logo
সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

  নূর মোহাম্মদ   ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০  

রাজনৈতিক এপিএসদের পদমর্যাদা এক লাফে তিন ধাপ বাড়ছে

রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া এপিএসরা বর্তমানে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা বা ৯ম গ্রেডের বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন। ৩টি গ্রেড বাড়িয়ে সেটি ৬ষ্ঠ গ্রেডে করা হলে তাদের মূল বেতন বাড়বে ১৩,৫০০ টাকা।

রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিবদের (এপিএস) পদমর্যাদা বাড়ছে। নবম গ্রেড (ধাপ) থেকে ৩টি গ্রেড বাড়িয়ে তাদের পদমর্যাদা ৬ষ্ঠ গ্রেডে উত্তীর্ণ করা হচ্ছে। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে যারা এপিএস নিয়োগ পেয়েছেন তারা স্বপদ বা গ্রেডেই থাকছেন। এপিএসদের গ্রেড বাড়ানোর জন্য মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা আধা সরকারিপত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্যমতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া এপিএসরা বর্তমানে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা বা ৯ম গ্রেডের বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন। ৩টি গ্রেড বাড়িয়ে সেটি ৬ষ্ঠ গ্রেডে করা হলে তাদের মূল বেতন বাড়বে ১৩,৫০০ টাকা। এর সঙ্গে আরও ৫০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া যোগ হবে। অন্যান্য আরও ভাতা মূল বেতনের সঙ্গে যোগ হবে।

জানা গেছে, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা এপ্রিল ও চলতি মাসে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীকে ডিও লেটার দিয়েছেন। সেখানে এপিএসদের বেতন ভাতা বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন। এরমধ্যে অন্যতম বর্তমানে এপিএসরা ৯ম গ্রেডে ২২,০০০-৫৩০৬০ হাজার টাকা বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন। অথচ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে বলা আছে, 'এপিএসদের পদমর্যাদা হবে সিনিয়র সহকারী সচিব অথবা সহকারী সচিব। ডিও লেটারে আরও বলা হয়েছে, মন্ত্রীর অভিপ্রায় হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এপিএসদের কোনো অফিসিয়াল সময় নেই। তারা সবসময় মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর কাজে নিয়োজিত থাকলেও তাদের কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা সম্মানি দেয়া হয় না। এজন্য তাদের ৬ষ্ঠ গ্রেড বা পদ মর্যাদা দেয়ার সুপারিশ করছি।'

বিষয়টি নিশ্চিত করে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, 'অনেক সহকর্মীর ডিও লেটার পেয়েছি। এটা বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন আছে। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে এপিএসরা ৯ম গ্রেডে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছেন। এটা পরিবর্তন করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন। তবে আমরা পজিটিভ।'

এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) শেখ ইউসুফ হারুন যায়যায়দিনকে বলেন, 'আমি এটাকে পজিটিভভাবেই দেখি। কারণ সহকারী সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব পদ মর্যাদা প্রায় একই। শুধু আর্থিক বিষয় ছাড়া। দু'জনকে একই ডেস্কে কাজ করতে হয়। এজন্য সরকার চাইলে এটা সম্ভব।'

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, ৬ষ্ঠ গ্রেডের বেতন মর্যাদা পেলে এপিএসরা ৩৫,৫০০-৬৭,০১০ টাকা বেতন ভাতা পাবেন। নতুন করে ১৩,৫০০ টাকা বেশি পাবেন। এর সঙ্গে অন্যান্য আরও বেশ কয়েকটি সুযোগ-সুবিধা ও ভাতার পরিমাণও বেড়ে যাবে।

একাধিক এপিএসের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, মন্ত্রীর এপিএস হিসেবে তাদের উচ্চ পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের প্রটোকল মানতে হয়। এক্ষেত্রে গ্রেডের বিষয় সামনে চলে আসে। এজন্য তারাও চান তাদের গ্রেডের পরিবর্তন। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বেতন ভাতা বৃদ্ধি ফলে এপিএসদের মধ্যে দুর্নীতি অনিয়ম করার প্রবণতা কমে আসবে। এছাড়াও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী এপিএসদের চাকরি থাকে। চাকরি শেষে তারা সরকারি সুযোগ সুবিধা বলতে কিছুই পান না।

কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সরকার তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতা আসার পর পিএস, এপিএস নিয়োগে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। মন্ত্রীরা তাদের পছন্দ মতো এপিএস নিতে পারলেও একান্ত সচিব (পিএস) নিয়োগে বিধি নিষেধ আসে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো তালিকা থেকে প্রত্যেক মন্ত্রীর পিএস নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। তবে অন্যান্য বারের মতো এবারও রাজনৈতিক বিবেচনায় এপিএস নিতে পেরেছেন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা।

জানা গেছে, গত ফেব্রম্নয়ারি মাসে মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর এপিএসদের নিয়ে একটি কর্মশালা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেখানে এপিএসদের কী কাজ সেটি বুঝানো হয়। সেই কর্মশালায় এপিএসদের পদমর্যাদার বিষয়টি সামনে আনেন দুইজন অতিরিক্ত সচিব। কর্মশালার আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, একজন মন্ত্রী ইচ্ছা করলেই একজন সিনিয়র সহকারী সচিব বা ৬ষ্ঠ গ্রেডের পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তা নিতে পারেন। সেখানে সিভিল বা রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া একজন এপিএস একই পদমর্যাদার হয়ে ৯ম গ্রেডে বেতন ভাতা পান। এটি বৈষম্য। মন্ত্রীরা চাইলে এটি কমানো সম্ভব। তারা এপিএসদের পদমর্যাদা বাড়ানোর জন্য স্ব স্ব মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের কাছ থেকে ডিও লেটার জমা দেয়ার পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া এপিএসরা মন্ত্রীর অফিসিয়াল প্যাডে ডিও লেটার জমা দিয়েছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ শাখার কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর এপিএসদের পদ মর্যাদা বাড়ানোর জন্য ডিও লেটার জমা দিয়েছেন। আরও আসবে বলে তাদের জানানো হয়েছে। সবগুলো একসঙ্গে করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। কারণ এটা বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থের ব্যাপার আছে। বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতির পর সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে।

তবে এপিএসদের নিয়ে নানা সময় নানা বিতর্ক আছে। কখনও তারা মন্ত্রীদের চেয়ে বেশি ক্ষমতাসীন হয়ে উঠেন এমন নজিরও আছে। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সাবেক এপিএস ফারুক ৭০ লাখ টাকাসহ ধরা পড়েন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সাবেক এপিএস মন্মন রঞ্জন বাড়ৈ বদলি, পদায়ণসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে সরানো হয়। তৃতীয় দফা আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আসার পর নুরুল ইসলাম নাহিদ মন্ত্রিসভা থেকে ছিটকে পড়ার পর সেই এপিএস পাড়ি জমিয়েছেন আমেরিকায়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এপিএসদের দুর্নীতির লাগাম টানতে গত বছর ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে বেশ কয়েকটি সুপারিশ পাঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেখানে মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম দুর্নীতি, বদলি, পদায়ণ বন্ধ করতে রাজনৈতিকভাবে এপিএস নিয়োগ প্রথা বন্ধের সুপারিশ করা হয়। দুদকের সুপারিশে মধ্যে ছিল, দুর্নীতির অন্যতম উৎস এপিএসরা। তারা কখনও মন্ত্রীদের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৭০-৮০ ভাগ দুর্নীতি উৎস তারা। মন্ত্রীদের নাম ভাঙ্গিয়ে নানা অপকর্ম করে থাকেন এপিএসরা। মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের রাজনৈতিক বিষয়াদি দেখাভাল করার জন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় এপিএস নিয়োগ দেয়া হলেও এখন কিছু মন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে এপিএস নেন। তবে এ সংখ্যা খুবই কম।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে