logo
রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  সাখাওয়াত হোসেন   ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

এবার গা ঢাকা দিতে মরিয়া গডফাদারদের সহযোগীরা

ভোল পাল্টে ত্যাগী নেতাদের কাতারে দাঁড়ানোর চেষ্টা গোয়েন্দাদের হাতে ১৩৪ জন পাতি নেতার তালিকা সম্রাটকে রিমান্ডে নেওয়ার পর হুঁশ ফিরেছে অনেকের

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাকে কৌশলে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসার নামে সরকার কৌশলে তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেবে- আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের বিতর্কিত পাতি নেতারা এত দিন এ ধরনের আকাশকুসুম কল্পনায় বিভোর থাকলেও সম্প্রতি তাকে (সম্রাট) ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর পর তাদের এখন হুঁশ ফিরেছে। সম্রাটের মতো নেতাকে ছাড় দেওয়া না হলে তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কী ধরনের 'অ্যাকশন' নেওয়া হবে এ দুশ্চিন্তায় গডফাদারদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত অনেক পাতি নেতারই এখন রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বিশেষ করে শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ গডফাদারদের অবর্তমানে যারা এত দিন বিভিন্ন সেক্টরের চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও টেন্ডারবাজি নিজ দখলে নিতে বিভিন্ন এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, তারা এখন দ্রম্নত গা ঢাকা দিতে শুরু করেছেন। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে তাদের আটক করা হতে পারে এ আশঙ্কায় অনেকে সড়ক পথে, আবার কেউবা অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছেন। বিতর্কিত পাতি নেতাদের ঘনিষ্ঠজন, দলীয় কর্মী ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভুইয়া ও জি কে শামীম ছাড়াও আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনে শতাধিক দুর্নীতিবাজ সন্ত্রাসী গডফাদার রয়েছেন। যারা এত দিন দলীয় নেতাকর্মীদের মাইনাস করে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর এসব গডফাদারের অনেকে গা ঢাকা দেন। আবার কেউবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তবের্ যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে ক্লাবপাড়াভিত্তিক জুয়া-ক্যাসিনোর আসর বন্ধ হলেও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য পাচার, বেচাকেনা, টেন্ডারবাজি, ভূমি দখল এবং বিভিন্ন সেক্টরের চাঁদাবাজি আগের মতো চলমান রয়েছে। যা গডফাদারদের অবর্তমানে তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এত দিন গোপনে পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বেরিয়ে আসায় এবার ওইসব সহযোগীদের ধরপাকড় অভিযান শুরু হয়েছে। এরই মধ্যের্ যাব ও পুলিশ অত্যন্ত গোপনে সন্ত্রাসী গডফাদারদের নানা

অপকর্মের সহযোগী অন্তত ২০ জন পাতি নেতাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করেছে। যা টের পেয়ে অন্যরা এখন সব কিছু ফেলে নিজেকে রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

সন্ত্রাস-দুর্নীতির গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার বেশ কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গে কথা বলে এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। তারা জানিয়েছেন, আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে উঠে আসা খালেদ গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে তার সহযোগীদের সম্পর্কে অনেক তথ্য গোপন করতে পারলেও শারীরিকভাবে অসুস্থ সম্রাটের পক্ষে তা অনেকটাই অসম্ভব। গোয়েন্দাদের কৌশলী জেরার মুখে সম্রাট হয়তো তার সহযোগীদের সবার নাম সহজেই বলে দেবেন। এমনকি তাদের অপকর্মের ফিরিস্তিও হয়তো তিনি গোয়েন্দাদের সামনে তুলে ধরবেন। তাই এ নিয়ে তার সহযোগীরা কেউ ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।

এছাড়া অনেকের ধারণা, আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিলের আগে-পরে চলমান শুদ্ধি অভিযান আরও জোরদার হবে। এ সময় দলের সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজ গডফাদারদের পাশাপাশি তাদের সহযোগী পাতি নেতাদের বিরুদ্ধেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অ্যাকশনে নামবে। তাই তারা সময় থাকতে নিরাপদে আত্মগোপনে চলে যেতে চাইছেন।

গডফাদারদের সহযোগী বিতর্কিত এসব পাতি নেতা মনে করছেন, শুদ্ধি অভিযানের মেয়াদকাল দীর্ঘ না হলেও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হোতারাও আগামী কাউন্সিলে দল থেকে নিশ্চিত বাদ পড়বেন। এমনকি তাদের অনেককে ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ মেয়াদে কারা ভোগ করারও জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। ফলে শুদ্ধি অভিযান শুরুর আগে কিংবা পরে যেসব গডফাদার বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন তাদের দেশে ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের যেসব নেতা এত দিন কোণঠাসা হয়ে ছিলেন, তারা এখন ঘুরে দাঁড়াবেন। এত দিন গডফাদারদের সহযোগী হিসেবে দাপিয়ে বেড়ানো পাতি নেতাদের চরম দুঃসময় পার করতে হবে। তাই নানাভাবে অবৈধ উপার্জন করে এরই মধ্যে যারা আঙুুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছেন, তারা এখন অনেকে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে আত্মগোপনের টার্গেট নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

র্

যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পলাতক গডাদারদের পাশাপাশি তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা অনেকেই গোয়েন্দা জালে রয়েছেন। তারা যাতে গোপনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন এজন্য প্রতিটি বিমানবন্দরের পাশাপাশি সড়কপথের সীমান্তের ইমিগ্রেশনে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া তারা যাতে চোরাপথে সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারেন এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গডফাদারদের নানা অপকর্মের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে এখন পর্যন্ত ১৩৪ জনের নাম পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সদ্য বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট এবং সাংগঠনিক সম্পাদক (বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার ২৭ জন সহযোগী রয়েছেন। এছাড়া একই কমিটির সহসভাপতি এনামুল হক আরমানের ৫ জন, সহসভাপতি সোহরাব হোসেন স্বপনের ৪ জন, সহসভাপতি সরোয়ার হোসেন মনার ৫ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল হক সাঈদের ৮ জন, দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান আনিসের ৭ জন ও নির্বাহী সদস্য জাকির হোসেনের ৩ জন এবং যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের ৮ জন, গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনুর ৫ জন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভুঁইয়ার ৭ জন, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ ওরফে কালা ফিরোজের ৪ জন, মোহামেডান ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেনের ৫ জন, ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সভাপতি কাজলের ২ জন ও সাধারণ সম্পাদক তুহিনের ১ জন, যুবলীগ নেতা জসিম উদ্দিনের ২ জন, উত্তরা পশ্চিম থানা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী জাকারিয়ার ৪ জন সহযোগীর নাম রয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ২৫ জন অবৈধ অস্ত্রধারী। সহযোগীদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের ভুঁইফোঁড় পাতি নেতা। এছাড়া বেশকিছু সহযোগীর দলীয় সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও গডফাদারদের দাপটের কারণে তারাও পাতি নেতাদের কাতারেই স্থান করে নিয়েছিলেন।

এদিকে ক্যাসিনো বাণিজ্যের গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রথম সারির দুই নেতার ৪ সহযোগী, যুবলীগের ৫ নেতার ৬ সহযোগী এরই মধ্যে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে অবস্থান করছে বলে গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছে। এদের মধ্যে ৬ জন শুদ্ধি অভিযান শুরুর পরপরই দেশ ছাড়েন। বাকি তিনজন গা ঢাকা দেন সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর পরই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, গডফাদারদের পাশাপাশি তাদের নানা অপকর্মের সহযোগীদের চিহ্নিত করতে বেশকিছুটা সময় লেগেছে। এই সুযোগে তাদের বেশ কজন নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে