logo
শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

ক্যাসিনোর টাকার ভাগ নিতেন কারা, নাম বলেছেন খালেদ

তিন মামলা দায়ের সাত দিনের রিমান্ডে

ক্যাসিনোর টাকার ভাগ নিতেন কারা, নাম বলেছেন খালেদ
যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকের্ যাবের বুলেট প্রম্নফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে থানায় হস্তান্তর করা হয় -যাযাদি
রাজধানীর বেশ কয়েকটি ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো থেকে যে আয় আসে তার একটি বড় অংশ যায় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে। এই টাকার একটি বড় ভাগ পেতেন ঢাকা মহানগর যুবলীগের নেতারা। ক্যাসিনোর টাকার ভাগ কে কে নিতেন তাদের নাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বলেছেন গ্রেপ্তার যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

সূত্র জানায়, রমরমা ক্যাসিনো ব্যবসার জন্য রাজধানীর বেশ কয়েকটি ক্লাব ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। ক্লাবের হলরুম ভর্তি জুয়াড়িরা থাকেন জুয়ায় মত্ত। ক্যাসিনোর নিয়ম অনুযায়ী জুয়া খেলতে গেলে খাবার ফ্রি। প্রায় প্রতিটি ক্লাবে উন্নতমানের খাবার ও মদ-বিয়ার পরিবেশন

করা হয়।

রাত গভীর হলে ক্যাসিনোতে উঠতি মডেল ও শোবিজ জগতের গস্নামার গার্লরা আসতে শুরু করেন। আকর্ষণীয় মেকআপ আর পাশ্চাত্য পোশাকে হলরুমে এসে আড্ডায় মেতে ওঠেন তারা। গস্নামার গার্লদের উপস্থিতি জুয়াড়িদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়।

এ সময় তারা মদের নেশায় মাতাল হয়ে আরও বড় বড় টাকার বাজি ধরেন। একপর্যায়ে একরাতেই নিঃস্ব হয়ে যান অনেকে। কোটি টাকা হেরে শেষ রাতে বাড়ি ফেরার টাকাও থাকে না অনেকের। তখন ক্যাসিনো থেকে বাড়ি ফেরার খরচ হিসেবে জুয়াড়ির হাতে মাত্র দেড় হাজার টাকা ধরিয়ে দেয়া হয়।

কোটি কোটি টাকার ক্যাসিনো সেটাপ, নারী-পুরুষ এনে সেগুলো পরিচালনা করাসহ নানা অবৈধ কাজ চলত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ইয়ংমেনস ক্লাবেও। এত বড় আয়োজনের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ জানত না? জানলেও তারা চুপ ছিল কেন?

আটকের পর র?্যাব-৩ কার্যালয়ে নিয়ে খালেদ মাহমুদকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র?্যাব। ক্যাসিনো থেকে উপার্জনের টাকা কার কার কাছে যেত, সে নিয়েও প্রশ্ন করা হয় তাকে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রাতভর জিজ্ঞাসাবাদে মতিঝিলের ক্যাসিনো পরিচালনার বিষয়টি রাজধানীর কয়েকটি থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতেন বলে দাবি করেন খালেদ। তবে পুলিশের সঙ্গে ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য কোনো আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেননি তিনি।

সূত্র জানায়, খালেদের ক্যাসিনোর বিষয়ে পুলিশ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সংস্থা এবং রাজনীতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জানতেন। তাদের 'ম্যানেজ করে' ক্যাসিনো চালাতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি।

এ বিষয়ে র?্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, তাকে সংক্ষিপ্ত সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে সেগুলো এখনই প্রকাশ করা যাবে না। বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নামও বলেছেন খালেদ। তারা সেগুলো নিয়ে কাজ করবেন। ঢাকায় অবৈধভাবে কোনো ক্যাসিনো থাকতে দেবে না র?্যাব।

গুলশান থানায় ৩ মামলা

এদিকে রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়াংমেনস ক্লাবের অবৈধ ক্যাসিনো মালিক যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক রাখা এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলশান থানায় এ মামলা করা হয়।

খালেদা মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধের্ যাব-৩ এর পক্ষ থেকে এ মামলা করা হয়। গুলশান থানায় অস্ত্র ও ইয়াবা রাখার অভিযোগে এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে এ তিন মামলা করা হয়। আর মাদক আইনে মামলা করা হয় মতিঝিল থানায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বুধবার রাতে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের সময় অস্ত্র ও ইয়াবা পাওয়া যায়। এ ছাড়া তার ক্যাসিনো থেকে নারী, মদসহ নিষিদ্ধ পণ্য উদ্ধার করের্ যাব।

বুধবার রাতে দীর্ঘ অভিযান শেষে গুলশানের বাসা থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে অস্ত্র, গুলি, মাদকসহ গ্রেপ্তার করের্ যাব। এরপর বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্তর্ যাব-৩ এর হেফাজতে ছিলেন খালেদ।

গতকাল মামলা দায়েরের পর খালেদকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। তার রিমান্ড আবেদন করে আদালতে তোলা হবে বলে গুলশান থানা পুলিশ জানিয়েছে।

বুধবার খালেদকে গ্রেপ্তারের আগে ফকিরাপুলের ইয়াংমেন ক্লাবে নিষিদ্ধ ক্যাসিনোতেও অভিযান চালায়র্ যাব। এখান থেকে দুই নারীসহ ১৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। ক্যাসিনোতে মদ আর জুয়ার বিপুল সরঞ্জামের পাশাপাশি প্রায় ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

ক্লাবটির সভাপতি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। অনেক দিন ধরে এখানে জুয়াসহ নানা অপকর্ম চলছিল। সাম্প্রতিককালে অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ার পর বুধবার অভিযান পরিচালিত হয়। ইয়াংমেনস ক্লাবের পর ওই রাতেই ঢাকার আরও তিনটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায়র্ যাব।

র্

যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ইয়াংমেন্স ক্লাব থেকে মাদক এবং জুয়ার সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে। ক্লাবের কাউন্টার থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা জব্দ করা হয়।

তিনি বলেন, এদিন মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব এবং বনানী এলাকার একটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালানো হয়। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব থেকে মাদক, জালটাকা, বিপুল পরিমাণ টাকা ও ক্যাসিনো সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে।

এরপর ক্যাসিনোটি সিলগালা করে দেয়া হয়। বনানীর আহমেদ টাওয়ারে অবস্থিত গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামে ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের নেতৃত্বে আছেন মমিনুল হক সাঈদ এবং আবু কাউসার মোলস্না নামে দুই ব্যক্তি।

দুজনই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এদিকে বুধবার রাতেই গুলিস্তানে পীর ইয়েমেনী মার্কেটসংলগ্ন একটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায়র্ যাব। স্থানীয় কয়েকজন জানান, এ ক্যাসিনোর নেতৃত্বে আছেন ইসমাইল হোসেন সম্রাট।

খালেদ মাহমুদের সন্ধানে বুধবার দুপুরের পর থেকে তার গুলশান-২ এর ৫৯ নম্বর রোডের ৫নং বাসা ঘিরে রাখের্ যাব। প্রিমোরোজ গার্ডেন নামে ৬ তলাবিশিষ্ট এ ভবনের তিনতলায় পরিবার নিয়ে থাকেন যুবলীগ নেতা খালেদ।

বাড়ির ব্যবস্থাপক জানান, প্রথমে ডিবি পরিচয়ে একদল লোক বাসায় আসে। এরপর আসের্ যাব। রাতে এখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় বাসার লকার ও দেয়াল আলমিরা থেকে অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, টাকা, ডলার উদ্ধার করা হয়।

ক্যাসিনো নিয়ে এবার কড়া

বার্তা দিল পুলিশ

ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, রাজধানীতে অবৈধ জুয়ার আড্ডা, ক্যাসিনো চলতে দেয়া হবে না। এসব জুয়ার বোর্ড, ক্যাসিনো পরিচালনার ক্ষেত্রে যত বড় প্রভাবশালীই জড়িত থাকুক না কেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর হবে।র্ যাব অভিযান শুরু করেছে পুলিশও করবে। ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার জুয়ার বোর্ড ও ক্যাসিনোর তালিকা করা শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, 'আমি এ সপ্তাহেই কমিশনার হিসেবে কাজ শুরু করেছি। যারা এ বিষয় দেখেন তাদের নির্দেশ দিয়েছি, কোথায় কী হচ্ছে, কারা পরিচালনা করছে তা তালিকা করে জানাতে। তারা কাজ করছেন। ইতোমধ্যে একটি জোনের তালিকা আমি পেয়েছি। অন্য জোনের তালিকাও করা হচ্ছে।র্ যাব যেমন অভিযান শুরু করেছে তেমনি পুলিশের ভূমিকাও একই রকম। স্পষ্ট করে বলছি, রাজধানীর কোথাও জুয়ার বোর্ড কিংবা ক্যাসিনো চলতে দেয়া হবে না।'

জুয়ার বোর্ড কিংবা ক্যাসিনোর সাথে চলছে মাদক সেবন। সেখানের্ যাবের অভিযানে মাদকের উপস্থিতি দেখা গেছে। মাদক সেবনরত অবস্থায়ও অনেককে দেখা গেছে।

এ ব্যাপারে কমিশনার বলেন, ক্যাসিনোতে যারা জুয়া খেলতে আসে তারাই মাদক সেবন করছে। ক্যাসিনো যদি বন্ধ হয় তাহলে সেখানে মাদক সেবনও বন্ধ হবে। ক্যাসিনো বন্ধ করেও যদি কেউ মাদকের কারবার চালানোর চেষ্টা করে তবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাজধানীতে অনেক ডিজে পার্টি হয়, সেখানে মাদক সেবনের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের আনাগোনাই বেশি। সে ব্যাপারে ডিএমপি কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, নির্মল বিনোদন হলে পুলিশ সহযোগিতা করবে। কিন্তু সেখানে বিনোদনের নামে যদি অশালীন ও অবৈধ কিছু চলে, মাদক সেবন হয় তাহলে সেখানেও একই রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে