logo
রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬

  সাখাওয়াত হোসেন   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

গোপন অনুসন্ধান শুরু

এবার অভিযান গডফাদারদের বাগানবাড়ির আখড়ায়

এসব বিলাসবহুল বিনোদনকেন্দ্রের স্থাপনা নির্মাণ ও জমি ক্রয়ের বিশাল অঙ্কের অর্থ দুর্নীতিবাজ গডফাদাররা কে কীভাবে জোগাড় করেছে-তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা

রাজধানীতে একের পর এক ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে বিশাল অঙ্কের জুয়ার অর্থ ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ-বিয়ার উদ্ধারের পর এবার দুর্নীতিবাজ গডফাদারদের বাগানবাড়ির খোঁজে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা। একই সঙ্গে এসব স্পটে ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার জোর প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে এসব বিলাসবহুল বিনোদনকেন্দ্রের স্থাপনা নির্মাণ ও জমি ক্রয়ের বিশাল অঙ্কের অর্থ দুর্নীতিবাজ গডফাদাররা কে কীভাবে জোগাড় করেছে-সরকারের আর্থিক গোয়েন্দারা এ ব্যাপারে গোপন অনুসন্ধান শুরু করেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, শুধু রাজধানীর ক্যাসিনোগুলোতেই নয়, ঢাকার উপকণ্ঠে গড়ে ওঠা বিপুলসংখ্যক বিলাসবহুল বাগানবাড়িতেও নিয়মিত মদ-জুয়ার বড় আসর বসছে। এছাড়া সেখানে নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপও চলছে। অথচ বেশির ভাগের বাগানবাড়ির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতিবাজ গডফাদারদের হাতে থাকায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নিতে পারছে না। তাই এবার এসব আখড়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজখবর নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ টিম দিয়ে একযোগে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১০ বছরে গাজীপুর, কালিয়াকৈর, রূপগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী ও সাভারসহ রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ছোটবড় অন্তত দুই শ বাগানবাড়ি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে বেশকিছু বাগানবাড়ি বা রিসোর্ট সাধারণ মানুষের অবসর যাপন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বাদবাকি প্রায় সবগুলোতেই মদ-জুয়াসহ নানা অনৈতিক বাণিজ্য জমিয়ে তুলেছে রাজনৈতিক গডফাদাররা। মোটা অঙ্কের মাসোহারার বিনিময়ে স্থানীয় থানা পুলিশ এসব অপকর্মে পূর্ণ সহযোগিতা দিচ্ছে। এমনকি এসব অনৈতিক বিনোদনকেন্দ্রে কোনো ধরনের ঝামেলা হলে তারা নিজেরাই তা মিটিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে সেখানকার এসব অপকর্মের তথ্য এত দিন শীর্ষ প্রশাসনের অগোচরেই রয়ে গেছে।

গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, রাজনৈতিক গডফাদারদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণার পর প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে ঢাকার উপকণ্ঠ এলাকার ছোটবড় সব ধরনের বাগানবাড়ির তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব বাগানবাড়ির মূল মালিক কারা কিংবা মালিকদের পর্দার আড়ালে রেখে কারা এসব বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন, সেখানে কোন ধরনের অতিথিদের নিয়মিত আনাগোনা এবং মদ-জুয়ার পাশাপাশি অন্য কোনো ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ চলছে কি না সে সম্পর্কে গোয়েন্দাদের বিস্তারিত তথ্য জোগাড় করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া এসব বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না তা-ও খুঁজে দেখার তাগিদ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন কর্মকর্তা জানান, গাজীপুর, কালিয়াকৈর ও চন্দ্রাসহ এর আশপাশের এলাকায় অন্তত ৭৪টি বাগানবাড়ি বা রিসোর্ট রয়েছে। তবে এর বেশির ভাগই অবসর বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়। এসব বাগানবাড়ির মালিকরা এ কেন্দ্রগুলো মূলত নিজেদের বিনোদনের জন্যই তৈরি করেছেন। তাদের কেউ কেউ সপ্তাহে এক দিন কিংবা দুদিন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সেখানে ঘুরতে আসেন। কোনো কোনো বাগানবাড়িতে মাসে এক-দুবার নাচগান ও মদ-জুয়ার বড় আসর জমে। তবে বাগানবাড়ির মালিকরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয় পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং এ ব্যাপারে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

কালিয়াকৈরের বাসিন্দারা জানান, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী রাজনীতিকরা বন বিভাগের শালবনের আশপাশে স্থানীয়দের কাছ থেকে অল্প দামে ৫-১০ বিঘা জমি কেনেন। পরে তারা শালবনের বেশকিছু জায়গা দখল করে দেয়াল ঘিরে বাগানবাড়ি গড়ে তোলেন। এসব মালিকের সঙ্গে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে যোগসাজশ থাকায় সহসা কেউ তাদের ঘাঁটাতে সাহস পান না।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা রিসোর্ট বা বাগানবাড়িগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হলেও সেখানেও অতিথিদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মদ-জুয়ার আসর বসানোর সুযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ নিজেরাই এসব আখড়া নিয়মিত পরিচালনা করছেন। আর এজন্য তারা স্থানীয় থানা পুলিশ, ডিবি-এসবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত মাসোহারা দিচ্ছেন।

এদিকে মুন্সীগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও রূপগঞ্জে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বেশ কজন গডফাদারের চোখ ধাঁধানো বাগানবাড়ি রয়েছে বলে গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছে। সেখানে সুইমিং পুল, মদের বার, জুয়ার রুম ও বারবিকিউ সেন্টার তৈরি করতেই ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি কক্ষই ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার দামি আসবাবপত্রে সুসজ্জিত। মদের বারের অনুমতি না থাকলেও সেখানকার ফ্রিজে লাখ লাখ টাকার বিদেশি মদ-বিয়ার মজুত রাখা হচ্ছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, পরিবহন ব্যবসার তোলা আদায়কারী, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক কারবারি ও অস্ত্রের ব্যবসা করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া অতিথিরা নিত্যনতুন নায়িকা-গায়িকা কিংবা সুন্দরী কলগার্ল নিয়ে সেখানে আসছেন। অথচ অনৈতিক এসব কার্যক্রমে বাধা দিতে গেলে খোদ পুলিশকেও বিপাকে পড়তে হচ্ছে। রাজনৈতিক দাপট দেখিয়ে পুলিশের ছোটোখাটো কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময় বাগানবাড়িতে আটকে রাখারও অভিযোগ পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিল-আরামবাগ ক্লাবপাড়া এলাকা থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারকৃত একাধিক জুয়াড়ি জানান, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত জুয়াড়িরাই মূলত ক্লাবপাড়ার খেলোয়াড়। তারা তাদের মান অনুযায়ী বিভিন্ন ক্লাবে নিয়মিত জুয়া খেলেন। তবে বড় জুয়াড়িরা সাধারণত সেখানে যান না। তাদের আসর জমে ঢাকার বিভিন্ন দামি আবাসিক হোটেলে। আবার এদের একটি অংশ নারীসঙ্গ ও মদের নেশায় বিভোর হয়ে জুয়া খেলতে জড়ো হন তাদের নিজস্ব বাগানবাড়িতে। অনিয়মিত এসব আসর মাসে দু-চার দিন বসলেও তাতে ক্লাবপাড়ার এক মাসের চেয়ে বেশি অঙ্কের জুয়া খেলা চলে বলে দাবি করেন তারা।

এছাড়া যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের কিছু বিতর্কিত হাইব্রিড নেতা মহানগরীর অভিজাত আবাসিক এলাকা, পর্যটন স্পটসহ বিভিন্ন এলাকায় রেস্টহাউস, গেস্টহাউস, গেস্টইনের নামে বাড়ি ভাড়া করে মাদক-জুয়ার আখড়া গড়ে তুলেছেন। অনেকে নিজের বাসাবাড়ি অসামাজিক কার্যকলাপে ব্যবহার করছেন বলে তথ্য দিয়েছেন গ্রেপ্তারকৃত মাদকসেবী জুয়াড়িরা।

ডিবি পুলিশের এএসপি পদমর্যদার একজন কর্মকর্তা জানান, বাগানবাড়িতে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার রাতে টঙ্গীতে জার্মান প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা বাদলের মালিকানাধীন জাভান হোটেলে হানা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত ১৮ জন নারী-পুরুষকে গোয়েন্দারা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলে মূল হোতা বাদল পালিয়ে গেছেন।

সিআইডির আর্থিক গোয়েন্দারা জানান, এরই মধ্যে তারা গাজীপুর, কালিয়াকৈর, রূপগঞ্জ, সাভার, মুন্সীগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের দেড় শতাধিক ছোটবড় বাগানবাড়ির তথ্য জোগাড় করেছে। যার অন্তত ৩০টির মালিক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। এসব বাগানবাড়ি ও রিসোর্ট তৈরি করতে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা খরচ হলেও তাদের অধিকাংশের আয়কর নথিতে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। এমনকি এদের অনেকেই নির্দিষ্ট কোনো পেশায়ও জড়িত নন।

বাগানবাড়ির তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা টিমের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, তারা ৮টি দলে বিভক্ত হয়ে ঢাকার উপকণ্ঠ এলাকার বাগানবাড়ির তালিকা তৈরির কাজ শুরু করছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে এটি সম্পন্ন হলে তারা মূল কাজের দিকে এগুবেন। এসব বাগানবাড়ির মালিকদের আয়ের উৎসের সঙ্গে বাগানবাড়ি তৈরির খরচার অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তাদের গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এ অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কোনো উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হবে। এক্ষেত্রে এসব মালিকের কে কোন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, কিংবা এদের কে কোন পদধারী তা বিবেচনায় নেওয়া হবে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে এ ধরনের অভিযানে উলেস্নখযোগ্য কোনো ফল বয়ে আনবে কি না তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক গডফাদাররা সব সময় আটঘাট বেধেই মাঠে নামেন। তাই বিলাসবহুল বাগানবাড়ির অর্থের উৎস কী দেখাবেন তা-ও হয়তো আগেভাগেই ঠিক করে রেখেছেন। এছাড়া গডফাদারদের অনেকেই এসব বাগানবাড়ির নথিপত্রে দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনদের মালিক হিসেবে দেখিয়েছেন। তাই এ ক্ষেত্রে তারা সহজেই পার পেয়ে যাবেন। অন্যদিকে বেশকিছু বাগানবাড়ির মালিক মূলত বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা। গত ১১ বছর ধরে তারা ক্ষমতায় না থাকায় তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দলের গডফাদারদের দিয়ে রেখেছেন। তাই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত অ্যাকশন নেয়া কঠিন হবে।

এদিকে মদ-জুয়াসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়া হিসেবে গড়ে ওঠা বাগানবাড়ি কিংবা রিসোর্টগুলোতে কবে নাগাদ জোরালো অভিযান শুরু করা হবে এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ সুনির্দিষ্ট কোনো দিন জানাতে পারেননি। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি পদমর্যদার একজন কর্মকর্তা জানান, দ্রম্নততম সময়ের মধ্যে অভিযান শুরু করার জন্য তারা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন। তবে এ ব্যাপারে তারা এখনই বড় ধরনের কোনো অ্যাকশনে নামছেন না। কেননা গত কয়েক দিনে ঢাকার ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনোগুলোতে অভিযান চালানোর পর দুর্নীতিবাজ গডফাদাররা সতর্ক হয়ে উঠেছে। তারা এসব স্পষ্ট থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। তাই সময় সুযোগ বুঝেই জাল ফেলা উচিত হবে বলে মনে করেন ওই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে