logo
রোববার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

  ফয়সাল খান   ২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০  

ঢাকার কর্তৃত্ব হাতছাড়া করতে চায় না আ'লীগ

যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ দুই সিটির মেয়র পদে আলোচনায় ৭ জন

ঢাকার কর্তৃত্ব হাতছাড়া করতে চায় না আ'লীগ
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের মেয়াদ এখনো শেষ না হলেও এরইমধ্যে আগামী নির্বাচন ও এর প্রার্থিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়ে উঠেছে। নির্ধারিত সময় এ দুই সিটিতে নির্বাচন হবে কিনা, বর্তমান মেয়র-কাউন্সিলদের মধ্যে কারা ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাবেন তা আলোচনার মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে, এনিয়ে আওয়ামী লীগেও এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা চলছে। কেননা রাজনৈতিক কারণে ক্ষমতাসীন এ দলটি গতবারের মতো এবারও ঢাকার দুই সিটির মেয়রের পাশাপাশি বেশিরভাগ কাউন্সিলরের পদ নিজেদের দখলে রাখতে চাইছে। এ প্রেক্ষাপটে মেয়রের পাশাপাশি কাউন্সিলর প্রার্থী বাছাইয়ে দলের নীতি-নির্ধারকরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার মেয়র ও কাউন্সিলরদের বড় ভূমিকা থাকবে। ওই নির্বাচনের আগে ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে চায় দলটি। তাছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় আগামী নির্বাচনকে নিজেদের বাঁচা মরার লড়াই হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। সে নিরিখে ভেতরে ভেতরে নানা প্রস্তুতিও নিচ্ছে। সরকারের এ মেয়াদের শেষ দিকে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে বিএনপি ও তার মিত্ররা। তখন আন্দোলনের নামে বিএনপি যদি কোনো নাশকতা করার চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে প্রতিরোধ করার চিন্তা করছে ক্ষমতাসীন দল। সে লক্ষ্যে দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী প্রার্থীর সন্ধান করছে আওয়ামী লীগ।

সূত্রমতে, আগামী ২০২০-২১ সালকে মুজিববর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। পরের বছর উদযাপিত হবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই দুটি বড় জাতীয় উৎসবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সক্রিয় ভূমিকা চায় দলের নীতি-নির্ধারকরা। তাছাড়া রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিও নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক তৎপরতা চালাচ্ছে। তাই যোগ্যপ্রার্থী বাছাই করতে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে এবং দলীয়ভাবে জরিপ চালাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল। এর মাধ্যমে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকার কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়

আওয়ামী লীগ।

এ প্রসঙ্গে দলের নেতারা বলছেন, ঢাকার প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে জরিপ চলছে। জরিপে বর্তমান কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করছেন তৃণমূল নেতাকর্মী ও বাসিন্দারা। গত মেয়াদে যারা দলীয় মনোনয়নে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে মূল্যায়ন করেননি, এবার তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে না। যেসব প্রার্থী নিজের জনপ্রিয়তা দিয়ে জয় লাভ করতে পারবেন, তাদেরকে মনোনয়ন দেয়া হবে। মেয়র পদেও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর দেয়ার ব্যাপারে কাজ চলছে। রাজধানী ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই করা হবে।

সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, 'কয়েক মাস পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন। জোর করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিততে চান না। আমরা জনগণকে খুশি করে তাদের রায় মেনে নির্বাচিত হতে চাই। আপনারা কেউ যদি ভাবেন ক্ষমতায় আছি, জিতেই যাব, তা হলে ভুল করবেন।'

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছর ৬ মে শপথ গ্রহণ করেন দুই মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন। সে অনুযায়ী আগামী বছরের মে মাসে মেয়াদ শেষ হবে মেয়রদের। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিন আগে ভোট করতে হবে। এরমধ্যে আগামী বছরের ২ ফেব্রম্নয়ারি থেকে এসএসসি, ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। মার্চে থাকবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর কর্মসূচি। মে মাস থেকে শুরু হবে রমজান। সে হিসেবে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকেই।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বছরের শুরুতে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ভোট করতে একটি প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। প্রস্তাবটি শিগগিরই নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হতে পারে। গত ৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের ৪৭তম বৈঠকে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে শতভাগ কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাই বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েই আগেভাগে জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাইয়ে মাঠে নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। মেয়র পদের পাশাপাশি কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী বাছাইকে বেশ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

দলের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, মেয়র পদে প্রার্থী পরিবর্তনের তেমন সম্ভাবনা না থাকলেও দলের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা মনোনয়ন পেতে জোর তৎপতরতা চালাচ্ছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলামের পুনরায় মনোনয়ন পাওয়া প্রায় নিশ্চিত। চলতি বছরের ৭ ফেব্রম্নয়ারির উপনির্বাচনে জয় লাভ করে এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস। সে হিসেবে তাকে আবারও মনোনয়ন দেয়ার চিন্তা করছে ক্ষমতাসীন দল। এর বাইরে দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের নামও শোনা যাচ্ছে। তাছাড়া দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হক গ্রম্নপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদম তমিজী হক।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০১৫ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে সাঈদ খোকন। ডেঙ্গুসহ বেশকিছু বিষয়ে সমালোচনা ও বিতর্কে জড়ালেও এ মুহূর্তে তাকেই দলের জন্য যোগ্য প্রার্থী ধরা হচ্ছে। তবে তার চেয়ে যোগ্য ও জনপ্রিয় কাউকে পাওয়া গেলে এ পদে প্রার্থী পরিবর্তন করতে পারে আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে সাবেকমন্ত্রী ও অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাবেক সাংসদ, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের নাম শোনা যাচ্ছে।

দুই সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য এসব প্রার্থীদের মধ্যে আদম তমিজী হক ছাড়া অন্য কেউই আনুষ্ঠানিক কোনো প্রচারণা চালাননি। দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি হাইকমান্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তারা। অন্যদিকে আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামেন তমিজী হক। মানবিক ঢাকা নামের একটি সংগঠনের মাধ্যমে নগরীর নানা সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, জাতীয় শোক দিবসসহ সাংগঠনিক কার্যক্রমেও বেশ তৎপর রয়েছেন। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে নৌকার পক্ষে বিভিন্ন রোড শো করে দলের হাই কমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এর প্রায় ৪ বছর পর ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল দুই সিটিতে নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই মেয়রপ্রার্থী আনিসুল হক ও মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বিজয়ী হন। এরপর ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর মারা যান ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হক। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রম্নয়ারি ঢাকা উত্তর সিটির উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে মেয়র পদে বিজয়ী হন ব্যবসায়ী নেতা মো. আতিকুল ইসলাম। ৭ মার্চ শপথ নেন তিনি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে