logo
বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  মো. আরাফাত রহমান   ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

জনসংযোগ পেশার একাল সেকাল

জনসংযোগ কর্মকর্তাকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন দক্ষ জনসংযোগবিদ হতে হলে বহুমাত্রিক যোগ্যতা ও গুণাবলির অধিকারী হতে হয়। থাকতে হয় প্রখর ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা।

জনসংযোগ হলো একজন ব্যক্তি বা সংস্থা এবং জনসাধারণের মধ্যে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাপনার অনুশীলন। জনসংযোগের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে একটি সংগঠনের জনস্বার্থবিষয়ক তথ্যসমূহ তাদের শ্রোতাদের কাছে প্রকাশ পেতে পারে। এটি বিপণন যোগাযোগের একটি অংশ যা বিজ্ঞাপন থেকে এটিকে পার্থক্য করে। জনসংযোগ হলো- বিপণন বা বিজ্ঞাপনের পরিবর্তে বিনামূল্যে ক্লায়েন্টদের জন্য কভারেজ তৈরির ধারণা। কিন্তু বর্তমানে বিজ্ঞাপন বৃহত্তর জনসংযোগ কার্যক্রমেরই একটি অংশ। জনসংযোগের উদ্দেশ্য হলো জনগণ, সম্ভাব্য গ্রাহক, বিনিযয়োগকারী, অংশীদার, কর্মচারী এবং অন্যান্য অংশীদারদের প্রতিষ্ঠান, তার নেতৃত্ব, পণ্য বা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানানো এবং ইতিবাচক বা অনুকূল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ থাকা। জনসংযোগ কর্মকর্তারা সাধারণত পিআর এবং মার্কেটিং ফার্ম, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি, বেসরকারি সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে।

জনসংযোগ অনেক ধরনের হয়ে থাকে, উদাহরণস্বরূপ আর্থিক জনসংযোগ শেয়ারহোল্ডার এবং গ্রাহকদের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলে। করপোরেট জনসংযোগ গ্রাহকদের কোম্পানির মূল ধারণা সম্পর্কে জানাতে সহায়তা করে। এটি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে কোনো ব্যক্তিবিশেষের সুনাম বৃদ্ধির জন্য, ওই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট 'জন' যথা- শ্রমিক, কর্মচারী ও ক্রেতাসহ সমাজের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত রাখার প্রক্রিয়া। জনসংযোগ হচ্ছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পর্কিত প্রকৃত ঘটনাভিত্তিক উদ্দেশ্যমূলক একটি যোগাযোগ প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে জনসংযোগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে এ বিষয়টি মানুষের কর্মকান্ডের সব ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার পাশাপাশি তাদের সেবা ও বাণিজ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে জনসংযোগ কর্মী নিয়োগ করে থাকে। জনসংযোগ কর্মকর্তাকে তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি ও রক্ষার জন্য জনসংযোগ কর্মসূচি প্রণয়ন, সংগঠন ও সমন্বয় করতে হয়। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যাবলি সম্পাদনসহ এ সব দায়িত্ব পালনে নিজ সংগঠনের প্রতিটি ব্যক্তির সমর্থন ও সহযোগিতা তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।

জনসংযোগ বিশেষজ্ঞরা শ্রোতা, মিডিয়া, এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং সম্পর্ক বজায় রাখেন। সাধারণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ, প্রচারণা, ডিজাইন করা, সংবাদ প্রকাশ, সংবাদপত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা, কোম্পানির মুখপাত্রদের সাক্ষাৎকার প্রচার, কোম্পানির পরিচালকদের জন্য বক্তৃতা লেখা, সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করা, মিডিয়া সাক্ষাৎকার এবং প্রেস কনফারেন্সের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সংগঠনের নিউজ আপডেট করা, কোম্পানির সংকট ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা, ব্র্যান্ড সচেতনতা এবং ইভেন্ট পরিচালনার মতো মার্কেটিং কার্যক্রমগুলো পরিচালনা, সাফল্যের সঙ্গে কোম্পানির স্বার্থ এবং উদ্বেগের বিষয়গুলো গভীরভাবে বোঝা। জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে জনসংযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার ব্যবহার করে উদ্বেগগুলো কার্যকরভাবে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে তা জানা আবশ্যক।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি জনসংযোগকর্মীদের সংখ্যা উলেস্নখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও জনসংযোগে কাঙ্ক্ষিত পেশাদারিত্ব এখনো অর্জিত হয়নি। এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী হচ্ছে একটি জাতীয় জনসংযোগ নীতিমালা না থাকা, জনসংযোগ পেশাজীবীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধার অভাব এবং জনসংযোগ শাখাকে কর্তৃপক্ষের কম গুরুত্ব প্রদান। অনেক সংস্থায় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনো জনসংযোগ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করতে দেয় না। মূলত এসব কারণে এখনো কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তি এবং প্রকৃত অবস্থার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়ে গেছে।

বর্তমান সময়ে মানুষ ওয়েবকেন্দ্রিক হওয়ায় জনসংযোগ কাজের গতিধারায় বিগত কয়েক বছরে অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্ত হয়েছে নতুন কৌশল। প্রতিষ্ঠানের সফলতা দক্ষ যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে। জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে আপনার থাকতে হবে দক্ষ যোগাযোগের কৌশল। লেখালেখির দক্ষতার মাধ্যমে আপনি হতে পারেন দক্ষ জনসংযোগ কর্মকর্তা। লেখালেখির দক্ষতা আপনার জনসংযোগ কাজে ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করবে। মনোযোগ দিয়ে কাজ করার মানসিকতা থাকলে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে তাড়াতাড়ি সফল হতে পারেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলে, গণমাধ্যম নিয়ে ভালো জ্ঞান থাকলে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে তাড়াতাড়ি সফলতা পেতে পারেন। সৎভাবে কাজ করার মানসিকতা জনসংযোগ কাজে সফল হতে আপনাকে সাহায্য করবে। কৌতূহলী মনোভাব জনসংযোগ কর্মকর্তাকে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করতে সাহায্য করবে। যে প্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ কর্মকর্তা হবেন সে প্রতিষ্ঠান আর কাজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ সামাজিক মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকায় জনসংযোগ কর্মকর্তাকে সামাজিক মিডিয়ার টুলস সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।

জনসংযোগ কর্মকর্তাকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন দক্ষ জনসংযোগবিদ হতে হলে বহুমাত্রিক যোগ্যতা ও গুণাবলির অধিকারী হতে হয়। থাকতে হয় প্রখর ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা।

একজন জনসংযোগ কর্মকর্তার মধ্যে কয়েকটি গুণ থাকলে সে একজন দক্ষ এবং সফল জনসংযোগবিদ হতে পারে। গুণগুলো হলো- ইতিবাচক মনোভাব, স্মার্ট ও কঠোর পরিশ্রম, নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা ও প্রভাবিত করা ক্ষমতা। পেশা হিসেবে জনসংযোগ অবশ্যই একটি চ্যালেঞ্জিং ও রোমাঞ্চকর পেশা। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে জনসংযোগ বা যোগাযোগের মাত্রা সম্প্রসারিত হওয়ায় এই পেশার প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। জনসংযোগ জ্ঞান বা দক্ষতা থাকলে যে কেউ এ পেশায় আসতে পারেন। কর্মক্ষেত্র, ব্যক্তি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক সব ক্ষেত্রেই জনসংযোগের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আপনার যদি ভালো শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে আর থাকে মানুষের সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলার ও মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তাহলে আপনি জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।

মো. আরাফাত রহমান : সহকারী জনসংযোগ কর্মকর্তা, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে