logo
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৬

  জাহিদ হাসান   ১১ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

করোনা রোগীর বর্জ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

করোনা রোগীর বর্জ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
যত্রযত্র পড়ে থাকে বর্জ্য -যাযাদি
করোনা আক্রান্ত বেশিরভাগ ব্যক্তি বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তারা ঘরের মধ্যে আইসোলেশন মানলেও তার ব্যবহৃত টিসু্য, রুমাল, মাস্ক, গগলস, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রীর বর্জ্য আলাদা করার কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। শুধু বাসা-বাড়িতে নয়, বিভাগীয় পর্যায়ে হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতাল ছাড়া জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর ব্যবহৃত বর্জ্যের জন্য নেই আলাদা ব্যবস্থা। এতে বাসা-বাড়ি ও হাসপাতালে নন-কোভিড রোগীর এসব বর্জ্য থেকে অন্যরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগী ও দেশের কয়েকটি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে চিকিৎসাধীন রোগীরা সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মানছেন না। তাদের ব্যবহৃত সুরক্ষা সরঞ্জাম আলাদা ব্যবস্থায় সংগ্রহ করতে পারছে না সিটি করপোরেশনগুলো। সাধারণ গৃহস্থলী বর্জ্যের সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির বর্জ্য একত্রে ফেলায় তা থেকে সুস্থ মানুষের দেহে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহৃত বর্জ্যের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাড়িতে চিকিৎসাধীন একাধিক রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনা পজিটিভ ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের খাদ্য উচ্ছিষ্ট ছাড়াও ব্যবহৃত টিসু্য, রুমাল, মাস্ক, গগলস, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার শেষে সাধারণ গৃহস্থলী বর্জ্যের সঙ্গে একত্রে যত্রতত্র ফেলছেন। এতে গৃহস্থলী বর্জ্য সংগ্রহকারী ব্যক্তি ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।

বর্জ্যের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ ছড়ানো সম্পর্কে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, করোনাভাইরাস ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি এবং এক জনগোষ্ঠী থেকে অন্য জনগোষ্ঠীতে সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত রোগী ও তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির ব্যবহৃত ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম থেকে আরও বেশি সংক্রমিত হয়। অন্যদিকে রাজধানীর দুই সিটিতে প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার ২৫০ টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। করোনাকালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত সুরক্ষাসামগ্রী। এমন প্রেক্ষাপটে রাজধানীকেন্দ্রিক কিছু হাসপাতালে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকলেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও গৃহস্থলী বর্জ্যের তেমন ব্যবস্থাপনা নেই। তাই করোনা প্রতিরোধে লকডাউন বাস্তবায়ন করা সত্ত্বেও কোভিড-১৯ বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা না গেলে দেশে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও'র) সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ইএসডিও'র এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সারাদেশে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যবহৃত গস্নাভস, মাস্ক, স্যানিটাইজারের পাত্র এবং পলিথিন থেকে এক মাসে কমপক্ষে ১৪ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে উৎপাদিত করোনা বর্জ্য গৃহস্থলী বর্জ্যের সঙ্গে মিশ্রিত হচ্ছে। এ ছাড়া হাসপাতাল ও অন্যান্য ব্যক্তির ব্যবহৃত করোনাসামগ্রীর বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির পাশাপাশি পরিবেশ দূষিত করছে। তাই সংক্রমণের ঝুঁকি রোধে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।

গত ৯ জুন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে আইনি নোটিশ পাঠান। সেখানে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসার পর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। অন্যথায় তিনি কোর্টের দ্বারস্থ হবেন। এ ঘটনার পর পরিবেশ মন্ত্রণালয় একটি বৈঠক করে, পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক করোনা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠানো এবং দুই সিটি করপোরেশন নামকাওয়াস্তে কিছু উদ্যোগ ছাড়া তেমন পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যায়যায়দিনকে বলেন, এটা নিয়ে সিটি করপোরেশন কাজ করলেও নাগরিকদের কিছু দায়বদ্ধতা আছে, যেটা সরকার বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো করতে পারেনি। করোনা পরিস্থিতিতে এই ঘাটতি আরও বেশি স্পষ্ট হয়েছে। তাই সরকারের উচিত, বিভাগ থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত কাজ করা। এ জন্য কর্মকৌশল তৈরি করে সংশ্লিষ্টদের একটি কাঠামোয় নিয়ে আসা। আর নিয়ম লঙ্ঘন করলে জবাবদিহিতা ও শাস্তির ব্যবস্থা করা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এম সাইদুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, প্রাইমারি ওয়েস্ট কালেক্টর (পিডবিস্নউসি) ও বেসরকারি সংস্থা প্রিজম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে টোলারবাগের কোভিড-১৯ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হয়েছিল। এখন ব্যক্তিগত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পৃথক ক্যাম্পেইন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। যার অংশ হিসেবে পলিব্যাগ সরবরাহ, লিফলেট বিতরণ, নোটিশ প্রদান, মাইকিং এবং মসজিদে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসবের মাধ্যমে গৃহস্থলী ও কোভিড-১৯ বর্জ্য সংগ্রহ-সংরক্ষণে সচেতন করা হচ্ছে।

একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর মো. বদরুল আমিন যায়যায়দিনকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক আইনি নোটিশ সম্পর্কে তার জানা নেই। তবে লকডাউনকৃত ওয়ারী এলাকার সব বাড়িতে কোভিড-১৯ রোগীদের বর্জ্য সংরক্ষণে পলিথিনের ব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে। যেগুলো সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার সংগ্রহ করা হবে। এ ছাড়া অন্য ওয়ার্ডগুলোতে লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করাসহ একটি করে কনটেইনার রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা যায়যায়দিনকে আরও বলেন, দেশে করোনায় প্রথম তিন মাসের তুলনায় চতুর্থ মাসে এসে সংক্রমণ ও মৃতু্য দুটিই বেড়েছে। মোট রোগীর ৫৯ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে চতুর্থ মাসে। অন্যদিকে এমন পরিস্থিতিতে করোনা শনাক্তে কয়েকটি ল্যাব বাড়লেও নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা উভয়ই কমছে। ফলে শুধু নন-কোভিড রোগীই নয়, করোনা চিকিৎসায় নির্ধারিত হাসপাতালের শয্যা ফাঁকা থাকছে। যার অর্থ; অধিকাংশ করোনা রোগী বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের তথ্য অনুযায়ী, করোনা রোগীদের জন্য শয্যা রয়েছে ১৪ হাজার ৭৭৫টি। কিন্তু গত মঙ্গলবার এসব শয্যায় রোগী ভর্তি ছিলেন চার হাজার ২২১ জন। অর্থাৎ মোট শয্যার ৭১ দশমিক ৪৪ শতাংশ ফাঁকা থাকছে। এতে বোঝা যায়, করোনা পজিটিভ হয়েও রোগীরা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্যদিকে তাদের দ্বারা উৎপাদিত বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ছে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে