logo
সোমবার ২৪ জুন, ২০১৯, ১০ আষাঢ় ১৪২৬

  সাখাওয়াত হোসেন   ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০  

ধর্ষণের হিড়িকে সরকারে উদ্বেগ

চলতি মে মাসের প্রথম ৮ দিনে ৪৩ জন ধর্ষণের রেকর্ড জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১৭৭ জন ধর্ষণের শিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন দেশের প্রতি থানায় আলাদা সেল গঠনের উদ্যোগ

ধর্ষণের হিড়িকে সরকারে উদ্বেগ
নিত্যনতুন ভয়াবহতা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই এক বা একাধিক ধর্ষণের ঘটনা শিশু-কিশোরী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সি নারী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে নানামুখী ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বিগ্ন অনেকেই পরিবারের নারী সদস্যদের শিক্ষাসহ অন্যান্য কর্মতৎপরতা সংকুচিত করে এনেছেন। এমনকি অনেকে বাড়ির পাশে কিংবা নিজ ঘরে পুরুষ শিক্ষক রেখে কন্যা সন্তানদের পড়াতে ভয় পাচ্ছেন। কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনে যৌন সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার আতঙ্কে নৈশকালীন কর্মজীবী নারীরা অনেকেই স্বেচ্ছায় এ ধরনের কর্মস্থল থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। এতে দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কঠোর ভূমিকা পালনের উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশেষ করে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি অফিস ও শিল্প-কারখানায় ধর্ষণ-যৌন হয়রানির ঘটনা যাতে দ্রম্নত কমিয়ে আনা যায় এজন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। পাশাপাশি সর্বস্তরের যৌন সন্ত্রাস ঠেকাতে দেশের প্রতি থানায় আলাদা সেল গঠন, ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট আইনের সীমাবদ্ধতা দূর, এ-সংক্রান্ত বিচার ত্বরান্বিত এবং সাক্ষী ও ভিকটিমের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বাস্তবমুখী নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

প্রশাসনের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, মাদক সন্ত্রাসের মতো যৌন সন্ত্রাসও এখন সরকারের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা সম্প্রতি নারী-শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও গণধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ঘটনার যে হিড়িক পড়েছে তা দ্রম্নত সামাল দেয়া না গেলে এ পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারের নীতি-নির্ধারক মহল থেকে এ ব্যাপারে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ তৎপর ও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এদিকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এরই মধ্যে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন করতে নির্দেশনা জারি করেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং এর আওতাধীন অফিস ও দেশের সব সরকারি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন

করতে বলা হয়। যা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এ পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সরকারের নীতি-নির্ধারকমহল থেকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে তাগিদ দেয়া হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পর্নোগ্রাফি বন্ধের সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা দূর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সজাগ থাকার সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি ইমান আলী ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের এক রায়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে দেশের প্রতিটি থানায় আলাদা সেল গঠন করার নির্দেশ দেয় তা দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়িত না হলেও এ বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সেল গঠনের বিষয়টি কীভাবে দ্রম্নত বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে এরই মধ্যে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, চলতি মে মাসের প্রথম আট দিনে রাজধানীসহ সারা দেশে ৪১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের শিকার শিশুদের মধ্যে তিন শিশু মারা গেছে। এসব শিশুর মধ্যে মেয়ে শিশু ৩৭ জন এবং ছেলে শিশু চারজন। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও তিন শিশু। দেশের ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে 'মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন' নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন এ তথ্য জানিয়েছে।

দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এ সংগঠনটি এ ব্যাপারে প্রতিরোধমূলক কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম বলেন, 'আমাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত। যারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছেন তাদের আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, সবাইকেই এ নিয়ে আরও বেশি কথা বলতে হবে।'

এদিকে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট 'আমরাই পারি' পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তৈরি জরিপ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে সারাদেশে ১৭৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৮৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি।

সম্প্রতি ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার জন্য অপরাধ বিশেষজ্ঞরা আইনি দুর্বলতা, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতাকে প্রধানভাবে দায়ী করেছেন। তাদের ভাষ্য, এ গন্ডি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে ভিন্ন কোনো কৌশলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা কঠিন হবে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন, ফৌজদারি দন্ডবিধি ও নারী শিশু নির্যাতন দমন আইন আদালতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। কিন্তু এসব আইনের আরও আধুনিকায়ন ও কিছু কিছু দিক সংশোধনীর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বিচারহীনতা নারী ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উলেস্নখ করেন। ব্র্যাকের একটি গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে সালমা আলী বলেন, ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৯ শতাংশ ধর্ষণ মামলার আসামিদের কোনো শাস্তি হয় না। এ কারণে নারীরা ধর্ষিত হওয়ার পর মামলা করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখান না। তেমনি পুলিশও এ ধরনের মামলা নিতে চায় না। আবার মামলা হওয়ার পর 'নারীবান্ধব' তদন্ত না হওয়ারও নজির রয়েছে। আসামিদের সঙ্গে পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের যোগসাজশ থাকলে ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

আইনজীবী সালমা আলী বলেন, ধর্ষণ মামলার আলামত ও প্রমাণ দ্রম্নত নষ্ট হয়ে যায়। তদন্তকারীরা সেগুলো যথাযথ সংরক্ষণ করেন না। ভিকটিম ও সাক্ষী সুরক্ষার অভাবে অনেকে সাক্ষ্য দিতে আদালতে যান না। ফলে আসামিরা সহজে পার পেয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলার তদন্ত আরও আধুনিক ও দ্রম্নত করা প্রয়োজন। ফরেনসিক আলামতগুলো রক্ষায় জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পুলিশের আলাদা ইউনিট গঠন করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

আইনের সংস্কার সম্পর্কে অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে একটি দ্রম্নত বিচার ট্রাইবু্যনাল স্থাপন, সাক্ষ্য গ্রহণের স্বচ্ছতা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রত্যেক থানায় একজন করে নারী সহায়ক নারী কর্মকর্তা দেয়া জরুরি। পাশাপাশি নারী পুলিশ সংখ্যা বাড়ানো ও নারীবান্ধব তদন্তের কথা বলেন তিনি।

এদিকে ধর্ষণের মামলা চলাকালীন বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আইনের আশ্রয় নিতে অনীহা তৈরি করে বলে মনে করেন শিশু অধিকার কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, জামিন অযোগ্য অপরাধ হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে জামিন পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা। ফলে ধর্ষণের ঘটনার লাগাম টেনে ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, 'অপরাধ করে সহজে জামিন পাওয়া গেলে হয়তো অপরাধের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তবে অপরাধী জামিন পাবে না- আইনজীবী হিসেবে তো সেটা বলা যায় না। সুতরাং শিশু ধর্ষণের ব্যাপারে যদি আলাদা সেল করা হয়, মামলার গতি তদারকি করা হয়, তাহলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটা কমতে পারে।' তিনি মনে করেন, এ ধরনের মামলার বিচারের দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে উদ্যোগ নেয়া দরকার।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আরও বলেন, শিশু ধর্ষণের ঘটনার ক্ষেত্রে আইন সংশোধন করা যেতে পারে, যেখানে শিশু ভিকটিমকে আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে হবে না। 'আইন সংশোধন করা যেতে পারে এভাবে যে, এক্সপার্টদের কাছে ভিকটিমকে নেয়া হবে। এরপর তারা রিপোর্ট দেবে। এরপর আর কোনো প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হবে না। ওই চিকিৎসকদের রিপোর্টের ভিত্তিতে চার্জশিট দেবে পুলিশ। চিকিৎসকদের সাথে মানবাধিকার কর্মীও থাকতে পারেন।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে