logo
বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৫

  জাহিদ হাসান   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

হাসপাতালে সংক্রমণ ঝুঁকিতে রোগীরা

সম্প্রতি ক্যানডিডা আউরস নামের এক ধরনের ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাকজনিত রোগ বাংলাদেশে দেখা দিয়েছে। যেটিতে সাধারণত হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীরা আক্রান্ত হচ্ছেন

দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে অবস্থানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি বা শৃংখলা মানেন না স্বজনরা। এতে করে একে অপর থেকে বিভিন্ন ধরনের রোগ-ব্যাধি সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকলেও কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেন না। ফলে আকস্মিক সংক্রমণ ঝুঁকি রোধে এমন পরিস্থিতি বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ ধারাবাহিকতায় সরেজমিন রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় অর্থপেডিকস ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (পঙ্গু হাসপাতাল), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ঘুরে সেখানে এক রোগীর বিপরীতে একাধিক স্বজনের উপস্থিতি দেখা গেছে। যেখানে রোগীদের অ্যাটেন্ড (স্বজনরা) কোনো ধরনের নিয়ম-শৃঙ্খলার বালাই মানছেন না। বরং যত্রতত্র কফ-থুতু ফেলা থেকে শুরু করে রোগীর দেয়া খাদ্য খাওয়াসহ অনেককে হাসপাতাল আঙিনায় ধূমপান পর্যন্ত করতে দেখা গেছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা রোগীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রসহ রোগীর জন্য নির্ধারিত পায়খানা প্রস্রাবখানা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে করে সুস্থতার জন্য এসেও নতুন করে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি ক্যানডিডা আউরস নামের এক ধরনের ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাকজনিত রোগ বাংলাদেশে দেখা দিয়েছে। যেটিতে সাধারণত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রোগীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে গত বছর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রর মতো আইসোলেশন (পৃথক) ওয়ার্ডে জীবাণু সংক্রমিত হয়ে কয়েকজন রোগীর মৃতু্য পর্যন্ত ঘটেছে। এমন পরিস্থিতি জেনেও বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজনের উপস্থিতি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ মেনে না চলা সংক্রমণ ছড়ানোর সহায়ক হচ্ছে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সঙ্গে নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরিহিত চিকিৎসক, নার্স তথা সেবাদাতা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রয়োজন ছাড়া স্বজন তথা সাধারণ মানুষের (স্বজন) অবস্থানের নিয়ম নেই। কারণ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কম থাকে। ফলে অসাবধানতাবশত রোগীর সঙ্গে অবস্থানকারী ব্যক্তির মধ্যে রোগ-জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। আবার বাইরে থেকে আসা স্বজনের মাধ্যমে রোগী নিজেও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে কষ্টের বিষয় হলো সংক্রমণ ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও স্বজনরা কোনোভাবেই মানে না। নির্ধারিত ভিজিটিং আওয়ার (রোগী দেখার সময়) ও দর্শানার্থী কার্ড দেওয়ার পর রোগীর স্বজনরা তা নেন না। আর এসব কারণেই একে অপরের মাধ্যমে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে, ঢাকা মেডিকেলসহ কয়েকটি বড় হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক যায়যায়দিনকে বলেন, হাসপাতালে ভর্তি যে কোনো রোগী, বিশেষ করে অস্ত্রোপচার হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে আসা মানুষের সংস্পর্শ পেলে বিভিন্ন জীবাণু দ্বারা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। কিন্তু পরিবেশগত কারণে বাংলাদেশের প্রতিটা সরকারি হাসপাতালকে রোগ-জীবাণুর ভাগাড় বললে ভুল বলা হবে না। কারণ অসচেতনতাবশত একজন মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস কিংবা স্পর্শ থেকেও রোগীরা বিভিন্ন সংক্রমণের শিকার হতে পারে। যেটি জেনে বুঝেও সাধারণ মানুষের অসচেতনতা ও ক্ষেত্রবিশেষ চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণে এমনটা হচ্ছে। মূলত চিকিৎসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারলেও স্বজনদের অনুপস্থিতিতে রোগীর মানসিক সমর্থন জোগানোর আস্থা তৈরি করতে পারেনি। ফলে নিয়ম-শৃঙ্খলা মানার ক্ষেত্রে কেউই কোনো ধরনের তোয়াক্কা করেন না।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সংকটাপন্ন রোগী দেখার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. শহিদুলস্নাহ সিকদার যায়যায়দিনকে বলেন, প্রথমত হাসপাতালে ভর্তি রোগীকে দেখতে একসঙ্গে বেশি মানুষ যাওয়া ঠিক না। এছাড়া পেশেন্ট ভিজিটিং আওয়ার বা নির্দিষ্ট সময় মেনে চলা। শিশুদের হাসপাতালে না নেওয়া, রোগীর কাছে খুব বেশি সময় না থাকা, রোগীর বিছানায় না বসা ও রোগীকে স্পর্শ না করা ভালো। যেসব রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কম থাকে যেমন, (রক্তের শ্বেতকণিকা কমে যাওয়া রোগী)। তাদের কক্ষে মাস্ক পরে প্রবেশ করা এবং হাত জীবাণুমুক্ত না করে কোনো অবস্থাতেই তাদের স্পর্শ না করা।

এছাড়া ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ শফি আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, সব ধরনের রোগীর মধ্যে শিশু রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি খুব বেশি থাকে। তাই হাসপাতালের শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং এইচডিইউ বা হাই-ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটগুলোতে নিয়ম অনুযায়ী প্রবেশ করতে হয়। এক্ষেত্রে বিশেষ গাউন, মাস্ক ও জুতার কভার ব্যবহার করা এবং পরবর্তীতে এসব উপকরণ পুনরায় ব্যবহার না করাই ভালো। এছাড়া হাত জীবাণুমুক্ত না করে কোনো অবস্থাতেই তাদের স্পর্শ না করা ও রোগীর খাবারের বিধি-নিষেধ মেনে চলা উচিত বলে মন্তব্য করেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে