logo
বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৫

  যাযাদি রিপোর্ট   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় ভাষাশহিদদের স্মরণ

বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় ভাষাশহিদদের স্মরণ
অমর একুশে ফেব্রম্নয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার -যাযাদি
'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রম্নয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি..' কণ্ঠে বিষাদমাখা চিরচেনা গান; হাতে গোলাপ, গাদা, পলাশসহ নাম না জানা হরেক রঙের ফুল। লাখো মানুষের ঢল মিশেছে শহিদ মিনারে। হৃদয়স্পর্শী অনুভূতি, পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বায়ান্নর মৃতু্যঞ্জয়ী ভাষা শহিদদের স্মরণ করল জাতি। শ্রদ্ধাবনত মস্তকের অর্ঘ্যে পূর্ণ হয়ে উঠল হাজারো শহিদ মিনারের বেদি। ছিল সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন, সাহিত্যের বিকাশ ও ভাষার বিবৃতি রোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি।

১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বাঙালির আত্মদানের দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে মহান শহিদ দিবস। বাঙালির অহংকারের দিন। জাগরণের দিন। তবে এই অর্জন এখন শুধু বাংলাদেশেরই নয়, 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালিত হয় সারাবিশ্বে। ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো একুশে ফেব্রম্নয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

একুশের প্রথম প্রহর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা এক মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এর পরই পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারা কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে ভাষা শহিদদের প্রতি সম্মান জানান। এ সময় বেজে ওঠে অমর একুশের গানের করুণ সুর 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রম্নয়ারি'। পরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সারি দেখা যায় শহিদ মিনারে।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহিদ মিনার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর একে একে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশে কর্মরত

কূটনীতিকরা, তিন বাহিনীর প্রধান, অ্যাটর্নি জেনারেল, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ও ডিনরা, বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন।

প্রাণের টানে দুর্বল শরীর নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছুটে এসেছিলেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ও সাঈদ হায়দার। তারা সেখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের পর তরুণ প্রজন্মকে ভাষা সংগ্রামের গল্প শোনান।

ভোর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দল ও সংগঠন ছাড়াও ছাত্র, যুব, নারী, শ্রমিক, শিশু-কিশোর সংগঠনগুলো এবং শত শত মানুষ সারিবদ্ধভাবে একে একে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে গভীর শ্রদ্ধা জানান ভাষা শহিদদের প্রতি। এ সময় মাইকে অমর-করুণ সুর বাজানো ছাড়াও ধারাভাষ্যকাররা অবিরাম কবিতার পঙক্তিমালা আবৃত্তি করেন।

আঁধার পেরিয়ে দিনের আলো ফোটার আগেই রাশি রাশি ফুলের মালা ও স্তবকের স্তূপ ঢাকা পড়ে গোটা শহীদ মিনার। অথচ পুষ্পার্ঘ অর্পণের জোয়ার যেন শুরু হয় ঊষালগ্নেই। নগ্ন পায়ে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন লাখো মানুষ। মুক্তচিন্তার সঙ্গে প্রাণের স্পন্দন ও অন্যরকম অনুভূতি মিলে মায়ের ভাষা বাংলার জন্য অকাতরে জীবন উৎসর্গ করে যাওয়া বীর ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাল সমগ্র দেশবাসী।

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকার আশপাশের বেশ কয়েকটি রোড বন্ধ থাকায় ভোর থেকেই এ-পথ ও-পথ ঘুরে অবশেষে পলাশীর মোড়ে এসে সবাইকেই দাঁড়াতে হয়েছে লাইনের শেষ মাথায়। আর থেমে থেমে এগুতে হয়েছে নগ্ন পায়ে। হাতে গুচ্ছ গুচ্ছ গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা নিয়ে কিশোরী, তরুণী ও নারীরা সাদা-কালোর সালোয়ার কামিজ বা কালো পেড়ে সাদা শাড়ি এবং ছেলেরা সাদা-কালো পাঞ্জাবি পরে, কেউ কেউ কালো ব্যানার ও ফেস্টুনের মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে পালস্না দিয়ে বেড়েছে ভিড়, দীর্ঘ হয়েছে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণের সারি। তবুও যেন ক্লান্তি নেই কারো। সারিবদ্ধ মিছিলে হাজারো মানুষের চোখেমুখে দেখা গেছে দৃপ্ত শপথ। যেন এগিয়ে যেতেই হবে সামনের প্রগতির সোপানে, জাতীয় অগ্রগতির মহাসড়কে। পেছনের কূপমন্ডূকতাকে ঝেড়ে উদ্ভাসিত আলোর পথে। ভাই হারানোর শোক ছাপিয়ে অর্জন করতে হবে দুর্দমনীয় সাহস।

ঢাকাসহ রাজধানীর বাইরে সারাদেশেও দিবসটি পালিত হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়। দেশের বিভিন্ন স্থানের সাংস্কৃতিক মঞ্চগুলোতে ছিল উপচানো ভিড়। নানা আয়োজনে মুখর ছিল সরকারি ছুটির এ দিনটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও হারিয়ে যেতে বসা ভাষাগুলোকে রক্ষার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ দিবসটিকে এ স্বীকৃতি দেয়। ভাষার জন্য আত্মদানের বাঙালির বেদনাময় অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গৌরবগাথা।

রাজধানীর মধ্যবাড্ডার গৃহবধূ নিলুফা ইসলাম শহীদ মিনারে এসেছিলেন তার স্কুলপড়ুয়া শিশুসন্তান আদনান ইসলাম ও মেয়ে শান্তা ইসলামকে নিয়ে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি বলেন, আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকারের একুশের অনুষ্ঠান দেখাতে সন্তানদের নিয়ে ভোরে বাসা থেকে বের হয়েছি। ওদের স্কুলের অনুষ্ঠান শেষ করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এসেছি। সন্তানদের কারো ক্লান্তি নেই। ওরা পাঠ্যপুস্তকে একুশে ফেব্রম্নয়ারির ঘটনা পড়েছে। কিন্তু এই প্রথম কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার দেখল। শিশু সন্তানদের আত্মপরিচয়ের সন্ধান দিতেই বেশকিছু জরুরি কাজ ফেলে তাদেরকে শহিদ মিনারে ছুটে এসেছেন বলে জানান নিলুফা ইসলাম।

পোশাকে, রঙে, আঁকায় সর্বত্রই ছিল একুশের চেতনা: সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে ও জাতীয় জাদুঘরের সামনে চলতে থাকে দুই গালে শহিদ মিনার, জাতীয় পতাকা বা অ-আ-ক-খ আঁকিয়ে নেওয়া। হাতে তুলি আর রং নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অসংখ্য তরুণ-তরুণী। মানুষের গালে আর কপালে তারা এঁকেছেন বর্ণমালা, পতাকা, শহিদ মিনার আর আল্পনা। হৃদয়ে ধারণ করা একুশের চেতনার অনুবাদ নানা ভাষায়, নানা রঙে প্রকাশ পেয়েছে গতকাল বাংলা একাডেমি, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাজুড়ে।

একুশের প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়া মানুষের পোশাকে ছিল কালো-সাদার প্রাধান্য। বাংলা ভাষায় লেখা সাহিত্য, কবিতার পঙক্তি, গানের কলি পোশাকে ভর করে হেঁটে বেড়িয়েছে। কপাল আর গালে তুলি চালিয়েছেন আঁকিয়েরা। ফুটে উঠেছে শহিদ মিনার, বাংলাদেশের পতাকা আর বর্ণমালা।

সাদা-কালো জমিনে উঠে এসেছে বর্ণমালা থেকে কবিতা, গান। একুশের চেতনা ফ্যাশনেও স্থান করে নিয়েছে। গতকাল কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এবং আশপাশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপনে আসা মানুষের পোশাকের রঙে, ভাষায় ছিল একুশের চেতনার প্রকাশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতর সাধারণভাবে যানবাহন চলাচল ছিল বন্ধ। এ সুযোগে রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান বসিয়েছে হকাররা। আবার কেউ হেঁটে হেঁটে বিক্রি করেছেন ছোট পতাকা, একুশের বাণীসমৃদ্ধ মাথার কাপড়, শহিদদের ছবিসহ পোস্টকার্ড।

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে বিদেশিদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তারা ছাড়াও ভারত, জাপান, আমেরিকা, কানাডা ও নেদারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা এসেছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে।

এদিকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ফুলের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর অনেকেরই গন্তব্য ছিল বাংলা একাডেমির বইমেলা। এছাড়া টিএসসি, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, চারুকলা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ ক্ষুদ্র রমনার পুরোএলাকাই ছিল লোকে লোকারণ্য।

মহান মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর পাড়া-মহলস্নায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আবার কোথাও কোথাও মিলাদ মাহফিলেরও আয়োজন করা হয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে