logo
বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২০, ৯ মাঘ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ১৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

সরকারি স্বীকৃতির তিন বছর

কতটা বদলেছে কওমি মাদ্রাসা

কতটা বদলেছে কওমি মাদ্রাসা
রাজধানীর একটি কওমি মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষে পাঠরত শিক্ষার্থীরা -ফাইল ছবি
যাযাদি ডেস্ক

'আগে জাতীয় পরিচয়পত্রে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত লেখা হতো, এখন সেখানে স্নাতকোত্তর লেখা হয়, এটাই প্রাপ্তি।' কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার তিন বছর পর এসে এভাবেই মূল্যায়ন করলেন গোপালগঞ্জের জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম খাদেমুল ইসলাম গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার শিক্ষক মুফতি মোহাম্মদ তাসনীম। ২০১৭ সালে আল-হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়ার প্রথম ব্যাচের পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি। তার মতো আরও প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা দিয়ে মাস্টার্সের সমমান লাভ করেছেন। এদের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র অংশ চাকরি পেয়েছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে।

কিন্তু বেশিরভাগ উত্তীর্ণরাই রয়ে গেছেন স্ব-স্ব পেশায়। মাদ্রাসায় শিক্ষকতা, ইমামতি ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যোগদান ইত্যাদি কর্মকান্ডে। আরেকটি ক্ষুদ্র অংশ রয়েছেন, যারা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এছাড়া, স্বল্পসংখ্যক ছাত্র উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ভারত, কাতার, সৌদি আরব, মিশরসহ কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্রে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

আল-হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে প্রথমবার দাওরায়ে হাদিসের সরকারিভাবে মাস্টার্সের সমমান পরীক্ষায় অংশ নেন ১৯ হাজার ২৮৭ জন। এর মধ্যে স্টার মার্ক (মুমতাজ) প্রথম (জায়ি্যদ জিদ্দান), দ্বিতীয় (জায়ি্যদ) ও তৃতীয় বিভাগে (মকবুল) মোট ১৫ হাজার ৩২০ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। ২০১৮ সালে চার বিভাগে উত্তীর্ণ হন ১৪ হাজার ৫৩৩ জন, এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেন ২০ হাজার ৭৩৮ জন। সদ্য বিদায়ী ২০১৯ সালে ২৬ হাজার ৭৮৮ জন ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিয়ে চার বিভাগে পাস করেছেন ১৯ হাজার ৭৯ জন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. জুবায়ের আহমেদ জানান, এই প্রকল্পে ১৮০০ নিয়োগ পাওয়া আলেমের মধ্যে ৯১০-১৫ জন কওমি কোটায় নিয়োগ পেয়েছিলেন ২০১৮ সালে ৩০ আগস্টের আগে। এরপর ওই প্রকল্পে আর কোনো নিয়োগ হয়নি।

ইফাবার প্রভাবশালী একজন পরিচালক এ প্রতিবেদককে বলেন, 'নতুন প্রকল্প আসার আগে আর কোনো আলেম নিয়োগের সম্ভাবনা নেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনে।'

ইফাবার সাবেক পরিচালক জুবায়ের আহমেদ বলেন, 'শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের বাইরে অন্যকোনও প্রকল্পে কওমি আলেমদের নিয়োগ হয়নি।'

কওমি মাদ্রাসার আলেমরা বলছেন, স্বীকৃতির পর যে সময় অতিবাহিত হয়েছে, তাতে করে একটি মূল্যায়নের ব্যাপারে 'মন্তব্য' করার সঠিক সময় আসেনি। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কওমি আলেমদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কীভাবে ফলপ্রসূ হবে, তার জন্য আরও সাত-আট বছর অপেক্ষা করতে হবে।

আল-হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়ার কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কয়েকজন আলেম জানান, সামাজিকভাবে ও মানসিকভাবে স্বস্তি তৈরি হয়েছে স্বীকৃতির পর। এই আলেমদের দাবি, সরকারি স্বীকৃতির কারণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণে তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

সরকারি স্বীকৃতির কারণে কেবল যে চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে তা-ই নয়, মূলত সামাজিকভাবে হীনম্মন্যতার যে বিষয়টি ছিল, তা অনেকাংশে কেটে গেছে, বলছিলেন মাওলানা তোফাজ্জল হুসাইন (ছদ্মনাম)। ২০১৭ সালে কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে তিনি মাস্টার্সের সার্টিফিকেট পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পে।

গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার শিক্ষক মুফতি মোহাম্মদ তাসনীম বলেন, 'আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল এখনো পাইনি। যেকোনো চাকরির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নাম দেখা যায়, কিন্তু হাইআতুল উলয়ার নামটি দেখা যায় না। বা কোনো বিষয়ে গবেষণা করতে চাইলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো আমাদের জন্য সেই সুযোগ সৃষ্টি হয় নাই। যেগুলো প্রথম থেকেই হওয়া উচিত ছিল। আশা করছি, আগামী দিনে রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।'

'স্বীকৃতির সুফল শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আস্তে আস্তে প্রতিফলন ঘটবে', বলে মনে করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা সাজিদুর রহমান। তিনি বলেন, 'স্বীকৃতির প্রয়োজন ছিল। দাওরায়ে হাদিসের একটা মান হলো- মাস্টার্সের একটা মান দেওয়া হলো। সামাজিকভাবেও ভালো, রাষ্ট্রীয়ভাবেও এর মাধ্যমে প্রতিফলন আসবে।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাওলানা গোলাম রাব্বানী বেশ কয়েক বছর কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছেন। সরকারি স্বীকৃতির বিষয়ে তার মন্তব্য, 'আমি কিন্তু এখনো দেখিনি, কোনো প্রভাব চোখে পড়েনি। আলেমরা চেয়েছেন সরকারের একটা স্বীকৃতি, এটা সবাই জানে, মানে। কিন্তু সামগ্রিক উন্নতির দিক থেকে দেখলে বা উচ্চ শিক্ষায় আলেমরা অংশগ্রহণ করছেন, এটা কিন্তু ঘটেনি।'

অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী বলেন, 'আলেমরা স্বীকৃতি চেয়েছেন, সরকার দিয়েছে। আরও পাঁচ-সাত বছর পর আমাদের চিন্তা ও চাওয়ার প্রতিফলন ঘটবে বলে আশা করি। এর মধ্যে পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি।'

সরকারি সনদের এই স্বীকৃতি কতটা কাজে লাগল, এমন প্রশ্নে একাধিক কওমি আলেম জানান, সরকারি স্বীকৃতির মানেই যে সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে হবে তা নয়, এটা স্বীকৃতি রাষ্ট্রের। একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামাধ্যম হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে কারণেই 'মাদার অব কওমি' দারুল উলুম দেওবন্দের মৌলিক নীতিগুলোকে মেনেই স্বীকৃতি গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে সরকারি প্রভাব তৈরি না করতে অর্থনৈতিক কোনও সহযোগিতা গ্রহণ থেকেও সরকার বিরত থাকছে।

কোনো কোনো আলেম মনে করেন, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রতিটি মাদ্রাসায় আবাসন সংকট তৈরি হয়েছে। দিনে দিনে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের সময় এসেছে।

ঢাকার কয়েকটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, ছাত্ররা বেশিরভাগই আবাসিক হওয়ায় ছাত্রদের গাদাগাদি করে রাত যাপন করতে হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে চর্মরোগ, জ্বর ও সর্দির মতো রোগগুলো বেশি হয়ে থাকে। তবে বেশি অসুস্থ হলে মাদ্রাসার দায়িত্বেই অসুস্থ ছাত্রকে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানান জামিয়া রাহমানিয়ার ষষ্ঠ শ্রেণির একজন ছাত্র।

কওমি মাদ্রাসার আলেমরা ভারতের উত্তর প্রদেশের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার কর্মনীতিকে সামনে রেখে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করছেন না। দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবীর প্রণীত কর্মনীতিতে সরকার বা আমির-ওমরাদের আর্থিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে এবং যতদূর সম্ভব অধিকহারে অনুদান সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে লেখক ও চিন্তক ড. সলিমুলস্নাহ খান মনে করেন, দেওবন্দের আলেমরা উসুলে হাশতেগানা করেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের কথা চিন্তা করে। তাদের সংগ্রাম ছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে।

প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের শিক্ষক (ইউল্যাব) ড. সলিমুলস্নাহ খান বলেন, 'সরকারের সহযোগিতাকে কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যখন দেশ পরাধীন ছিল। সরকার বলতে তারা বুঝিয়েছিল ব্রিটিশ সরকারের কথা। কিন্তু এখন ব্রিটিশ সরকার যখন দেশি সরকার হয়ে গেছে, তখনো তারা মনে করে এই সরকার ব্রিটিশই আছে। জাতীয় স্বাধীনতার পরে যারা দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে, তাদের কওমি মাদ্রাসার এরা খানিকটা বিদেশি মনে করছে। এগুলো হচ্ছে মনঃস্তাত্ত্বিক পড়া।'

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উলেস্নখযোগ্য আলেমদের উপস্থিতিতে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার ঘোষণা দেন। ১৩ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ (সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, শাখা-১) থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওই গেজেটে বলা হয়- কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট বজায় রেখে ও দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতিগুলোকে ভিত্তি ধরে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান করা হলো। ওই বছরই আল-হাইআতুল উলয়া লি- জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শুরু করেন কওমি মাদ্রাসার তাকমিল হাদিসের শিক্ষার্থীরা। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে 'কওমি জননী' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গওহরডাঙ্গার চেয়ারম্যান ও গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার মহাপরিচালক মুফতি রুহুল আমীন কওমি আলেমদের পক্ষ থেকে এই উপাধি দেন।

আলেমরা বলছেন, কওমি মাদ্রাসার সরকারি স্বীকৃতির দাবি প্রথম তোলা হয় ১৯৯৭ সালের দিকে। বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এ দাবি তোলে। পরে দেশের অন্যান্য বোর্ডগুলো দাবি জানায়, সব বোর্ডকে একত্রে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করার পর আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিকভাবে দাবি তোলা হলেও এ বিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি খালেদা জিয়ার সরকার। পরে ২০০৬ সালে ঢাকার মুক্তাঙ্গণে অনশন কর্মসূচি পালন করেন তৎকালীন জোটের শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আলস্নামা আজিজুল হক।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অন্যতম নেতা মাওলানা আতাউলস্নাহ আমীন জানান, শায়খুল হাদিসের দাবিসহ দেশের আলেমদের প্রাণের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই বছরের আগস্টের শেষ দিকে গণভবনে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের উপস্থিতিতে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করেন। যদিও তা ওই সময় গেজেট হয়নি বলে প্রক্রিয়াটি থেমে যায়।

মাওলানা আতাউলস্নাহ জানান, ২০০৬ ও ২০১৭ সালে গণভবনের দুটি অনুষ্ঠানেই তিনি উপস্থিত ছিলেন।

২০১২ সালে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আলস্নামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, মুফতি রুহুল আমীনসহ বিভিন্ন আলেমরা সভা-সেমিনারের মধ্যদিয়ে আবারও দাওরায়ে হাদিসের সরকারি স্বীকৃতির দাবি তোলেন। পরবর্তীতে দফায়-দফায় আগানো-পেছানো, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন ইত্যাদি গঠনের পরও বেফাক একমত না হওয়ায় পাঁচ বছর পর অবশেষে ২০১৭ সালে আলেমদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলা ট্রিবিউন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে