logo
রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬

  সাখাওয়াত হোসেন   ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন

সময় বাড়লেও বাড়েনি প্রস্তুতি

নতুন সড়ক আইনে যেসব ধারা-উপধারা রয়েছে তা কার্যকর করতে যে ধরনের ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন তার অর্ধেকও ট্রাফিক পুলিশ এখনো নিতে পারেননি

সময় বাড়লেও বাড়েনি প্রস্তুতি
পহেলা নভেম্বর থেকে নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নের কথা থাকলেও প্রস্তুতি ও গণপরিবহণ চালক-মালিকদের সচেতনতার অভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ছবিটি রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে তোলা -ফাইল ছবি
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকায় নতুন সড়ক আইন কার্যকরে দ্বিতীয় দফায় আরও এক সপ্তাহ সময় বাড়ানো হলেও এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা মোটেই বাড়েনি। বিশেষ করে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য যারা মূলত দায়ী, সেই গণপরিবহণ মালিক-চালকরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণে এখনো পুরোপুরি উদাসীন। এমনকি এ ধরনের অপ্রস্তুতির কারণে গণপরিবহণে যেসব সংকট সৃষ্টি হতে পারে তা নিয়েও কোনো মাথাব্যথা নেই তাদের।

এদিকে নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের যতটা প্রস্তুতি প্রয়োজন, তারা তার সিকিভাগই নিতে পেরেছে কি না তা নিয়ে সন্দিহান খোদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনেকেই। তাদের ভাষ্য, নতুন সড়ক আইন মেনে চলার প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা যেমন গা-ঢিলা দিয়ে রেখেছেন, তাদের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই দশা।

তাদের এ বক্তব্য ভিত্তিহীন নয়, মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের দক্ষিণ জোনের এডিসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানান, নতুন সড়ক আইনে যেসব ধারা-উপধারা রয়েছে তা কার্যকর করতে যে ধরনের ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন তার অর্ধেকও তারা এখনো নিতে পারেননি। এ কাজের প্রয়োজনীয় লোকবল ও লজিস্ট্রিক সাপোর্টও তাদের নেই।

বিআরটিএর সহকারী পরিচালক ও উপসহকারী পরিচালক পদমর্যাদার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের অপ্রস্তুতির কথা জানা গেছে। তাদের ভাষ্য, নতুন সড়ক আইন কার্যকর করতে হলে পরিবহণ খাতে 'ক্র্যাশ প্রোগ্রাম' চালাতে হবে। অথচ গতানুগতিক অভিযান চালানোর জন্য যে সংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন, তা তাদের নেই। যে কারণে বিগত সময়ও তারা ঢাকা মহানগরীতেই পর্যাপ্ত মোবাইল কোর্ট বসাতে পারেননি। নতুন সড়ক আইন যথাযথভাবে কার্যকর করতে হলে এভাবে দফায় দফায় সময় না বাড়িয়ে জোরাল প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

এদিকে গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিক, বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের আশানুরূপ প্রস্তুতি না থাকলে ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিক-চালকরা এ ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন। কোনোভাবে যাতে নতুন সড়ক আইনের ফাঁদে পড়ে ভোগান্তির শিকার হতে না হয়, এ জন্য তারা বিআরটিএতে দালালদের উপরি টাকা দিয়ে হলেও যানবাহনের সব ধরনের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স আপ-টু-ডেট করিয়ে নিচ্ছেন। খুলে ফেলছেন যানবাহনে সংযোজিত নিয়ম বহির্ভূত বাম্পার, মেজারমেন্ট স্টিক ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) বিভিন্ন কার্যালয় এবং যানবাহনের গ্যারেজ ঘুরে এ ব্যাপারে চোখে পড়ার মতো তৎপরতা দেখা গেছে।

ব্যক্তিগত যানবাহন মালিক-চালকরা মনে করেন, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া সড়ক আইন গণপরিবহণ খাতে কার্যকর করার চেষ্টা করলে এ খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাই সংশ্লিষ্টরা সে দিকে হস্তক্ষেপ না করে নিজেদের ইমেজ রক্ষার্থে ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর আইনি খড়গ চাপাবেন। এ শঙ্কা মাথায় রেখেই তারা সবাই যে যার মতো করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছেন।

অন্যদিকে বিআরটিএ ও যানবাহন মেরামতের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ঘুরে এবং গণপরিবহণের মালিক-চালকদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলে পুরোপুরি উল্টো চিত্র মিলেছে। নগণ্য সংখ্যক গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিক এ নিয়ে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং তা নিরসনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানালেও বাকিরা প্রায় সবাই নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে আদৌও সরকার মাঠে নামবে কি না তা নিয়ে ঘোর সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, নতুন সড়ক আইন মেনে চলার প্রস্তুতি যেমন তাদের নেই, তেমনি তা বাস্তবায়নে বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশও গা-ঢিলা দিয়ে রেখেছে।

সরেজমিনে রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা টার্মিনাল, বিভিন্ন বাস স্টপেজ এবং নগরীর রাস্তাঘাট ঘুরে দেখা গেছে, সব জায়গাতেই আগের মতো অনিয়ন্ত্রিতভাবেই বাস-মিনিবাস ও হিউম্যান হলারসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে। একই রুটের একাধিক বাসের প্রাণঘাতী পালস্নাপালিস্ন, অদক্ষ-লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং, ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন গণপরিবহণ পরিচালনার হিড়িক, যত্রতত্র পার্কিং, ব্যক্তিগত কার-মাইক্রোবাস ভাড়ায় ব্যবহার ও গণপরিবহনে চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য শাস্তিযোগ্য অপরাধমূলক কার্যক্রম আগের মতোই চলছে।

নতুন সড়ক আইনে সিটবেল্ট না বেঁধে গাড়ি চালালে ৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের বিধান রাখা হলেও গোটা রাজধানীতে নগর সার্ভিসের একটি বাস-মিনিবাস, হিউম্যান হলার কিংবা টেম্পোতে তা দেখা যায়নি। চালক কিংবা যাত্রীদের সিটে নতুন করে বেল্ট লাগাতে গণপরিবহণের মালিক-শ্রমিকরা কেউ কোনো ওয়ার্কশপে গেছেন- গত কয়েকদিনে এ ধরনের কোনো নজির সৃষ্টি হয়নি। এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিআরটিএ কিংবা ট্রাফিক বিভাগ কোনো প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে বলে জানেন না গণপরিবহণ শ্রমিকরা কেউই।

নতুন আইনে রেজিস্ট্রেশনবিহীন যানবাহন পরিচালনার জন্য ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৩ মাসের পরিবর্তে ৬ মাসের কারাদন্ড ভোগের নিয়ম করা হলেও গতকাল পর্যন্ত খোদ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের এ ধরনের বিপুলসংখ্যক যানবাহন চালাতে দেখা গেছে। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন বাতিল হওয়া শত শত সিএনজি অটোরিকশা, টেম্পো ও লেঙ্গুনা নগরীর বিভিন্ন রুটে এখনো নির্বিঘ্নে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

ফিটনেসবিহীন যান পরিচালনায় ৬ মাসের জেল ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হলেও নগরীতে চলাচলকারী এ ধরনের যানবাহনের সংখ্যা কত তা খোদ বিআরটিএ-ই জানাতে পারেনি। এছাড়া বেশিরভাগ গণপরিবহণের কাগুজে ফিটনেস থাকলেও বাস্তবে তা নেই। যার প্রকৃত সংখ্যা কত তা নিয়ে ট্রাফিক বিভাগও ধন্দ্বে রয়েছে।

অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য জরিমানার নতুন আইনে ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হলেও নগরীর বেশিরভাগ সড়কেই 'নো পার্কিং' কিংবা 'পার্কিং' এলাকা চিহ্নিত করা হয়নি।

বিগত সময় গণপরিবহনে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও নতুন আইনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭ ধারায় ৩ বছরের শাস্তির কথা উলেস্নখ রয়েছে। অথচ পরিবহণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ও ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও তা চিহ্নিত করার কোনো প্রস্তুতি এখনো নেওয়া হয়নি।

এদিকে নতুন আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রগণ্য, সেই গণপরিবহণ শ্রমিকদের এ ব্যাপারে যথাযথ প্রস্তুতি না নেওয়ার কারণ হিসেবে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানান, গণপরিবহণ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো তাদের জানিয়েছে- ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হলে নগরীতে ব্যাপক যানবাহন সংকট সৃষ্টি হবে। আর চাঁদাবাজি বন্ধ করা হলে তারা নানা অজুহাতে গণপরিবহণ সেক্টরে নৈরাজ্য ও অচলাবস্থা তৈরি করবে। নতুন আইনের অন্যান্য ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও গণপরিবহণে দ্রম্নত বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিরও জোরাল ফন্দিও তারা আগেভাগেই এটে রেখেছে। তাই নতুন সড়ক আইন নিয়ে শ্রমিকদের উৎকণ্ঠিত হওয়ার কিছু নেই। তাই গণপরিবহণ মালিকরাও এ নিয়ে উদাসীন বলে জানান সাধারণ শ্রমিকরা।

সায়েদাবাদ-কুড়িল বিশ্বরোড রুটের ছালছাবিল পরিবহণের চালক আনিস মিয়া জানান, তিনি ৮ বছর ধরে গাড়ি চালালেও বাসে কখনো কোনো সিট বেল্ট দেখেননি। তা কীভাবে বাঁধতে হয়, তাও তিনি জানেন না। নতুন সড়ক আইনে সিট বেল্ট না বাঁধার জন্য ৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের কথাও তিনি শোনেননি। তবে মালিক গাড়ির আসনে সিট বেল্ট লাগিয়ে দিলে তা বাঁধতে তার কোনো আপত্তি নেই। সরকার রাস্তা থেকে ফিটনেসবিহীন সব গাড়ি তুলে দিলে তাদের এ ধরনের যান চালানোর সুযোগ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন সড়ক আইন সম্পর্কে যানবাহন মালিক-চালক ও পথচারীদের সচেতন করতে ট্রাফিক পুলিশ কিংবা বিআরটিএর কোনো তৎপরতা তার চোখে পড়েনি বলে দাবি করেন আনিস।

রাজধানীর মাতুয়াইল মা অটো ওয়ার্কশপের ম্যানেজার মকবুল হোসেন জানান, নতুন সড়ক আইন কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়ার পর তারা অনেকেই ভেবেছিলেন, ওয়ার্কশপগুলোতে গাড়ির ইঞ্জিন ও বডি মেরামত এবং সিট বেল্ট লাগানোর রীতিমতো হিড়িক পড়বে। তবে চলতি নভেম্বরের প্রথম ৯ দিনে তার কোনো আলামত তারা পাননি। বরং এ তৎপরতায় কিছুটা ভাটা পড়েছে বলেও মনে করেন ওয়ার্কশপ ম্যানেজার মকবুল হোসেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে