logo
রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

ছাত্রলীগের নেতৃত্বে জয়-লেখক পদ হারালেন শোভন-রাব্বানী

আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন ২০ ও ২১ ডিসেম্বর: নির্বাহী সংসদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত

ছাত্রলীগের নেতৃত্বে জয়-লেখক পদ হারালেন শোভন-রাব্বানী
 


অবশেষে পদ হারালেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তাদের স্থলে আল নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। জয় ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি ও লেখক জৈষ্ঠ্য যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সংগঠনটির আগামী সম্মেলন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন তারা।


শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এসব তথ্য জানান। তাছাড়া আগামী ২১ ও ২২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি। 


গণভবনের একটি সূত্র বলছে, শনিবার রাতে পদত্যাগ করেন শোভন-রাব্বানী। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দেন তারা। নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শুধুমাত্র আগামী সম্মেলনের আয়োজন করবেন। কোনো জেলা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি দিতে পারবেন না।


জানা গেছে, গত ৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় ছাত্রলীগ নিয়ে কথা উঠলে কমিটি ভেঙে দেয়ার কথা বলেন শেখ হাসিনা। এরপর বিভিন্ন মহলে শোভন-রাব্বানীকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে উপাচার্যের কাছে চাঁদা দাবি কারা, সময়মতো প্রোগ্রামে উপস্থিত না হওয়া, দেরিতে ঘুম থেকে উঠা, আওয়ামী লীগের নেতাদের অবমূল্যায়নসহ নানা অভিযোগ আসে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের এই দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। 


এর আগে গত বছরের ১১ ও ১২ মে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ছাত্রলীগের দুই দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন হয়। ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। নানা নাটকীয়তার পর গত  ১৩ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগ। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মুখে পড়েন শীর্ষ নেতৃত্ব। একাধিক স্থানে সংঘর্ষও হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় লাগাতার আন্দোলন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৯৯ জনই বিতর্কি-অযোগ্য দেখিয়ে তালিকা প্রকাশ করে সংগঠনেরই কিছু নেতাকর্মী। তাদের অভিযোগ অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।


এর প্রেক্ষিতে গত ১৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের অন্তর্ভুক্ত করে ছাত্রলীগের কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও শোভন-রাব্বানী ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ ও বিতর্কের সমাধান করতে পারেনি।


তাছাড়া ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে অযোগ্যতা ও অদক্ষতার প্রমাণসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা রিপোর্ট আকারে শেখ হাসিনার কাছে জমা দিয়েছেন। এরমধ্যে বিরোধী মতাদর্শীদের অর্থের বিনিময়ে সংগঠনে অনুপ্রবেশ ঘটানো, স্বেচ্ছাচারিতা, দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের অগ্রাহ্য করা, মাদকসেবন, টেন্ডার, চাঁদাবাজি, তদবিরসহ ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন করা উল্লেখযোগ্য।


মূলত এসব অভিযোগসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ায় সম্প্রতি ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার উপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাছাড়া প্রায় দেড় বছর সময়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করতে পারেননি তারা। 


আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন ২০ ও ২১ ডিসেম্বর:


শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের শুরুতে দলের জাতীয় সম্মেলন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সভা শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সভায় ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের উদ্বোধন হবে। 


এর আগে ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের শোকজ-পরবর্তী করণীয় এবং মদদদাতাদের শাস্তি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম করপোরেশনের আগামী নির্বাচন, রংপুর ৩ আসনের উপ-নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন পালনসহ দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। 


আ’লীগের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হবে: শেখ হাসিনা


বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সবাইকে দায়িত্ব¡শীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিটি কর্মীকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের যে আস্থা এবং বিশ্বাস তৈরি হয়েছে তা ধরে রাখতে হবে।


তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা বিরোধী দলে থাকলেও দেশের উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা। শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। 


শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের দল তাই দেশ ও জাতির কল্যাণে সব সময়ই সংগঠনটি নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এক দশকে বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। এখন বাংলাদেশ নিয়ে সারা বিশ্বের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে।


এগিয়ে যাওয়ার পথে নানা বাধা আসে বলে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো রয়েছেই, মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগও রয়েছে। দেশে জঙ্গিবাদ, অগ্নিসন্ত্রাস করার অপচেষ্টা হয়েছিল, সরকার তা কঠোর হাতে দমন করেছে। আগামীতেও এই মনোভাব অব্যাহত থাকবে। একইভাবে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। 


সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাহারা খাতুন, আব্দুর রাজ্জাক, কর্ণেল (অব.) ফারুক খান, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এ কে এম এনামুল হক শামীম, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, দফতর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনসহ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। 


 


কে এই জয় ও লেখক?


ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন আল-নাহিয়ান খান জয়। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ১ নম্বর সহ-সভাপতি ছিলেন।


জানা যায়, নাহিয়ান খান জয় বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আলী খানের ছেলে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাবার হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন তিনি। বরিশাল জিলা স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেয়া জয় উপজেলা ছাত্রলীগেও সম্পৃক্ত ছিলেন। একপর্যায়ে ঢাকায় লেখাপড়া করার সুবাদে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অবস্থান করে নেন তিনি। এসএসসি পাস করে ঢাকা কমার্স কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন জয়। তার দক্ষ নেতৃত্বের কারণেই এই কলেজে ছাত্রলীগের কার্যক্রম অনেকটা এগিয়ে যায়।


এদিকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন আল নাহিয়ান খান জয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগের উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপরই তার ডাক আসে কেন্দ্রীয় কমিটিতে। সোহাগ-জাকির কমিটিতে আইনবিষয়ক সম্পাদক পদে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেন জয়।


ছোটবেলা থেকেই মেধাবী জয় ঢাবির ভর্তি পরীক্ষার মেধা তালিকায় ১৬তম স্থান লাভ করেছিলেন বলে জানা যায়। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।


সাহসিকতা নিয়ে হরতাল প্রতিরোধ এবং পিকেটারদের ককটেল বোমাসহ ধরিয়ে দেয়ায় ২০১৫ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) থেকে পুরস্কার লাভ করেছিলেন জয়। সঙ্গে সঙ্গেই সেই পুরস্কারের অর্থ বার্ন ইউনিটে পেট্রোলবোমায় দগ্ধ অসহায় মানুষের চিকিৎসার্থে দান করেছিলেন তিনি।


মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান জয়ের পূর্বপুরুষ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার বাবা আবদুল আলীম খানের হাতে উপজেলা ছাত্রলীগের পথচলা। এরপর উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ফুফু উপজেলা আওয়ামী মহিলা লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। 


ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া লেখক ভট্টাচার্য বর্তমান কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার বাড়ি যশোরে। তিনি জেলার মণিরামপুর উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের বাহিরঘরিয়া গ্রামের দেবাশীষ ভট্টাচার্যের ছেলে, ওই এলাকার সাংসদ ও গণপূর্তমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের ভাতিজা। 


লেখক ভট্টাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্র। এখন স্নাতকোত্তর করছেন তিনি। এর আগে লেখক ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও জগন্নাথ হল শাখার বিগত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে