logo
বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ০৯ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০  

গাজীপুর-যশোরে কড়াকড়ি আরোপ

রংপুরে সান্ধ্য আইন নারায়ণগঞ্জ অবরুদ্ধ

করোনা প্রতিরোধে অঘোষিত 'লকডাউন' চলছে লালমনিরহাট, ঝালকাঠিতে। প্রবেশে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে যশোর ও গাজীপুরে

রংপুরে সান্ধ্য আইন নারায়ণগঞ্জ অবরুদ্ধ
করোনার সংক্রমণ মোকাবিলায় বুধবার থেকে নারায়ণগঞ্জকে সম্পূর্ণ লকডাউন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জেলায় প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। ছবিটি সাদ্দাম মার্কেটের সামনে থেকে তোলা -ফোকাস বাংলা
একমাস আগে দেশে প্রথমবারের মতো কারও দেহে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার পর গতকাল একদিনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৪ জন। যা ছিল দেশে একদিনে আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় দেশজুড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন বিধি-নিষেধে অঘোষিত লকডাউনের পাশাপাশি ঘোষিত লকডাউন করা জেলার সংখ্যাও বাড়ছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে বুধবার নারায়ণগঞ্জ জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে, রংপুরে জারি করা হয়েছে সান্ধ্যআইন। পাশাপাশি অঘোষিত 'লকডাউন' চলছে লালমনিরহাট, ঝালকাঠিতে। প্রবেশে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে যশোরে ও গাজীপুরে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে রংপুর নগরীতে সান্ধ্যআইন জারি করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। এই আইনে প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত ওষুধের দোকান ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে।

এছাড়াও মেট্রোপলিটন এলাকায় জরুরি সেবা, চিকিৎসা, ভোগ্য ও রপ্তানি পণ্য পরিবহণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ও যানবাহন ছাড়া সব ধরনের ব্যক্তি ও যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে।

এ নিয়ে নগরজুড়ে মাইকিং করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে র?্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল আলিম মাহমুদ জানান, মানুষকে ঘরবন্দি করতে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে নানা ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের উপস্থিতি পেলে সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। আর চোখের আড়াল হলেই বেড়ে যায় মানুষের চলাচল।

তিনি বলেন, মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটায় নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডে ভ্রাম্যমাণ দোকান স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মেট্রোপলিটন পুলিশের হটলাইনে ফোন করলে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য পৌঁছে যাবে ক্রেতার বাড়িতে। ওষুধ থেকে শুরু করে সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করবে এই ভ্রাম্যমাণ দোকান। এরপরও মানুষ সচেতন হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়েই এই সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। কেউ এ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেলেই নগরীতে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করা হবে।

জেলা প্রশাসক আসিব আহসান জানান, স্বল্পমূল্যে চাল, আটা ও টিসিবির পণ্য বিক্রিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একসঙ্গে কাজ করছে। জনসমাগম রোধে ইতোমধ্যে বিকেল ৫টার পর জেলার সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ লকডাউন

মঙ্গলবার রাতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলাকে লকডাউন ঘোষণার পর থেকেই তা কার্যকর শুরু হয়। রাতে গোটা শহর জনশূন্য হয়ে পড়ে। বুধবার সকাল থেকেইর্ যাব পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা মাইকিং করে লকডাউনের বিষয়টি মানুষকে অবগত করেন এবং যার যার ঘরে থাকার আহ্বান জানান।

জেলাকে পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা করা হলেও মানুষের মধ্যে এখনো সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রশাসন কঠোর অবস্থায় নামলেও রাস্তায় লোকজনের চলাচলসহ বিভিন্ন পাড়ামহলস্নায় মানুষকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। যার কারণে করোনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।

তবে পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, মানুষকে ঘরে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সব ধরনের প্রক্রিয়া অবলম্বন করছে। প্রয়োজনে আরও কঠোর হবে।

তবে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, মানুষের চলাফেরা রোধ করতে জনপ্রতিনিধিসহ জেলা প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছেন। কেউ লকডাউন ভঙ্গ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি হুশিয়ারি দেন।

এদিকে শিল্পসমৃদ্ধ জেলা নারায়ণগঞ্জের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে যতদ্রম্নত সম্ভব করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষাগার (ল্যাবরেটরি) প্রতিষ্ঠা করতে সরকারের কাছে দাবি করছেন সাংবাদিক সমাজের নেতারা।

লালমনিরহাট কার্যত 'লকডাউন'

লালমনিরহাট জেলাকে আক্ষরিক অর্থে 'লকডাউন' ঘোষণা না করা হলেও জেলায় সব ধরনের যানবাহন প্রবেশ ও জেলা থেকে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলার অভ্যন্তরে সব ধরনের যানবাহন, দোকানপাট, সাপ্তাহিক হাটবাজার, প্রতিষ্ঠান এবং গণপরিবহণ বন্ধ থাকবে।

পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এ নির্দেশনা বলবৎ থাকবে। বুধবার লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে এ আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্যের দোকান সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। তবে ওষুধের দোকান সারাদিন খোলা থাকবে।

ঝালকাঠিতে অঘোষিত 'লকডাউন'

ঝালকাঠিতে চলছে অঘোষিত 'লকডাউন'। বুধবার সকাল থেকে শহরের সবগুলো সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। বাঁশ দিয়ে সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে পুলিশের কয়েকটি টিম শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়েছে। অহেতুক বাইরে বের হওয়া জনসাধারণকে ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ ছাড়াও সুগন্ধা নদীর সবগুলো খেয়া বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

শহরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, বাসস্ট্যান্ড, চাঁদকাঠি চৌমাথা, ফায়ার সার্ভিস মোড়, কলেজ মোড়, সদর চৌমাথা, পূর্বচাঁদকাঠি, প্রেস ক্লাব মোড়, কলেজ মোড়, লঞ্চঘাট এলাকায় বাঁশ দিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে পুলিশ। এসব স্থান দিয়ে যানবাহনই নয়, জনসাধারণকেও যাতায়াত করতে দেওয়া হচ্ছে না। উলেস্নখযোগ্য কারণ বলার পরে, দু-একজনকে যেতে দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি রিকশা শহরে বের হলেও পুলিশ যাত্রী নামিয়ে তাদের বাড়ি ফিরে যেতে বলছে। শহরের কলেজ খেয়াঘাট ও পৌরসভা খেয়াঘাট এলাকায় পুলিশ অবস্থান নিয়ে লোকজনকে বাড়ি ফিরিয়ে দিচ্ছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে খেয়া চলাচল।

ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম মাহমুদ হাসান বলেন, ঝালকাঠি জেলাকে নিরাপদ রাখতে শহরের প্রবেশদ্বারসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বাঁশ দিয়ে সড়ক আটকে দিয়েছে। যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না।

যশোরে প্রবেশে বিধিনিষেধ

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে যশোরে প্রবেশে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে কোনো লোকজনকে যশোরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। জরুরি কোনো প্রয়োজনে বাইরের জেলা থেকে যশোরে প্রবেশ করতে হলে অবশ্যই যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। এ জেলার অধিবাসীদের ক্ষেত্রেও এই আদেশ প্রযোজ্য।

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ মঙ্গলবার মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ ঘোষণা দেন। ফেসবুকে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে তিনি এ ব্যাপারে প্রবেশকারী ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সচেষ্ট ভূমিকা রাখার জন্য আহ্বান জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যশোরের জেলা প্রশাসক বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বলেন, 'আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ বিচ্ছিন্ন ঘোষণার পর সেখান থেকে মানুষ যশোরে ফিরতে শুরু করেছে। যানবাহন বন্ধ থাকলেও মানুষ পায়ে হেঁটেসহ বিভিন্নভাবে যশোরে প্রবেশ করছে। যশোরকে করোনা মুক্ত রাখতে লোকজন প্রবেশে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। এখানে কাউকে প্রবেশ করতে হলে ইউএনও বা জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। তাহলে আমরা বুঝতে পারব, কোন এলাকায় কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্তত ওই এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের কাছে তথ্য দিতে পারব। এ জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর- ০১৩১৮-২৫২৯২৫, ০১৩১৮-২৫২৯৫০, ০৪২১-৭১০০০, ০৪২১-৭১০০১।'

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, 'যশোরে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের পর সকাল থেকে বেশ কয়েকজনের তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। তারা নারায়ণগঞ্জ থেকে যশোরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এ ধরনের লোকজনের ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।'

গাজীপুরে 'কড়াকড়ি আরোপ'

আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, কারোনা ভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে গাজীপুরকে লকডাউন করা হয়নি। তবে গাজীপুরে যানবাহন ও লোক চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশ ও জেলা প্রশাসন।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রোগ সংক্রমণ ও মৃতু্যর হার ভয়াবহ পরিস্থিতি হলে এবং বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ আইইডিসিআর'র নির্দেশনা ছাড়া কোনো এলাকা লকডাউন করা যায় না।

তিনি আরও বলেন, 'এখনও গাজীপুরে লকডাউন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকাসহ আশপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আমরা মঙ্গলবার হতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় জরুরি সেবায় যুক্তদের ছাড়া কাউকে প্রবেশ কিংবা বের হওয়াতে শতভাগ 'কড়াকড়ি আরোপ' করেছি মাত্র। এজন্য মহানগরীর ১০টি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং মেট্রোপলিটন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। উপযুক্ত কারণ ছাড়া গাজীপুর মহানগরীতে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও অপরাধ কর্মকান্ড বন্ধে কাজ করছেন তারা। লকডাউনের কথা বলে কাউকে মহানগরীরর নাগরিকদের বিভ্রান্ত না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। লকডাউন করা হলেও আমরাই ঘোষণা দেব।'

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম বলেন, 'গাজীপুর সিটি করপোরেশনে এলাকায় যানবাহন প্রবেশ কিংবা বের হওয়াতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনামতে লকডাউন করা হবে।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে