logo
বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  সাখাওয়াত হোসেন   ২৯ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

করোনা শনাক্তকরণ চ্যালেঞ্জে দেশ

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রম্নত চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে শত শত মানুষ সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে

করোনা শনাক্তকরণ চ্যালেঞ্জে দেশ
গত বৃহস্পতিবার থেকে চলমান 'ঘরে থাকার যুদ্ধে' দেশ অনেকাংশে সফল হলেও সরকারের সামনে এখন আরও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে। সর্দি-কাশি-জ্বর ও গলাব্যথাসহ করোনাভাইরাসের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে যারা বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিক কিংবা বাসা-বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত কিনা, তা দ্রম্নত শনাক্তকরণ এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা, করোনার প্রকোপের থার্ড স্টেজে অবস্থানকালীন সময় এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রম্নত চিহ্নিত করে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে একজনের মাধ্যমে শত শত মানুষ সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া করোনায় আক্রান্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো থেকে সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের দ্রম্নত হোম কোয়ারেন্টিনে এবং তাদের মধ্যে সংক্রমিতদের প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে রাখা সম্ভব না হলে ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে করোনার প্রকোপ লাগাম দেয়া অনেকটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডবিস্নউএইচও) কোনো দেশের নাম উলেস্নখ না করলেও যেসব দেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের শনাক্ত করতে যথেষ্ট পরীক্ষা করছে না ওইসব দেশ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেছেন, 'সব দেশের প্রতি আমাদের বলার বিষয় হচ্ছে- 'পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা।' মানে করোনা আক্রান্ত হিসেবে কাউকে সন্দেহ হলে প্রথম কাজ হলো পরীক্ষা করানো। অথচ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়া এবং আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও সেভাবে এই মরণব্যাধি শনাক্তকরণ পরীক্ষা বাড়ছে না। তাই বাংলাদেশের জনঘনত্ব ও এখানকার মানুষের জীবনযাপনের ধরন বিবেচনায় নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞই বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার ২৬ মার্চ থেকে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা করে একই সঙ্গে বাস-লঞ্চ-ট্রেন ও অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল বন্ধ করেছে, জনগণের অসচেতনতায় তা অনেকটাই ভেস্তে গেছে। ২৪ মার্চ এই ছুটি ঘোষণার পর থেকে ২৬ মার্চ গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহর থেকে ৫০ লক্ষাধিক মানুষ গ্রামে ফিরেছে। এতে ছুটির ওছিলায় সরকারের গোটা দেশ অঘোষিত লকডাউন রাখার পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। শহরের ঝুঁকি এখন গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছেছে। অথচ সেখানে করোনা আক্রান্ত রোগীর উপযুক্ত সেবাপ্রাপ্তি দূরে থাক, তা শনাক্তকরণের নূ্যনতম সুযোগ নেই। এ কারণে সন্দেহভাজন রোগীদের এই রোগ শনাক্তকরণের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রামসহ যে মুষ্ঠিমেয় কেন্দ্রে করোনা পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে, সেখানে ছুটে আসতে হবে। যা অনেকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে যারা পরীক্ষার জন্য শহরে আসবেন, তারা কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে নানা অসচেতনায় ওই রোগী পরিবহণের মাধ্যমে আরও অনেকের শরীরে এই মরণ ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ অবস্থায় সবদিক সামাল দেয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

অথচ করোনা মোকাবিলায় সারাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জন্য মাত্র ৩২৩টি প্রতিষ্ঠানে তিন হাজার ৯৮২ জন সেবাদানকারী প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এক হাজার ১২৩ জন চিকিৎসক, এক হাজার ৫৭৫ জন নার্স ও অন্য সেবাদানকারী এক হাজার ২৮৪ জন। এসব প্রতিষ্ঠানে মাত্র ১৮ হাজার ৯২৩ জনকে সেবা দেয়া যাবে। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্টদের অভিমত, দেশে করোনাভাইরাস এখনো কমিউনিটি ট্রান্সমিশন স্টেজে পুরোপুরি পৌঁছেনি। এ কারণে এই রোগে আক্রান্ত রোগী দ্রম্নত শনাক্ত করা গেলে এবং একই সঙ্গে গোটা দেশ আরও কিছুটা দীর্ঘমেয়াদে 'লকডাউন' রাখা সম্ভব হলে এই সংকট মোকাবিলা অনেকটা সহজ হবে।

অথচ দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তকরণে চলমান সংকট এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি বলে স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাদের ভাষ্য, সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) যে ধীরগতিতে রোগী শনাক্তকরণ কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে, তা এই মরণব্যাধি মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আইইডিসিআর এখন পর্যন্ত মাত্র এক হাজার ৬৮টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এরমধ্যে শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৪২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। একই সময় চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজ (বিআইটিআইডি) মাত্র আটটি নমুনা পরীক্ষা করেছে। এ সময় কারও করোনা পজেটিভ ধরা পড়েনি বলে শনিবার দুপুরে আইইডিসিআর সূত্র দাবি করে।

তবে একই দিন গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন জানিয়েছেন, সেখানে নতুন করে আরও দুইজন করোনায় আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে। তারা (দুই নারী) এর আগে করোনা আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মা-ছেলের সংস্পর্শে ছিলেন। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২২ মার্চ গাইবান্ধায় প্রথম দুইজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। খবর পেয়ে আইইডিসিআর'র প্রতিনিধি দল গাইবান্ধায় এসে আক্রান্ত দুই প্রবাসীর সংস্পর্শে থাকা দেড় শতাধিক আত্মীয় ও পরিবারের সদস্যের অনেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নমুনা সংগ্রহ করেন। বুধবার তারা (আইইডিসিআর টিম) ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পর নতুন করে দুইজন করোনায় আক্রান্ত হন বলে তথ্য জানান জেলা প্রশাসক।

দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, নানা সংকটের কথা বলে আইইডিসিআর করোনা শনাক্তকরণে যে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে, তা এই মরণব্যাধি মোকাবিলায় বড় 'ফাঁড়া' হয়ে দাঁড়াবে। কেননা, প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত সন্দেহভাজন রোগীকে পরীক্ষা করা না হলে এক সময় তা ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ওই চিকিৎসকদের ভাষ্য, বিশ্বের যেসব দেশ এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় সফল হয়েছে, এর মধ্যে জার্মানির নাম সবার আগে এসেছে। এই দেশটি শুধুমাত্র সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের ব্যাপক পরীক্ষা এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখার মধ্য দিয়ে এই সফলতা অর্জন করেছে বলে জানা গেছে। অথচ এর বিপরীত শ্রোতে গা ভাসিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ইতালিতে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা চীনকে ছাড়িয়ে গেছে।

জার্মানিতে মোট আক্রান্ত সংখ্যা ২২ হাজার ৩৬৪ জন, যাদের মধ্যে মাত্র ৮৪ জন মৃতু্যবরণ করেছে। দেশটিতে মৃতু্যর হার মাত্র ০.৩ শতাংশ। বস্নুমবার্গ গেস্নাবাল হেল্‌থ ইনডেক্সের তথ্য মতে, জার্মানরা করোনা শনাক্তকরণে প্রচুর টেস্ট করেছে। যা দেশটির মৃতু্য হার বিষ্ময়করভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

দেশটির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত, দেশে প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা অভিযান চালায় জার্মানি। এমনকি করোনার ছোটখাট লক্ষণ প্রকাশ পেলেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেশটি। সেখানে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ লাখ লোকের করোনাভাইরাসের লক্ষণ শনাক্তকরণের কাজ চলছে। শনাক্তকরণের পর দ্রম্নত তাদের রোগের লক্ষণ অনুযায়ী বাছাই বা আইসোলেশন করা হচ্ছে।

অথচ সন্দেহভাজন রোগীর করোনা টেস্ট ও তাদের রোগের লক্ষণ অনুযায়ী বাছাই বা আইসোলেশনে রাখার কার্যক্রমে বাংলাদেশ এখন যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। দেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষার একক ও একমাত্র কর্তৃত্ব এখনো আইইডিসিআরের হাতে। চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজ (বিআইটিআইডি) এ প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার অনুমতি দেয়া হলেও ফল প্রকাশের ক্ষমতা আইইডিসিআরের। এ ছাড়া রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হাতেগোনা আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও ২৮ মার্চ পর্যন্ত সেখানে পরীক্ষা শুরু হয়নি।

এদিকে আইইডিসিআরের হটলাইনে ফোন করলে এখনো মূলত দুটি প্রশ্ন করা হয়; সম্ভাব্য আক্রান্ত ব্যক্তি বিদেশ থেকে এসেছেন কিনা। দ্বিতীয়ত, বিদেশ থেকে আসা কারও সংস্পর্শে এসেছেন কিনা। এর ওপর ভিত্তি করেই পরীক্ষা করা হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত, শুধু এসব প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে এখনো করোনা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে গেলে নিশ্চিতভাবেই বিপদে পড়তে হবে। এখন যারা সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রবাসীদের সংস্পর্শে আসা স্থানীয় ব্যক্তিরা রয়েছেন। তারা সংক্রমিত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আগে স্থানীয় আরও কতজনকে সংক্রমিত করে গেছেন, তা অজানা রয়ে গেছে। ফলে সরাসরি প্রবাসী বা বিদেশ থেকে আসা কারও সংস্পর্শে না এসেও অনেকে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন। তাই জ্বর-কাশি, সর্দি ও গলা ব্যথাসহ করোনা রোগের অন্যান্য উপসর্গ দেখা গেলে সন্দেহভাজন সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা জরুরি বলে মত দেন তারা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে