logo
বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন   ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মূলমন্ত্র ছিল মানুষের মুক্তি। আমাদের সে মুক্তি মিললেও এখনো পরিপূর্ণতা আসেনি। দরকার শোষণহীন একটি সমাজব্যবস্থা।

তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ একটা ঘটনা মাত্র নয় এর রয়েছে মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা। পাকিস্তানি জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে এই দেশের নিরস্ত্র জনতা রুখে দাঁড়িয়েছিল দেশপ্রেমের চেতনায়। এই দেশের মুক্তিকামী জনতা একটি ফুলকে বাঁচাতে, একটি পতাকা উড়াতে জীবনকে তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার লড়াইয়ে, মুক্তির লড়াইয়ে।

আমাদের এই মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতা অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তার ক্ষুরধার রাজনৈতিক মেধা, প্রজ্ঞা ও নির্দেশনা আমাদের দিয়ে গেছেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম স্বাধীন সোনার বাংলা।

বক্ষুন্ধু ও বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধু বললেই একটি দেশ, আর বাংলাদেশ বললেই বঙ্গবন্ধুর ছবি ভেসে ওঠে। ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, 'আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি', কথাটা এখন কিংবদন্তি।

এই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াইয়ের নেতৃত্বদান ও যুদ্ধপরবর্তী একটি বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তার অবদান বাঙালি জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধু যে বিশাল মহানুভবতা ও দেশপ্রেমের নিদর্শন রেখে গেছেন আমাদের সামনে তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলেই সত্যিকারের সোনার বাংলা নির্মাণ করা সম্ভব।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের যে মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস, অহংকার, সততার শিক্ষা, মাথা উঁচু করে চলার উজ্জীবনী শক্তি, ন্যায় বলার, প্রতিবাদী হওয়ার ও দেশের জন্য কিছু করে যাওয়ার অধিকার দিয়েছে তা দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। নবীন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতাকে তুলে ধরে এর চেতনাকে তাদের হৃদয়ে ধারণ করানোর এখনি সময়।

বঙ্গবন্ধুর প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের মুক্তি। স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল এ দেশের মানুষের কল্যাণসাধন এবং স্বাধীন ও মুক্তির লক্ষ্যে তাদের চালিত করা। পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মনে সূর্যের আলোর প্রদীপ্ত শিখা প্রজ্বলিত করেছেন, জাতিকে করেছেন আত্মসচেতন, জাগিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের বোধশক্তি। তিনি 'জয় বাংলা' দিয়ে বাঙালি জাতিকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন। সেই সঙ্গে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারা ও তার ভিত্তিতে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের যেসব ঐতিহাসিক অর্জন তার প্রতীক ও কেন্দ্রবিন্দু বঙ্গবন্ধু। আর তা সম্ভব হয়েছিল তার অদম্য, একনিষ্ঠ দেশপ্রেম ও কৃতিত্বের কারণেই। আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের লড়াইয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট আদর্শ ছিল। দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও সোনার বাংলার স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছিলেন।

টুঙ্গিপাড়ার এক পরিবারে জন্ম নেওয়া শেখ মুজিব স্কুলজীবন থেকেই ছিলেন প্রতিবাদী। তিনি যখন গোপালগঞ্জ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন তখন গোপালগঞ্জে এক জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সভায় বক্তা ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

কিন্তু গোপালগঞ্জের এসডিও কোনোভাবেই সভা করতে দেবেন না। প্রতিবাদ জানালেন কিশোর মুজিব। তিনি বললেন, জনগণ সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হকের কথা শুনতে চায়, আপনি বাধা দেওয়ার কে! অতঃপর যা হওয়ার তাই হলো। কিশোর মুজিবের সাতদিনের জেল হলো।

আধিপত্যের বেড়াজাল ছিন্ন করতে তিনি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই সংগ্রামের প্রথম ধাপ ভাষা আন্দোলন। তিনি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি জানালেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রম্নয়ারির ২৩ তারিখে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন গণপরিষদের অধিবেশনে বলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ঢাবির আইন বিভাগের ছাত্র বঙ্গবন্ধু এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। তাই তাকে গ্রেফতার করা হলো। কিন্তু তিনি তাতে ভেঙে পড়লেন না। জেলখানাতে বসেই ভাষা আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালের রক্তস্নাত সময়কে ধরে বাঙালি তার ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করল।

সমকালীন উপমহাদেশে যে কজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছিল তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিল ব্যতিক্রম। তার বেড়ে ওঠার পরতে পরতে তাকালে আমরা দেখি তিনি নিজেকে কীভাবে অপরিসীম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কীভাবে বাংলার বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানে রূপান্তরিত হয়েছিলেন, হয়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি তথা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। জাতির পিতার এক ভাষণেই দেশের স্বাধীনতার পতাকা বুননের স্বপ্ন আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। একটি রাষ্ট্র-চিন্তার কথা বুকের মধ্যে ঠাঁই করে নেয়। আর তা ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম-আন্দোলনের মধ্যদিয়ে অর্জিত হয়েছে।

জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম'। সেই ডাকে প্রাণ বাজি রেখেছিল বাংলার সাধারণ মানুষ। যার ফলাফল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। একজন লোক মাত্র একটি ভাষণ করে কোটি কোটি বাঙালিকে মোহিত করেছিলেন। দিয়েছিল স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ছিলেন আজীবন নিয়মতান্ত্রিক ও অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী। এমনকি ৭ মার্চের ভাষণে তিনি প্রতিপক্ষকে 'ভাই' বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি কখনো কাউকে অমর্যাদা, অসম্মান করেননি। তিনি রাজনৈতিকভাবেই সবকিছু মোকাবিলা করেছেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু চিরস্মরণীয় একটি নাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস যতদিন থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অম্স্নান থাকবেন। পৃথিবীর ইতিহাসে, স্বাধীনতার ইতিহাসে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বঙ্গবন্ধু নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সঙ্গে। বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে, বাংলা ভাষা যতদিন উচ্চারিত হবে বঙ্গবন্ধুর নামও ততদিন ধ্বনিত হবে। দেশের মানুষের জন্য তিনি যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও রাতদিন লড়াই করেছেন। কিন্তু অসৎ লোকদের জন্য তার কাজ বারবার বাধাপ্রাপ্ত হতো। তিনি এক বক্তৃতায় বলেছেন মানুষ পায় সোনার খনি আমি পেয়েছি চোরের খনি।'

তার আক্ষেপ ছিল কি অসামান্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই দেশটা স্বাধীন হয়েছে। দু'মুঠো অন্ন আর এক অংশ কাপড়ের আশায় এই দেশের মানুষ জীবনটাকে বিলিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতার আসল স্বাদ মানুষের রুটি রোজগার নিশ্চিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু ছিল পাগলপ্রায়। কিন্তু বিদেশিচক্র আর দেশি স্বাধীনতাবিরোধী এবং রাজনৈতিক উচ্চবিলাসী অংশ তাকে কাজ করতে দেয়নি। নানাভাবে দেশকে অস্থিতিশীল রেখেছে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে।

তাছাড়া নিজ দলের দুর্বৃত্তায়ন নিয়েও বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপ ছিল। বাঙালিপ্রেমী এই মানুষটা একটি আক্ষেপ করে বলেছিলেন সাত কোটি মানুষের জন্য সাত কোটি কম্বল এসেছে আমার কম্বল কই! তিনি চেয়েছিলেন এই হতভাগা জাতিটাকে পাকিস্তানি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিতে। তিনি এই মুক্তি দিতে পেরেছিলেন কিন্তু তার পরবর্তী কাজ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠন করে মানুষকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন।

তার কাজ শেষ হওয়ার আগেই তাকে সপরিবারে হত্যা করে বাঙালি জাতির আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছিল কিছু বিপদগামী সেনাকর্মকর্তা ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি। এই হত্যাকান্ড এই দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল শত বছরের জন্য। বাংলাদেশে উঠে গেল অদ্ভুত উটের পিঠে। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। একটি অসম্প্রায়িক, শোষণ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কাজ এগিয়ে নিতে হবে এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে। তরুণদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনাকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ করে যেতে হবে। বাংলার উর্বর মাটিতে যেমন সোনা ফলে, ঠিক তেমনি পরগাছাও জন্মায়। একইভাবে বাংলাদেশে কতকগুলো রাজনৈতিক পরগাছা রয়েছে। যারা বাংলার মানুষের বর্তমান দুঃখ-দুর্দশার জন্য দায়ী। তাদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক ও কঠোর হতে হবে।

২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। ২০২০ সালকে বাংলাদেশ সরকার 'মুজিববর্ষ' ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া উইনেস্কোও একই সঙ্গে 'মুজিববর্ষ' পালন করার ঘোষণা দিয়েছে। এই বছরই মুজিবর্ষে তরুণ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মূলমন্ত্র ছিল মানুষের মুক্তি। আমাদের সে মুক্তি মিললেও এখনো পরিপূর্ণতা আসেনি। দরকার শোষণহীন একটি সমাজব্যবস্থা।

অসম্প্রাদায়িক ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে হবে দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে।

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন: কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে