logo
মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  সাখাওয়াত হোসেন   ০২ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০  

ত্রাণ নেওয়ার ভিড়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি

ত্রাণ নেওয়ার ভিড়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি
ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে অসহায়দের মধ্যে খাদ্যসহায়তা বিতরণের সময় এভাবেই ভিড় করেন মানুষ। এতে বাড়ছে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি -যাযাদি
ঘড়ির কাঁটায় বেলা ২টা ৪০ মিনিট। করোনা প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি ছুটি এবং বাস-ট্রেনসহ সব গণপরিবহণ চলাচল বন্ধ থাকায় চৈত্রের এ ভরদুপুরে গোটা রাজধানী যেন স্তব্ধ। অথচ এ সময় মধুবাগ দিয়ে হাতিরঝিলে ঢুকতেই দেখা গেল ওভারব্রিজ থেকে শুরু করে বেগুনবাড়ি পর্যন্ত অন্তত হাজারখানেক নিম্নআয়ের মানুষ কয়েকভাগে ভাগ হয়ে দুটি মিনিট্রাক ও একটি মাইক্রোবাস ঘিরে জটলা করছে। তাদের মধ্যে মুষ্ঠিমেয় কয়েকজনের হাতে বাজারের ব্যাগে চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজের মাঝারি সাইজের পুঁটলা। বাকিরা সবাই ওই মিনিট্রাক ও মাইক্রোবাস ঘিরে সাহায্যের খাদ্যসামগ্রী নিতে একযোগে যুদ্ধ করছে। তবে সাহায্যদাতারা সামান্য কিছু খাদ্যসামগ্রী তাদের হাতে তুলে দেওয়ার পর ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করে তাড়াহুড়ো করে গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে চলে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েকদিন ধরে হাতিরঝিলের এ জায়গায় কেউ না কেউ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী সাহায্য দিতে আসছে। তাই করোনা প্রতিরোধে সরকারের অঘোষিত লকডাউনে বেকার হয়ে পড়া নিম্নআয়ের নারী-পুরুষরা সামান্য সাহায্য পাওয়ার আশায় সকাল থেকে গভীর রাত অবদি সেখানে অপেক্ষা করছে। কোনো ট্রাক, মাইক্রোবাস কিংবা প্রাইভেটকার আশপাশের কোথাও দাঁড়ালেই তারা পড়িমরি করে ছুটে গিয়ে তা ঘিরে ধরছে। তবে অধিকাংশ সাহায্যদাতা সামান্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসায় বেশিরভাগ মানুষই তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শুধু হাতিরঝিলই নয়, এ ধরনের ঘটনা এখন শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেরও নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রী-এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এ ধরনের লোক দেখানো ত্রাণ বিতরণের কাজে এখন উঠেপড়ে লেগেছে। এতে নিম্নআয়ের অসহায় মানুষের নূ্যনতম খাদ্যচাহিদা পূরণ না হলেও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বাড়ছে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সামান্য খাদ্যসামগ্রী সাহায্য দিতে নিম্নআয়ের লাখ লাখ মানুষকে যেভাবে দফায় দফায় জড়ো করা হচ্ছে, তাতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি ছুটি দিয়ে করোনা প্রতিরোধের টার্গেট পুরোটাই ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের ভাষ্য, ত্রাণসামগ্রী পেতে যারা মুখে মাস্ক কিংবা কোনো কাপড় না বেঁধেই দলবদ্ধভাবে এ জায়গায় ও জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছে, তাদের মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত থাকলে এ মরণব্যাধি দ্রম্নত শত শত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে তালিকা অনুযায়ী অতিদরিদ্র মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলে মন্তব্য করেন তারা।

এদিকে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সচেতন মহলের অনেকেই বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তারা বলেছেন, সরকার করোনা প্রতিরোধে সারা দেশের অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি ছুটি দিয়েছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বিভিন্নভাবে তাগিদ দিচ্ছে। এছাড়া রাস্তাঘাটে যাতে মানুষ জড়ো হতে না পারে এজন্যর্ যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঠে নামিয়েছে। তারা রাস্তাঘাটে গাড়ি থামিয়ে অযথা ঘোরাঘুরি করা লোকজনকে ঘরে ফিরতে বাধ্য করছে। পাড়া-মহলস্নার অলিগলিতে জড়ো হওয়া তরুণদের আড্ডা ভাঙতে প্রয়োজনে লাঠিচার্জ করছে। অথচ সামান্য খাদ্যসহায়তা দেওয়ার নামে যারা ফটোসেশন করে হাজার হাজার মানুষকে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সরকার এখনো উদাসীন রয়েছে। এ ব্যাপারে দ্রম্নত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে করোনার সংক্রমণ ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকেই।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ প্রকাশ করে বলেন, গোটা দেশে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা এখনো নিয়ন্ত্রণে। তবে লকডাউন ব্যবস্থা সার্বিকভাবে সফল করা না গেলে গোটা পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই যেকোনো মূল্যে তা কার্যকর করা এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারের ঘরে থাকার যুদ্ধের নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে ফটোসেশনের ত্রাণ এখন গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের উদাসীনতায় প্রাণঘাতী করোনা একবার কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়লে ফল মারাত্মক হবে বলে সতর্ক করেন তারা।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার হোসেন বলেন, মরণঘাতী করোনাভাইরাস পানি, খাবার কিংবা বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় না। একমাত্র মানুষের থেকে মানুষের শরীরে তা ছড়িয়ে পড়ে। তাই লকডাউন ব্যবস্থা সফল করতে না পারলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যতই জোর দেওয়া হোক না কেন, তা ব্যর্থ হবে। বিশ্বের উন্নত বেশ কয়েকটি দেশ লকডাউন ব্যবস্থায় জোর না দিয়ে ভয়াবহ করোনা ঝুঁকিতে পড়েছে বলেও স্মরণ করিয়ে দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পিকটাইম হতে পারে আগামী দুই সপ্তাহ। এই বিষয়টিকে ঠিক কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেছেন, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান কৌশল। এই কৌশল বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে দরিদ্র এবং নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তা দেওয়ার বিষয় একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে, যা সরকার শিগগিরই সামলে নিচ্ছে। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে তার এ দাবির সঙ্গে বাস্তবতার কতটা মিল রয়েছে তা সম্প্রতি সময়ে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে ত্রাণ বিতরণের চিত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত, গত ৩০ মার্চ অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে সমন্বিতভাবে ত্রাণ বিতরণের জন্য নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সারাদেশে করোনাভাইরাসের কারণে শহর ও গ্রামে কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন অবস্থায় আছেন। বিশেষ করে ভিক্ষুক, ভবঘুরে, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যান গাড়িচালক, পরিবহণ ও রেস্টুরেন্ট শ্রমিক, ফেরিওয়ালা ও চায়ের দোকানদার যারা খাদ্য সমস্যায় আছেন তাদের তালিকা তৈরি করে খাদ্যসহায়তা দিতে হবে। এছাড়া সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়নপর্যায়ে ওয়ার্ডভিত্তিক কৃষি শ্রমিকসহ উপকারভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করে খাদ্যসহায়তা প্রদান করতে হবে। স্থানীয়পর্যায়ের বিত্তশালী ব্যক্তি বা এনজিও কোনো খাদ্যসহায়তা দিতে চাইলে জেলা প্রশাসকের প্রস্তুতকৃত তালিকার সঙ্গে সমন্বয় করবেন, যাতে দ্বৈততা পরিহার করা যায় এবং কোনো উপকারভোগী বাদ না পড়ে।

তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলে যে তথ্য মিলেছে তাতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত তালিকায় যে বিপুলসংখ্যক দুস্থ মানুষ বাদ পড়বে তা অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ওয়াহিদুল হাসান মিল্টন এ প্রতিবেদককে জানান, তার ওয়ার্ডে সর্বমোট লোকসংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজার। এদের মধ্যে রিকশা-ভ্যানচালক, দিনমজুর ও চায়ের দোকানদারসহ নিম্নআয়ের কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা ৫ সহস্রাধিক। অথচ সিটি করপোরেশন থেকে মাত্র ৫শ জনের তালিকা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এতে সাড়ে চার সহস্রাধিক কর্মহীন মানুষ ত্রাণপ্রাপ্তি থেকে বাদ পড়বে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার ব্যক্তি উদ্যোগ দেওয়া ত্রাণ পাওয়ার আশায় রাস্তাঘাটে জড়ো হবে। এতে তালিকা তৈরি করে ত্রাণ বিতরণের মূল লক্ষ্য ব্যর্থ হবে বলে আশঙ্কা করেন এই জনপ্রতিনিধি।

এদিকে একই সিটি করপোরেশনের অপর একটি ওয়ার্ডের জমা দেওয়া নিম্নআয়ের কর্মহীন মানুষের তালিকায় ক্ষমতাসীন দলীয় বিপুলসংখ্যক কর্মীর নাম দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর এর সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, নিম্নআয়ের কর্মীদের অনেকেই দিনে এনে দিনে খান। রাজনৈতিক তৎপরতা থাকলে তারা দিনশেষে নেতাদের কাছ থেকে দু-তিনশ টাকা পেতেন, যা দিয়ে তাদের সংসার চলত। তবে চলমান পরিস্থিতিতে তাদের সে পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ত্রাণ পাওয়ার আশায় তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।

তবে সিটি করপোরেশনের তালিকা অনুযায়ী কবে থেকে কিভাবে ত্রাণ দেওয়া হবে, কাউন্সিলররা কেউই তা জানাতে পারেননি। এমনকি নগদ টাকা, নাকি খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে তা-ও তাদের অজানা। সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এর সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এদিকে যায়যায়দিনের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার সংবাদদাতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশিরভাগ এলাকায় সরকারিভাবে কর্মহীন অতিদরিদ্র মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়নি। তবে অধিকাংশ এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগ গরিব মানুষের মধ্যে খাদ্যসহায়তা দিচ্ছে। এতে ব্যাপক জনসমাগম হচ্ছে। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানান তারা।

এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক কৃষিসচিব এ এম এম শওকত আলী বলেন, সরকারের এখন পর্যন্ত করোনা পরিস্থিতির কারণে খাদ্যসহায়তার পরিকল্পনাটি ত্রাণকেন্দ্রিক। সাধারণ অন্য আট-দশটি দুর্যোগের সময় যেভাবে ত্রাণ দেওয়া হয়, সেভাবে তারা খাদ্যসহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু এভাবে করলে অনেক মানুষ বড় ধরনের খাদ্যসংকটে পড়বে। তিনি বলেন, শিল্প খাতের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ তহবিল তৈরি করে এবং দরিদ্রদের একটি খাদ্য প্যাকেজের আওতায় আনতে হবে। আর পুরো পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্য গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরিকল্পনা করতে হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে