logo
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  জাহিদ হাসান   ২৮ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলছে

আইসিইউ সংকটে করোনা চিকিৎসা ব্যাহতের শঙ্কা

করোনা চিকিৎসার জন্য আইসিইউ ইউনিট প্রয়োজন হবে, যা এ মুহূর্তে নেই। ফলে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মানসম্মত আইসিইউ অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা জরুরি

সময়ের সঙ্গে পালস্না দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিদিন করোনাভাইরাস শনাক্তকৃত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যাদের চিকিৎসায় হাতেগোনা কয়েকটি আইসোলেশন ইউনিট তথা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন রয়েছে। এছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা আইসিইউ ইউনিটের ব্যাপক সংকট দেখা দেবে বলে চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা চিকিৎসার জন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা আইসিইউ ইউনিট প্রয়োজন হবে, যা এই মুহূর্তে নেই। ফলে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মানসম্মত আইসিইউ অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা জরুরি। কারণ প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুক্রবার পর্যন্ত সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ৪৮ জন সংক্রমিত হওয়ার ঘোষণা এসেছে। এদের মধ্যে পাঁচজনের মৃতু্য হয়েছে। সারাদেশে ৪৭ হাজার ১৮১ জন মানুষ হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন প্রেক্ষিতে জনবহুল বাংলাদেশে মারাত্মক আক্রান্তদের সেবায় পূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এখনই নির্ধারিত চিকিৎসাকেন্দ্র ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একজন অধ্যাপক যায়যায়দিনকে বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ কিছু হাসপাতাল প্রস্তুত রাখাসহ আশকোনার হজক্যাম্প, উত্তরার দিয়াবাড়ি ও টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানও প্রস্তুত করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি সব বিভাগে করোনা ইউনিট স্থাপন করার জন্য বলেছেন। তবে যে দেশের হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। সেদেশে ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সর্বোচ্চ সেবার জন্য আইসিইউ সংকটে পড়বে। তাই ভাইরাস আক্রান্তের মধ্যে যাদের পরিস্থিতিতি আশঙ্কাজনক তাদের জরুরি আইসিইউ লাগবে। সেজন্য দক্ষ জনবল ও অবকাঠামোর প্রয়োজন করতে হবে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ যায়যায়দিনকে বলেন, সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। যেটা মোকাবিলার জন্য চিকিৎসক-নার্সরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। তবে মনে রাখতে হবে রোগী, চিকিৎসক নার্সসহ সবার সুরক্ষায় সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি প্রতিটা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানেই যেন নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রসহ সব ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম থাকে সেটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

মুগদা মেডিকেলের একজন চিকিৎসক যায়যায়দিনকে বলেন, ঢাকার বাইরে বিদেশফেরত যাত্রীরা কোয়ারেন্টিনের নিয়ম না মানলে সংক্রামক রোগের নির্ধারিত আইনে সরকার আইনানুগ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছেন। এ জন্য জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জোরালো ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন। তবে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য তাৎক্ষণিক আইসিইউ সেবা নিশ্চিতের কী ব্যবস্থা হবে তা বলছেন না।

সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড ঘাটতি ও বেসরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত খরচের বিষয়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে করোনাভাইরাসে গুরুতর আক্রান্তদের আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে আইসিইউর সংকট থাকায় এই সুবিধা থেকে অনেকেই বঞ্চিত হতে পারেন। এই সংকটকে কেন্দ্র করে প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো রোগীদের জিম্মি করে ব্যবসা খুলে বসতে পারে। কারণ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর তুলনায় আইসিইউ, সিসিইউ, পিআইসিইউ, এনআইসিইউ ও এইচডিইউ ইউনিটের চিকিৎসক, নার্স টেকনেশিয়ানসহ দক্ষ জনবল ঘাটতি রয়েছে।

সারাদেশের আইসিইউ চিত্র : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মাত্র ২২১টি আইসিইউ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু শয্যা অকেজো পড়ে আছে। সরকারি ৩৪টি মেডিকেল ও ১ ডেন্টাল কলেজের মধ্যে আইসিইউ আছে মাত্র ১৩টিতে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ২১১টি। এছাড়া সাতটি চিকিৎসা ইনস্টিটিউটে ৭৮টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। পাশাপাশি জেলাপর্যায়ে সাতটি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ২২টি।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী সারাদেশের ৭০টি বেসরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৭৪টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই ৯০-এর বেশি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ রয়েছে। তাছাড়া দেশে আইসিইউ পরিচালনার যোগ্যতাসম্পন্ন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক খুবই অপ্রতুল। ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ওপর এমডি করেছেন মাত্র ২১ জন চিকিৎসক। যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৬০০ জন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে