logo
রোববার ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০  

কুরসির দৌড়ে ৬ জন

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের পদত্যাগের ঘোষণা

থেরেসা মে পদত্যাগের ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বরিস জনসন, সাজিদ জাভিদ, জেরেমি হান্ট, ডোমেনিকান রব, মাইকেল গভ ও আন্দ্রে লিডসাম

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের পদত্যাগের ঘোষণা
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে শুক্রবার লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে অশ্রম্নসজল চোখে কনজারভেটিব পার্টির শীর্ষ পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন -ডেইলি মেইল
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্ব থেকে আগামী ৭ জুন পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন কারও আসার পথ সুযোগ হলো। শুক্রবার বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

শুক্রবার ডাউনিং স্ট্রিটে এক আবেগময় বক্তৃতায় মে বলেন, '২০১৬ সালের ইউপোরিয়ান ইউনিয়নের গণভোটের ফলের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখানোর চেষ্টা করেছি।'

মে বলেন, খুবই দুঃখজনক ঘটনা যে তিনি ব্রেক্সিট কার্যকর করতে পারেননি। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী যিনি হবেন, তিনি দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থে কাজ করবেন বলে আশা করেন তিনি।

থেরেসা মে বলেন, কনজারভেটিভ পার্টিতে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন তিনি। টরি দল থেকে ৭ জুন পদত্যাগের পর নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

মে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'শিগগিরই চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি এবং আমার জীবনে এটি বড় সম্মানের বিষয়।'

৪৬ বছর ধরে ইইউ সদস্য বৃটেন। ইইউ ছাড়তে প্রায় তিন বছর আগে এ নিয়ে দেশটিতে গণভোট হয়। ওই সময় ব্রেক্সিটের পক্ষে ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। বিপক্ষে পড়েছিল ৪৮ শতাংশ ভোট।

ব্রেক্সিট চুক্তির ওপর তৃতীয় দফা ভোটের আগে থেরেসা মে ঘোষণা দিয়েছিলেন, চুক্তি পাস হলে তিনি পদত্যাগ করবেন। কিন্তু এরপরও চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন আইনপ্রণেতারা।

থেরেসা মে ১৯৫৬ সালের ১ অক্টোবর ইংল্যান্ডের সাসেক্সের ইস্টবোর্নে জন্মগ্রহণ করেন। মার্গারেট থ্যাচারের পর দ্বিতীয় নারী হিসেবে প্রায় তিন বছর ব্রিটেনের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন থেরেসা মে। জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বিচ্ছেদের (ব্রেক্সিট) বিষয়ে গণভোট হয়। এতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউতে থাকার পক্ষে ছিলেন। জনগণ বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দিলে ক্যামেরন পরাজয় মেনে পদত্যাগ করেন। ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে কনজারভেটিভ পার্টির ঝানু রাজনীতিক থেরেসা মেকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন।

থেরেসা মে গণভোটে ইইউতে থাকার পক্ষেই প্রচার চালিয়ে ছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বলেন, 'ইইউ থেকে বিচ্ছেদ মানে বিচ্ছেদ। বৃটেন কোনোভাবেই ইইউর সদস্য থাকবে না এবং সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত করেই বৃটেন ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ করবে।' দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি এমন এক সরকার গড়ার অঙ্গীকার করেন, যে সরকার সব মানুষের জন্য কাজ করবে, শুধু সুবিধাভোগী কিছু মানুষের জন্য নয়।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া পার্লামেন্টের মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত থাকলেও ২০১৭ সালের এপ্রিলে হঠাৎ করেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। ওই সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলে থেরেসা মের কনজারভেটিভ পার্টি শীর্ষে থাকলেও পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। বৃটেনে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য ৬৫০ আসনের পার্লামেন্টে প্রয়োজন হয় ৩২৬ আসন। কনজারভেটিভ পার্টি তা থেকে ৮টি কম আসন নিয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে অবস্থান ধরে রাখে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের রক্ষণশীল পার্টি ডিইউপি পার্লামেন্টে ১০টি আসন পায়। পরে ডিইউপির সঙ্গে সমঝোতা করে সরকার গঠনের ঘোষণা দেয় কনজারভেটিভ পার্টি।

অল্প বয়স থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন থেরেসা মে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ফিন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত লন্ডন বারো অব মর্টনে কাউন্সিলর হন। ১৯৯৭ সালে সাধারণ নির্বাচনে পশ্চিম লন্ডনের মেইডেনহেডের পক্ষে তিনিই প্রথম নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) ছিলেন। ১৯৯৯ সাল থকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের ছায়া কেবিনেটের সদস্য ছিলেন থেরেসা। ২০০২ সালে কনজারভেটিভ পার্টির প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২০১০ সালে পান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ছয় বছর ধরে তিনি ডেভিড ক্যামেরনের মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য

তালিকায় যাদের নাম

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে পদত্যাগের ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সাজিদ জাভিদ ছাড়াও বিশেষভাবে এগিয়ে রয়েছেন বরিস জনসন, জেরেমি হান্ট, ডোমেনিকান রব, মাইকেল গভ ও আন্দ্রে লিডসাম।

বরিস জনসন: লন্ডনের সাবেক মেয়র বরিস জনসন নিশ্চিত করেছেন, লড়াইয়ের দৌড়ে তিনি থাকছেন, যা ওয়েস্টমিনিস্টারের অল্প কয়েকজনকেই অবাক করেছে।

২০১৬ সালের ব্রেক্সিট প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। কিন্তু তখন শেষ মুহূর্তে এসে মাইকেল গভ সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে সরকারের শীর্ষ পদটি পেতে তিনি ব্যর্থ হন।

জনসনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তেরেসা মে। কিন্তু কূটনৈতিক হঠকারিতা ও ঠুনকো কারণে তিনি সমালোচনার মুখোমুখি হন।

গত জুলাইয়ে পদত্যাগের আগে ব্রেক্সিট ইসু্যতে তিনি অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন। কনজারভেটিভ দলের তৃণমূলে তিনি একজন ক্যারিশম্যাটিক ও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সাপ্তাহিক কলামের মাধ্যমে তিনি নিজের জনপ্রিয়তা ধারাকে ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন।

ব্রেক্সিটপন্থী প্রভাবশালী ব্যাকবেঞ্চার জ্যাকব রিইস-মগের সমর্থন থাকায় এবার তার আশান্বিত হওয়ার কারণ আছে। কিন্তু নিজের বাজে ব্যবহারের জন্য দলের ভেতরেই তার বহু শত্রু তৈরি হয়ে গেছে।

গত সেপ্টেম্বরে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। এখন নতুন এক বান্ধবীকে সঙ্গী করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে নিজের ওজন কমিয়েছেন এবং ছুলের ছাঁটও পরিবর্তন করেছেন।

সাজিদ জাভিদ: প্রথম ব্রিটিশ মুসলিম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদের। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে পদত্যাগের পর তিনি নতুন করে আলোচনায় এসেছেন।

সাজিদ জাভিদ যদি তেরেসা মে'র স্থলাভিষিক্ত হন, তবে তিনিই হবেন দেশটির প্রথম কোনো মুসলমান প্রধানমন্ত্রী।

বৃটেনের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম গার্ডিয়ান ও ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির মতো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় তার নাম এসেছে।

২০১৮ সালের এপ্রিলে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক এ বিনিয়োগ ব্যাংকার। ক্যারিবীয় অভিবাসী শিশুদের ওপর একটি কেলেঙ্কারি ভালোভাবে সামাল দিয়ে ৪৯ বছর বয়সী এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবার প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

এএফপির প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়, পাকিস্তানি অভিবাসী বাসচালকের সন্তান সাজিদ জাভিদ একটি আধুনিক, বহু-সংস্কৃতি ও মেধাভিত্তিক ব্রিটেনের প্রতিচ্ছবি।

অর্থনৈতিকভাবে উদারপন্থী সাজিদ জাভিদ ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন।

তবে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসে যোগ দিতে যাওয়া এক কিশোরীর নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তিনি উদারপন্থীদের সমালোচনার শিকার হয়েছেন।

জেরেমি হান্ট: ২০১৬ সালের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে নিজের সমর্থন জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট। কিন্তু ব্রাসেলসের নেয়া পদক্ষেপগুলোকে ঔদ্বত্যপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।

সাবেক এই ব্যবসায়ী অনবরত জাপানি ভাষায় কথা বলতে পারেন। তিনি স্থিতিশীল রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত।

গত বছরে জনসনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জেরেমি হান্ট। কথা ও আচরণেও পরিমিতবোধ সম্পন্ন। শান্ত মেজাজের হান্ট ব্রিটিশ মন্ত্রিপরিষদে আস্তে আস্তে নিজের প্রভাব আরও মজবুত করেছেন।

তেরেসা মে'র পদত্যাগের পর নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার ঘোষণা দেন হান্ট।

ডমিনিক রব: কারাতে প্রতিযোগিতায় বস্ন্যাক বেল্ট পাওয়া ডমিনিক রব ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবের বিরোধী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামরনের অধীন ২০১৫ সালে সরকারে যোগ দেয়ার পর নিজের মন্ত্রিত্বের সিঁড়ি দ্রম্নতই অতিক্রম করেছেন ডমিনিক।

তিনি ব্রেক্সিটের সমর্থক এবং ২০১৬ সালে গণভোটের পর নতুন মন্ত্রিসভায় বিচারমন্ত্রী হন।

পরে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ব্রেক্সিট সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।

কিন্তু সরকারের বাইরে থাকলেও নিজের প্রচারমুখী অবস্থান এখনো বজায় রেখেছেন। কর্মীদের ভাড়া করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

মাইকেল গভ: বেক্সিট প্রচারক মাইকেল গভ ২০১৬ সালের নেতৃত্বের লড়াইয়ে প্রাথমিকভাবে জনসনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা জানিয়েছেন তিনি। এতে দুজনই তেরেসা মে'র কাছে হেরে যান।

এ প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হওয়ার পর তিনি বলে, ক্যারিশমা বলতে যা বোঝায়, তা আমার নেই।

২০১৭ সালের জুনে তিনি পরিবেশমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি ঘোষণার কারণে বিভিন্ন সময়ে তিনি পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন।

তেরেসা মে'র পতনের পর ইউরোপবিরোধী ৫১ বছর বয়সী গভও তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথা ভাবছেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে