logo
রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬

  নূর মোহাম্মদ   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

উপবৃত্তির টাকায় প্রমোদ ভ্রমণ!

২০ কর্মকর্তার জন্য বরাদ্দ এক কোটি টাকা প্রকল্পের শেষ সময়ে বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন

উপবৃত্তির টাকায় প্রমোদ ভ্রমণ!
প্রতীকী ছবি
প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ঝরেপড়া রোধে উপবৃত্তি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি থাকলেও এর আগে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী-সচিবসহ অন্তত ২০ জন কর্মকর্তা। এ অবস্থায় প্রকল্পের শেষ সময়ে এ ধরনের আয়োজন উপবৃত্তিতে কি প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে এটিকে প্রমোদ ভ্রমণ আখ্যা দিয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখা সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক স্তরের উপবৃত্তি প্রকল্পের টাকায় এ প্রমোদ ভ্রমণের আয়োজন করেছেন উপবৃত্তি প্রকল্প। আগামী অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দুটি টিম অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করার কথা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড টিমে নেতৃত্ব দেবেন ওই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, অন্য টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর টিমে চুক্তিভিত্তিক কয়েকজন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রকল্প ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়ে যাবে। এরপর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার ব্যক্তিদের চাকরি শেষ। তারা যদি অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশ থেকে যান এর দায়ভার কে নিবে?

সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ করতে শতভাগ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দিতে একটি প্রকল্প চালু করা হয় ২০১৭ সালের জুনে। পরে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্পের শুরুর ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৮৫৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ৬ হাজার ৯২৩ কোটি ছয় লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। উপবৃত্তি রূপালী ব্যাংকের শিওর ক্যাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। সার্ভিস চার্জ বাবদ রূপালী ব্যাংককে প্রকল্পের মোট বরাদ্দকৃত অর্থের দেড় শতাংশ দেয়া হতো। প্রকল্পের টাকায় বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা সুবিধা নিতে কর্মকর্তারা দেড় শতাংশের পরিবর্তে দুই শতাংশ সার্ভিস চার্জ বাড়িয়ে গত মাসের ২৫ তারিখ রূপালী ব্যাংকের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেন। চুক্তিতে বলা হয়, বাড়তি টাকায় রূপালী ব্যাংক, মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ করাবেন। প্রতিবার ভ্রমণে ব্যাংকের পাঁচজন কর্মকর্তা প্রকল্পের অর্থে বিদেশ ভ্রমণ করবেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অর্থাৎ আগামী তিন মাসের মধ্যে বিদেশ সফর বাবদ ১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেই টাকায় এবার বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার তালিকাসহ একটি প্রস্তাব প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে উপবৃত্তি প্রকল্প। সেখানে দুটি টিমে ভাগ করা হয়েছে। একটি টিমের নেতৃত্ব দেবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। ওই টিম আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড যাবেন। সেই টিমে প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক খন্ডকালীন নিয়োগ পাওয়া মনিটরিং অফিসার রাশেদ ইসলাম ও অসীম চক্রবর্তী এবং হিসাবরক্ষক খোকন চন্দ্র সূত্রধরসহ চার জনের নাম রয়েছে। তারা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফর করবেন। কিন্তু প্রকল্পে কর্মরত বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালকদের নাম নেই। রূপালী ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ করতে হলে অবশ্যই সরকারি চাকরিজীবী হতে হবে বলে বলা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবকৃত কর্মচারীরা শুধু সরকারি চাকরিজীবী নন; তাই নয়, তাদের সরকারি পাসপোর্ট নেই। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চাকরি শেষ হয়ে যাবে। উন্নয়ন শাখার কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে তারা উন্নত দুটি দেশ ভ্রমণ শেষে আর দেশে ফিরবেন কিনা সে নিশ্চিয়তা কে দেবে? যে কোনো একটি দেশে তারা থেকে যেতে পারেন। কারণ আগামী তিন মাস পরে তাদের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। অন্য আরেকটি টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন ওই মন্ত্রণালয়ের সচিব। তার নেতৃত্বে অন্য টিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করবেন।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন তার দপ্তরে যায়যায়দিনকে বলেন, 'অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফরের জন্য একটি প্রস্তাব আমার কাছে এসেছে। সেখানে কে কে আছে এখনও দেখা হয়নি। সেই তালিকা দেখে যাচাই-বাছাই করেই সরকারি অর্ডার (জিও) করা হবে।'

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক উপবৃত্তি প্রকল্পের (তৃতীয় পর্যায়) শেষ সময় এসে অর্থ খরচ করে বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই সফরে কর্মকর্তা কী শেখবেন এবং কোথায় কাজে লাগাবেন তা বলা হয়নি। কারণ প্রকল্পের শেষ সময় এসে এ ধরনের বিদেশ সফর মানে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা এক কথায় প্রমোদ ভ্রমণ বলা যায়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এ ভ্রমণের মূল উদ্যোক্তা। ডিপিপি'র (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) শর্ত লঙ্ঘন করে চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের বিদেশ সফরের প্রস্তাব করেছেন পিডি নিজেই।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে