logo
রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  নূর মোহাম্মদ   ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

অবশেষে এমপিও পেল ১৬৫১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় ১১৬টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের এমপিও ফাইল এখনো প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে রয়েছে

দীর্ঘ ৯ বছর পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির জট খুলল। সারাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ১৬৫১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার এ সংক্রান্ত ফাইল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। সব যোগ্যতা থাকার পরও শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় ১১৬টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের এমপিও ফাইল এখনো প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে রয়েছে। সেটিও যেকোনো সময় অনুমোদন হতে পারে বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মধ্য দিয়ে অন্তত ৩০ হাজার শিক্ষকের দীর্ঘ বছর বিনা বেতনে চাকরি জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠান এমপিও হলেও ব্যক্তির এমপিও হয় না। সেজন্য ওই শিক্ষকের একাডেমিক যোগ্যতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সঠিক হতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব দেশের বাইরে থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর প্রশাসনিক সব কাজ শেষ। এখন শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। সেটি কবে হবে সেটা শিক্ষামন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতনরা বলতে পারবেন। জানা গেছে, এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী সব যোগ্যতা অর্জনের পরও ১১৬টি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক কারণে এবার বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কারিগরি ও মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফাইল পাঠানো হলেও গতকাল পর্যন্ত তা মন্ত্রণালয়ে আসেনি।   

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্তির অনুমোদনের জন্য একটি সার সংক্ষেপ তৈরি করে একটি তালিকা গত ৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সঙ্গে ২০১৮ সালের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালাও পাঠায় মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গত ২৮ আগস্ট ফাইলটি ফেরত পাঠানো হয়। সঙ্গে জানতে চাওয়া হয়, কোন মানদন্ডের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ২০১৮ সালের নীতিমালার বেশ কিছু ত্রম্নটি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয় ওই নির্দেশনায়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) তৈরি করা বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সারাদেশে এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়া হয়। এমপিওভুক্তির নীতিমালা-২০১৮-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, চারটি মানদন্ডে প্রতিষ্ঠান যাছাই করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের বয়স ২৫ নম্বর, শিক্ষার্থীর সংখ্যার ক্ষেত্রে ২৫ নম্বর, পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫ নম্বর এবং পাসের হারে ২৫ নম্বর করে মোট ১০০ নম্বরের গ্রেডিং করা হয়। এমপিও নীতিমালা-২০১৮ তে এমপিওভুক্তির জন্য পাঁচটি স্তর নির্ধারণ করা হয়। স্তরগুলো হলো-নিম্ন মাধ্যমিক (৬ষ্ঠ থেকে ৮ম), মাধ্যমিক (৯ম থেকে ১০ম), উচ্চমাধ্যমিক (৬ষ্ঠ থেকে ১২শ), কলেজ (১১শ থেকে ১২শ), স্নাতক (পাস) তথা ডিগ্রি কলেজ  (১১শ থেকে ১৫শ)। এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মোট আবেদন জমা পড়েছিল ৬ হাজার ১৪১টি। যাচাই-বাছাই শেষে ও ক্ষমতাসীন এমপি-মন্ত্রীদের তদবিরে বিশেষ বিবেচনায় ১ হাজার ৭৬৭টি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করে প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তাতে  ৫৫১টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১০০২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬৭টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ৯৪টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ এবং ৫৩টি ডিগ্রি (অনার্স-মাস্টার্স) ছিল। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৬৫১টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে। তবে কোন শাখায় কতটি প্রতিষ্ঠান তা জানা সম্ভব হয়নি।  

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিষ্ঠান বাছাই করার পর দেখা যায়, সারাদেশের ৮৯টি উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। সমতার স্বার্থে এসব উপজেলায় এমপিওভুক্তির নীতিমালার ২২ নম্বর ধারা প্রয়োগ করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। এ ধারায় বলা হয়েছে, শিক্ষা অনগ্রসর, ভৌগোলিকভাবে অসুবিধাজনক, পাহাড়ি, হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চল, নারী শিক্ষা, সামাজিকভাবে অনগ্রসর গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। নীতিমালার এ ধারা প্রয়োগ করে ৮৯টি উপজেলার মধ্যে এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মানদন্ড হিসেবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নূ্যনতম ১০০ জন এবং কমপক্ষে দুই বছরের স্বীকৃতি থাকার বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বাদপড়া প্রতিটি উপজেলা/থানা থেকে একটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে। এই মানদন্ডে ৬০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়েছে। ২২ ধারা প্রয়োগ করে মোট ৬১টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের দুর্গম ও পার্বত্য এলাকা, পাহাড়ি, হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায় নীতিমালার ১৪ ধারা অনুসারে এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, এমন ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৫০০ জন বা তার বেশি এবং কমপক্ষে দুই বছরের স্বীকৃতি থাকার শর্ত পূরণ করতে হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাদপড়া ৮৯টি উপজেলায় ২২ ধারা প্রয়োগ করে ৬১টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার পরও ২৯টি উপজেলা ও থানা বাদ থেকে যায়-যেগুলোর মধ্যে উপজেলা ১২টি ও থানা ১৭টি। এই ১২ উপজেলার সাতটি থেকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়েছে। যোগ্য না হওয়ায় অপর পাঁচটি উপজেলার কোনো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। অপরদিকে, দেশের ২৩টি উপজেলা/থানা এলাকা থেকে এমপিওভুক্তির জন্য এ বছর কোনো আবেদনই পাওয়া যায়নি। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এমপিওর বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিভাগের সচিব মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কয়েক দফা তালিকা পাঠানো হয়েছে। কারিগরি ও মাদ্রাসার এমপিও অনুমোদনের ফাইল এখন পর্যন্ত আমার বিভাগে আসেনি।'   

নীতিমালা সংশোধন: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির নীতিমালায় ডিগ্রি (স্নাতক) স্তরের যোগ্যপ্রতিষ্ঠান নির্ধারণের ক্ষেত্রে নানা ত্রম্নটি ছিল। ডিগ্রি স্তরের এমপিও করার ক্ষেত্রে নীতিমালায় পরীক্ষার্থী ও পাসের হার উলেস্নখ করা হয়নি। অভিযোগ ছিল, এমপিও প্রাপ্তির যোগ্যতা নির্ধারণে ১০০ নম্বরের গ্রেডিং হলেও ডিগ্রি স্তরের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৫০ নম্বরের গ্রেডিং করা হয়েছে। গ্রেডিং পদ্ধতির এ অসঙ্গতির কারণে ডিগ্রি স্তরের অনেক যোগ্যপ্রতিষ্ঠান এমপিওর তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নীতিমালাটি সংশোধন করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। যে প্রক্রিয়ায় এমপিওভুক্ত করা হবে: মাউশির কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জিও জারির পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের মাধ্যমে অনলাইনে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে হবে। শিক্ষা কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই শেষে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন। সেখান থেকে মাউশির নয়টি আঞ্চলিক পরিচালকের কাছে আবেদন ফরোয়ার্ড করবেন। সেখান থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মাউশির ডিজির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অনুমোদন দেওয়া হবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলেই শিক্ষকরা এমপিওভুক্তি হবেন না। সারাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এমপিওভুক্ত হলেও সব যোগ্যতা পূরণ না করায় একজন শিক্ষকও এমপিওভুক্ত নয়। কারণ অনেক শিক্ষকের সঠিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হয়নি। সার্টিফিকেট বাণিজ্যের কারণে বন্ধ দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিয়ে চাকরি নিয়েছেন। এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষককের নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচই-বাছাই করেই এমপিও দেওয়া হবে।  

২০১০ সালের ১৬ জুন সর্বশেষ ১ হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। তখনই অনেক প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে। দীর্ঘ ৯ বছরের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি বন্ধ থাকায় নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকাটি দীর্ঘ হয়। বর্তমানে সারাদেশের প্রায় সাড়ে আট হাজার নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে