logo
শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৬

  ফয়সাল খান   ৩০ মে ২০২০, ০০:০০  

করোনায় মৃতের দাফন নিয়ে মানবিক সংকট

করোনাভাইরাসে জীবন-জীবিকার পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন নিয়ে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফন নিয়ে বিপাকে পড়ছেন স্বজনরা। পুলিশসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেও দাফনকার্যে বাধা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার নজিরও রয়েছে।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত সারাদেশে করোনাভাইরাসে ৪০ হাজার ৩২১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আর মারা গেছেন ৫৫৯ জন। প্রতিদিনই বাড়ছে এ রোগে আক্রান্ত ও মৃতু্যর সংখ্যা। এছাড়া করোনার উপসর্গ নিয়েও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাভাইরাস বা এমন উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মৃতু্যর পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লাশ দাফনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। জনমনে অহেতুক আতঙ্কের কারণে কোডিভ-১৯ ছাড়াও অন্যান্য রোগে মৃতু্যবরণকারীদের কবর দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনদের পড়তে হচ্ছে নানা জটিলতা ও বিড়ম্বনায়। মৃত ব্যক্তির প্রতি এমন নির্দয় আচরণ কারও কাম্য না হলেও প্রতিনিয়তই এমন ঘটনা ঘটছে। এ জন্য গুজব, অজ্ঞতা এবং ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব অনেকাংশ দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মসজিদের ইমাম ও সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এই পরিস্থিতিতে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফন নিয়ে জনমনে কোনো বিভ্রান্তি, গুজব বা শঙ্কা যাতে না ছড়ায় সে জন্য সঠিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মী, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকসহ সব মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ যায়যায়দিনকে বলেন, করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে সহায়তার জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আলেম-ওলামাদের নিয়ে আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। কোথাও লাশ দাফন নিয়ে সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন তারা। আগের তুলনায় এমন ঘটনা কমে আসছে উলেস্নখ করে তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আলেম-ওলামা, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সচেতন করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রামে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এগিয়ে এসেছে। হজ এজেন্সিগুলোর সংগঠন ঢাকায় লাশ দাফনের কাজ শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে তা বিস্তৃত করবেন। করোনা রোগীর লাশ দাফন নিয়ে আর কোনো সংকট হবে না বলে জানান তিনি।

আমাদের প্রতিনিধি, দেশের বিভিন্ন জেলায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও কেউ মারা গেলেই তাকে নিয়ে শুরু হয় গুজব এবং দাফন জটিলতা। অন্য রোগে মারা গেলেও করোনা সন্দেহে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে দাফন কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে। মৃত ব্যক্তির স্বজনদের শান্ত্বনা না দেওয়া তো দূরের কথা, তাদেরকে দেখলে সবাই দূরে সরে যাচ্ছেন। অনেকেই কথাও বলতে চাইছেন না। এমনকি মৃত ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ আসলেও কেউ তার পরিবারের সঙ্গে মিশতে চাচ্ছেন না। এতে করে যেকোনো রোগে মৃত ব্যক্তির পরিবার সামাজিকভাবে মারাত্মক হয়রানির মুখে পড়ছেন।

গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন লালমনিরহাটের মৌসুমী আখতার। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ২১ মে বাড়ি যাওয়ার জন্য ট্রাকে উঠেন তিনি। ওইদিন রাতে ট্রাকের মধ্যেই মারা যান ওই গার্মেন্টকর্মী। এরপর লাশসহ ট্রাকটি থানায় নেওয়া হয়। পরিচয় জেনে ময়নাতদন্তের পর মেয়েটির বাবা গোলাম মোস্তফার কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।

গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, মেয়ের লাশ এলাকায় দাফনের জন্য তিনি স্থানীয় বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদকে ফোন করেন। কিন্তু মেয়েটি করোনায় মারা গেছে সন্দেহে এলাকায় লাশ দাফনের অনুমতি দেননি চেয়ারম্যান। উল্টো এলাকায় লাশ আনলে বাড়ি ও লাশসহ গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি মেয়ের লাশ দাফনের জন্য লাশবাহী এক গাড়ির চালককে পাঁচ হাজার টাকা দেন। পরে লাশটি নদী থেকে উদ্ধারের পর খবর পান। তার ধারণা, ওই গাড়িচালক লাশ দাফনের পরিবর্তে তিস্তা নদীতে ফেলে দিয়েছেন। এরপর পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় গোরস্থানে মেয়েটির লাশ দাফন করা হয়।

গত ৮ এপ্রিল নরসিংদীতে করোনা উপসর্গ (জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্ট) নিয়ে সুলতানা বেগম (৩৫) নামে ৬ মাসের গর্ভবতী আরও এক নারী গার্মেন্টকর্মী মারা যান। তিনি নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টে কাজ করতেন। সুলতানা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে- এ ভয়ে স্বামীর বাড়ি কাজির কান্দিতে লাশ দাফন করতে দেয়নি গ্রামবাসী। এমনকি সুলতানার স্বামী আমানউলস্নাকেও লাশের কাছে যেতে দেয়নি তার স্বজনরা।

গত ১ মে রাতে সর্দি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টতে আক্রান্ত হয়ে চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতাল লাগোয়া করোনা রোগীদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তির দেড় ঘণ্টা পর মারা যান গৃহবধূ ফাতেমা বেগম (৪০)। গৃহবধূর স্বামী জাহাঙ্গীর হোসেন কর্মসূত্রে চাঁদপুর শহরে থাকলেও তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামে। তার শ্বশুরবাড়ি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও ইউনিয়নে। করোনার উপসর্গ থাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুযায়ী শ্বশুরবাড়িতে মৃতের দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল হাদী এবং মেম্বার ইসমাইল হোসেন। তাদের এমন অমানবিক আচরণে ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে পুলিশ প্রশাসনের স্থানীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে রাত আড়াইটার দিকে রাজারগাঁওয়ে মরদেহ দাফনের ও জানাজার ব্যবস্থা করা হয়। জানাজায় অংশ পুলিশের ৭ সদস্যের সঙ্গে যোগ দেন পরিবারের সদস্যসহ আরও পাঁচজন।

গত ৩১ মার্চ শ্বাসকষ্ট নিয়ে ৩৫ বছরের এক ব্যক্তি শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়। করোনা সন্দেহে ভর্তি যুবককে আইসোলেশন ইউনিটে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ মার্চ রাতে তার মৃতু্য হয়। সকালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মীরা শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল থেকে ওই ব্যক্তির মরদেহ দাফনের জন্য নড়িয়ায় তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। তবে এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান স্থানীয়রা। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির মরদেহ দাফন করা হয়।

গত ১১ এপ্রিল সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে করোনাভাইরাস উপসর্গ (জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও কাশি) নিয়ে ৮০ বছরের এক নারী মারা যান। পরে তার দাফন করতে নিয়ে যাওয়া হলে করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে লাশ দাফন করতে বাধা দেয় এলাকাবাসী। এ নিয়ে পুলিশ ও এলাকাবাসীর মাঝে সংঘর্ষ বেধে গেলে জনতার নিক্ষেপ করা ইটের আঘাতে এক পুলিশ কনস্টেবল গুরুতর আহত হন। এরপর সেনাবাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ ওই এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সন্ধ্যায় খাজা নগর কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।

১১ মে কুমিলস্না শহরের ঝাউতলা এলাকায় গলাব্যথা ও জ্বর নিয়ে মারা যান অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য নয়ন মিয়া (৬০)। কিন্তু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তার মৃতু্য হয়েছে এমন সন্দেহে মুরাদনগরে তার লাশ দাফনে বাধা দিয়েছে এলাকাবাসী। পরে মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তার লাশ দাফন করা হয়। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে।

করোনায় মৃতদের দাফনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, যারা দেশের বাইরে থেকে এসেছেন, তাদের সঙ্গে অনেকে একটু অন্য রকম আচরণ করছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে যারা মৃতু্যবরণ করছেন তাদের দাফন করতে দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, 'আমরা সব সময় আপনাদের বলেছি আপনারা সহনশীল, সংবেদনশীল হোন। অনেক রোগেই কিন্তু অনেকে মৃতু্য বরণ করতে পারেন। এখন মৃতু্যবরণ করলে তা কোভিড-১৯ আক্রান্ত হবেন, এমন কিন্তু নয়। ইতিমধ্যে এই রকম প্রশ্ন ওঠায় অনেকের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছি। তারা সন্দেহের শিকার হলেও পরীক্ষায় তাদের করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়নি।'

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আইইডিসিআর এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটিতে লাশ দাফনে কোনো ঝুঁকি নেই। করোনায় মৃতের দেহ থেকে সংক্রমণ ছড়ায় না। আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর জানান, সাধারণত কবর দেওয়ার পর লাশটি থেকে ভাইরাস সংক্রমণের কোনো সুযোগ থাকে না।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে