logo
বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৫

  হাসান মোলস্না   ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

খালেদা জিয়ার মুক্তি না রাজনীতি, কী চায় বিএনপি?

খালেদা জিয়ার মুক্তি না রাজনীতি, কী চায় বিএনপি?
খালেদা জিয়া
নেতারা দলীয়প্রধানের মুক্তিই দলের একমাত্র কাজ বলে বক্তব্য দিলেও এ নিয়ে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে বিএনপি কি খালেদা জিয়ার মুক্তি চায় নাকি এই ইসু্যতে রাজনীতি করতে চায়। বিএনপি প্রধানের দুই বছর আট দিনের কারাজীবনে তার মুক্তির জন্য আদালতের লড়াই, বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও মাঠের আন্দোলন-সব ক্ষেত্রেই বিএনপি বিফল হয়েছে। এখন তার জীবন যখন সংকটাপন্ন তখনও জীবনের প্রয়োজনে কার্যকরী উদ্যোগ কী হবে তা নিয়ে দলে বিভক্তি দেখা দেওয়ায় সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। যেকোন মূল্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নিতে তৃণমূল থেকে দাবি উঠেছে।

খালেদা জিয়ার কারাবন্দী হওয়ার পর থেকে বিএনপির উদ্যোগগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বলতে গেলে নেত্রীর মুক্তির জন্য কার্যকরী কোনো উদ্যোগ ছিল না। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি গত দুই বছরে সব ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সংসদে যোগদান, মানববন্ধন, প্রতীক গণ-অনশন, গণ-অবস্থান, বিক্ষোভ সমাবেশ-মিছিল, গণস্বাক্ষরতা অভিযান, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে স্মারকলিপি পেশ ইত্যাদি রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করলেও কোনো সুবিধা বিএনপি করতে পারেনি। কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নেতাকর্মীরা অনেকে আহত হয়েছেন, অনেকের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তারও হয়েছে অনেকে। প্রতিটি পদক্ষেপে বিচক্ষণতার অভাব দেখা গেছে। আর সমঝোতার গুঞ্জনও উঠেছে বারবার। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের নেতার বক্তব্যে সমঝেতার চেষ্টার বিষয়টিও প্রকাশ্যে এসেছে। যদি সমঝোতায় হয় তাহলে এর ফল কোথায় তা দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের প্রশ্ন। অবস্থা এখন এমন হয়েছে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সরকারের অনুকম্পা প্রার্থনার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে বিএনপি। এমনই যদি হবে তাহলে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চিন্তা থেকে শুরুতেই কেন প্যারোল আবেদন করা হলো না তা নিয়ে সাধারণ কর্মীদের পাশাপাশি দলের সিনিয়র নেতারাই দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে জানতে চেয়েছেন।

বিএনপি সূত্রমতে, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কার্যকরী কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় বিএনপিতে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অনেকে বলতে শুরু করেছেন, খালেদা জিয়াকে বিএনপির নেতারাই জেলে রেখে দিচ্ছেন। বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক খালেদা জিয়ার জেলজীবনের জন্য বিএনপির বর্তমান নেতাদেরও দায় আছে। দায়িত্বশীল পর্যায়ের নেতারা না বুঝে একের পর এক ভুল পদক্ষেপ নেবেন- তা অনেকে মানতে পারছেন না। অনেকে সরকারের সঙ্গে নেতাদের আঁতাতের গন্ধও খুঁজছেন।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলোচনা করে এমন মতামত পাওয়া যায় যে, ক্ষমতাসীনদের আগ্রাসী অবস্থানের চেয়ে বিএনপি নেতাদের ভুল সিদ্ধান্তই খালেদা জিয়ার মুক্তি বিলম্ব হওয়ার জন্য দায়ী। নেতাদের মতে, বিএনপি দলীয় প্রধানকে শুধু মুক্ত করতেই ব্যর্থ হয়নি, এই ইসু্যতে রাজনীতি করতেও ব্যর্থ হয়েছে। যদি এই ইসু্যতে রাজনীতি করে সফল হতো তাহলেও ব্যাপক জনপ্রিয় নেত্রীর জন্য আবেগীয় কারণে হলেও সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামানো সম্ভব হতো।

সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মতে, দলীয়প্রধানকে জেলে রেখে অন্য কোনো দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ কোনো ধরনের নির্বাচনে অংশ নিত না। বিএনপি হাসিমুখেই সংসদে যাচ্ছে। একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতাসীনদের কেড়ে নেওয়া সব উচ্চপর্যায়ের পদকে বৈধতা দিচ্ছে।

বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, গুটিকয়েক নেতার কাছে বিএনপি একরকম বন্দি। খালেদা জিয়কে মুক্ত করে দলকে ঘুরে দাঁড় করানোর পরে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা করা উচিত ছিল বিএনপির। কিন্তু তা না করে ব্যানার-সর্বস্ব এক দলের নেতার কথায় উঠাবসা করে দলকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা। আর এসব বিষয় লন্ডনে বসে থাকা তারেক রহমানকে বোঝাতেও তাদের অসুবিধা হচ্ছে না। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে একের পর এক ভুল উদ্যোগকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে বিএনপির বর্তমান আচরণ হচ্ছে দুর্বলের কাতর মিনতি। এমনই যদি বলা হবে তাহলে গত দুই বছরে একাধিকবার খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব ছিল। খালেদা বন্দির পরেই আন্দোলনের বিষয়টি সামনে রেখে সমঝোতার মাধ্যমে তাকে মুক্তি করা যেত। নির্বাচনে আগে অংশগ্রহণের শর্তে আন্দোলন ও মুক্তি করা সম্ভব ছিল। সর্বশেষ সংসদে যোগ দেওয়ার আগেও খালেদা জিয়ার জামিনের শর্তে সংসদে যোগ দেওয়া যেত। কিন্তু এমন কিছুই করা হলো না। ফলে না হলো রাজনীতি, না হলো খালেদা জিয়ার মুক্তি। তাই এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে ক্ষমতাসীনদের একের পর এক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে দলের কোন নেতারা কাজ করছেন। কেন করছেন। তারা কি দলের ভালো চায়, নাকি কারও এজন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।

এদিকে আদালতের লড়াই, বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও মাঠের আন্দোলন-সব ক্ষেত্রেই বিএনপি বিফল হওয়ার পরে আপসহীন নেত্রীর খেতাব পাওয়া খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত প্যারোলে মুক্ত হবেন এমন আলোচনা এখন সর্বত্র। খালেদার মুক্তির বিষয়ে শাসক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ফোনের পরই এ আলোচনা শুরু হয়। আপিল বিভাগে জামিন আবেদন খারিজ হওয়ার পর এখন বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি কীভাবে-এমন প্রশ্ন সবখানেই। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, সরকার চাইলে জামিন ছাড়াও মুক্তি দিতে পারে। সূত্রমতে, কোন পথে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব তা নিয়ে নেতারা আলোচনা করছেন। জামিনের বাইরে থাকা যে দুটি পথ আছে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা হচ্ছে। পথ দুটির একটি হচ্ছে, অসুস্থতার বিষয়টি তুলে ধরে সরকারের কাছে আবেদন করতে হবে। যেটা প্যারোল হিসেবে পরিচিত। অন্যটি হচ্ছে- সাজা মওকুফ চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। দোষ স্বীকার না করেও প্যারোলের যে আবেদন করার সুযোগ আছে সেই বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করার কোনো সম্ভাবনা নেই।

অন্যদিকে দুই বছর পরে প্যারোলের ভাবনা নিয়ে বিএনপিতে শুরু হয়েছে বাগবিতন্ডা। এমনই যদি সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাহলে আগে কেন নেওয়া হলো না। কেন দুই বছরব্যাপী নেত্রীকে কারাগারে কষ্ট দেওয়া হলো- এমন প্রশ্ন উঠেছে। নিজ দলীয় নেতাদের প্রতি কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দুই বছর আগেই প্যারোলের বিষয়ে মত দিয়েছিলেন। তখন নেতারা তার কথা শোনেননি। এখন আইনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার জামিন পাওয়াটাও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু রাজনৈতিক চিন্তার ঊর্ধ্বে, ম্যাডামকে বাঁচানোর জন্য তার উন্নত চিকিৎসা করা দরকার।

খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, জামিন ছাড়াও ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১) ধারায়, অর্থাৎ দন্ড স্থগিত করে সরকার চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনকে মুক্তি দিতে পারে। এটা শুধু সরকারের সদিচ্ছার ব্যাপার। জামিনের বিষয়ে তিনি বলেন, আবারও হাইকোর্টে জামিন আবেদন করবেন। চলতি সপ্তাহের শেষেই এটা করা হতে পারে। যতদিন আসামি কারাগারে থাকে, ততদিনই জামিন আবেদন করা যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে