামিদুল ইসলামের ছেলে। একই দিন দুপুরে বকশীগঞ্জ ইউনিয়নের ঝালুরচর পশ্চিমপাড়া গ্রামের রাজা বাদশা (৫৫) নামে এক ব্যক্তি সাপের কামড়ে মারা যান।

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ): যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও বসতভিটা এখনো পানিতে ভাসছে। চলতি বন্যায় যমুনার চরাঞ্চলসহ ডুবে গেছে প্রায় প্রত্যেকটি গ্রাম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট এখনো পানির নিচে। বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, ওষুধ ও বাসস্থান সংকটে পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষ।

উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের পুরোটাই এখন বন্যাক্রান্ত। পানিবন্দি হয়ে প্রায় ৭০ হাজারের মতো মানুষ এখন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বিশেষ করে বাঘুটিয়া, খাষপুখুরিয়া, উমারপুর, স্থল ও ঘোরজান ইউনিয়নের মানুষেরই দুর্ভোগ বেশি।

উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের নদীভাঙনকবলিত পারবাসি নিজেদের বসতভিটা বাড়িঘর ছেরে ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে খোলা আকাশের নিচে নানা সমস্যায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।

চৌহালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. ফারুক সরকার জানান, টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে উপজেলার নিম্ন্নাঞ্চলসহ প্রত্যেক গ্রাম পানিতে ভাসছে। বান ও নদীভাঙন কবলিত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী ও ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম : জেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলেও মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ। জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে বন্যায় ৫৭টি ইউনিয়নের সাড়ে ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। ক্ষতি হয়েছে ২০ হাজার হেক্টর ফসলি জমির। ১ হাজার ২৪৫ কিলোমিটার রাস্তা, ৪০ কিলোমিটার বাঁধ, ৯ হাজার ৭৩৪টি নলকূপ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়াসহ পানিবন্দি হয়েছে প্রায় দুই লক্ষাধিক গবাদিপশু।

বগুড়া: বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। পানি কমে বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তবে বাঙালি নদীর পানি অস্বাভাবিক বেড়ে বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে হচ্ছে। নদীতীরবর্তী বেশ কিছু পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। দুর্ভোগে আছে তিনটি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ।

বগুড়ায় যমুনার পানি কমলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সবচেয়ে দুর্ভোগে রয়েছে সারিয়াকান্দির চর এলাকার মানুষেরা।

বন্যাকবলিত সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের ১২৯টি গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

এদিকে বন্যার্তদের মধ্যে সরকারি ত্রাণের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন ত্রাণ বিতরণ করছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে