logo
রবিবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৬

  হাসান মোলস্না   ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

কী হবে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে?

চট্টগ্রামের উপনির্বাচন দেখে বিএনপির কপালে ভাঁজ

চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়া, গোপন বুথে ছাত্র-যুবলীগ কর্মীদের ভোট প্রদানের অভিযোগ করেন ধানের শীষের প্রার্থী

চট্টগ্রামের উপনির্বাচন দেখে বিএনপির কপালে ভাঁজ
ঢাকা সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য ক্ষমতাসীনদের ঘোষণায় অনেকটা আশাবাদী ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কিন্তু চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি দেখে ঢাকায় সিটি নির্বাচনেও দখল, কারচুপির আশঙ্কায় নেতাকর্মীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

সোমবার চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নগরী ও উপজেলার ১৭০টি কেন্দ্রের এক হাজার ১৯৬টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ হয় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএমে। নির্বাচন শুরুর পর থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ করেন বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান। সবকটি কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়া, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, গোপন বুথে ছাত্রলীগ যুবলীগের কর্মীদের ভোট প্রদানের অভিযোগ আনেন ধানের শীষের প্রার্থী। এ ছাড়া ভোটের আগের রাত থেকে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনেন। নির্বাচন চলাকালে এতসব অভিযোগ করলেও ভোট বর্জন করেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম দেখে নির্বাচন চলাকালীন ভোট বর্জনের পক্ষে ছিলেন বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান। কিন্তু কেন্দ্রের নির্দেশে ভোট বর্জনে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকে যান। মূলত ঢাকা সিটি নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখেই ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তে যায়নি বিএনপি। প্রতিপক্ষ ভোট কারচুপির কী কী কৌশল অবলম্বন করে তা দেখতেই কেন্দ্র থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে সিটি নির্বাচনের অনিয়মের কৌশলগুলোর জবাব দেওয়া বা কারচুপির বিষয়গুলো প্রমাণসহ দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব হয়।

এদিকে উপনির্বাচন চলাকালীন বিএনপির সিনিয়র নেতারা বিভিন্ন অভিযোগ করার পাশাপাশি একই রকম ঘটনা সিটি নির্বাচনেও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করেন। সোমবার দুপুরে এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে উপনির্বাচনের খবরাখবর তার কাছে এসেছে। সেখানে প্রায় সকল কেন্দ্র সরকারি দল দখল করে নিয়েছে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভয়ভীতির মাধ্যমে এবং ইভিএমের মাধ্যমে তারা সন্দুরভাবে ভোট নিয়ে যাচ্ছে। সরকারি দল কেন্দ্র দখল করে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করাচ্ছে। ঢাকাতেও একই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রচারণার সময়ে গ্রেপ্তার ও অভিযান করবে না বলে প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। এখন গ্রেপ্তারও চলছে, অভিযানও চলছে, আক্রমণ চলছে, হামলা চলছে এবং হামলার মাধ্যমে একটা ভয়ভীতির পরিবেশ তারা সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে গতকাল সকাল থেকেই চট্টগ্রাম-৮ আসনের নির্বাচন দিনব্যাপী মনিটরিং করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। সন্ধ্যায় নির্বাচন শেষ হওয়ার পরেই কারচুপির চিত্র তুলে ধরে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। ভোটের চিত্র বর্ণনা করে রিজভী বলেন, উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের আগের দিন বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকি, হামলা আর ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা প্রদান করা হয়েছে। ধানের শীষের প্রার্থীর সমর্থক ও ভোটারদের প্রতিনিয়ত নিগৃহীত করা হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে ধানের শীষের সমর্থক ও ভোটাররা হিংসার সম্মুক্ষীণ হয়েছেন। সারা আসনজুড়ে সর্বত্রই অত্যাচারের চিত্র ছিল একই রকম। ১৭০টির মধ্যে সকালে ১২০টি ভোটকেন্দ্র থেকে এবং পরে বেলা ১১টার মধ্যে সবকটি কেন্দ্র দখল করে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দিয়েছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। বহিরাগতদের ভোটকেন্দ্রে এসে ভোটের লাইন দেখানো হলেও ওই এলাকার কোনো ভোটারই ভোট দিতে পারেননি। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, যুবদল নেতা খোরশেদ ও রফিকের ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করেছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। তারা এখন হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। এমনকি বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ৮০ বছর বয়স্ক অ্যাডভোকেট ইসাহাকের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে তাকেও আহত করেছে সন্ত্রাসীরা। এই ভোটসন্ত্রাস চলাকালে রিটার্নিং কর্মকর্তা হাসানুজ্জামানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এসব অপকর্মে সহায়তা করেছে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে ক্ষোভ প্রকাশ করে রিজভী বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে উপনির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নিজের কেরামতি অক্ষুণ্ন্ন রাখতে পেরেছেন। সিইসির তত্ত্বাবধানে উপনির্বাচনে মহাভোট ডাকাতির ঐকান্তিক উদ্যোগ লক্ষ করা গেছে। ভোট-সন্ত্রাসকে জাতীয় জীবনে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করে নিজেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের শত্রম্নপক্ষ ও গণতন্ত্রের শত্রম্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সঙ্গতকারণে বিষাক্ত সাপকেও বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু তার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন বিশ্বাস করা যায় না। সবমিলে প্রধানমন্ত্রীর উচ্চাভিলাষের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন নুরুল হুদা।

রিজভী বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনের মাধ্যমে আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগাম বার্তা দেওয়া হলো কি না জনগণ সেটি জানতে চায়।

এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, চট্টগ্রামের উপনির্বাচনে যে অনিয়ম হয়েছে ঢাকার নির্বাচনে একই ঘটনার আশঙ্কা করছেন। দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে, আবারও হবে।

এদিকে চট্টগ্রাম-৮ আসনের নির্বাচনের খবর ছাড়িয়ে পড়তেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ঢাকার বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে। ব্যাপক-উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ঢাকা সিটি নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় ঢাকার নেতাকর্মীরা অংশ নিলেও গতকাল দুপুরের পর থেকেই অনেক নেতাকর্মীকে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায়। নির্বাচনের আগে থেকেই ধরপাকড় ও হামলা নির্যাতনের আশঙ্কা করেন অনেকে।

চট্টগ্রাম-৮ আসনের নির্বাচনের প্রভাব সিটি নির্বাচনে পড়বে কিনা জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যায়যায়দিনকে বলেন, চট্টগাম-৮ আসনে নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এই আশঙ্কার কথা আগে থেকেই বারবার বলে আসছে বিএনপি। সিটি নির্বাচনেও একই চিত্র দেখা যাবে এমন আশঙ্কার কথাও আগেই বলা হয়েছে। মোট কথা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব নয় তা প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও বিএনপি চেষ্টা করছে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে আনতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে। বিএনপি গণতন্ত্রিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

একই বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসান উলস্নাহ হাসান বলেন, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম-৮ আসনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। ঢাকাও একই রকম হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সিটি নির্বাচনে কারচুপি ঠেকানোর চেষ্টা করা হবে।

আর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের মতো ঢাকা সিটিতেও একই রকম করার চেষ্টা করবে ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু ঢাকার বিএনপি নেতাকর্মীরা ঢাকাবাসীকে নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে