logo
শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  আর কে চৌধুরী   ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

বেড়েই চলছে কিডনি রোগীর সংখ্যা জনসচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই

কিডনি রোগের তৃতীয় প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। উন্নত বিশ্বে ২০-২৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপ রোগের কারণে কিডনি নষ্ট হয়। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপের কারণে ব্রেনস্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক তো আছেই। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না থাকলে তা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

কিডনি ক্রমান্বয়ে জীবনঘাতী রোগে পরিণত হচ্ছে। দেশের প্রতি ৯ জনের একজন মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর ৪০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হয়। তাদের অধিকাংশই মৃতু্যবরণ করে চিকিৎসার অভাবে। কিডনি ডায়ালাইসিস কিংবা সংযোজন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় বেশির ভাগ মানুষ এ রোগের সামনে অসহায়। প্রায় ৮০ ভাগ কিডনি রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্য নেই।

সম্প্রতি রাজধানীতে কিডনি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত দুদিনব্যাপী বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে দেওয়া বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আক্রান্তদের কিডনি এক সময় সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। তখন ডায়ালাইসিস বা কিডনি সংযোজন ছাড়া বাঁচার উপায় থাকে না। এ দুটো চিকিৎসা পদ্ধতিই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অথচ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মানসম্মত কিডনি রোগ চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। এর কারণ অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব।

বিশ্বে বর্তমানে ৮৫০ মিলিয়ন মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় ও ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষ এ ঘাতক রোগে মারা যায়। দেশে প্রায় ৪০ হাজার রোগী দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে কিডনি রোগ বিস্তারের পেছনে নানা কারণ জড়িত। ঘাতক এ রোগ কিডনির সর্বনাশ ডেকে আনে কোনো উপসর্গ ছাড়াই। কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। এ রোগ প্রতিরোধে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও কায়িক শ্রম, অতিরিক্ত লবণ, ফাস্টফুড, চর্বি জাতীয় ও ভেজাল খাবারসহ ধূমপান বর্জন করার দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষত ভেজাল ও ক্ষতিকর খাবার থেকে বিরত থাকলে কিডনি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। দেশে সাম্প্রতিককালে কিডনি চিকিৎসায় তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। কিডনি সংযোজনের মতো জটিল অস্ত্রোপচারও বাংলাদেশে সম্ভব হচ্ছে। তবে আইনগত জটিলতা এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে বিরাজ করছে। ফলে এ দেশের রোগীরা বিদেশে গিয়ে কিডনি সংযোজন করছে। তাদের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্বিগুণ। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে বিরাজ করছে আইনগত জটিলতা। কিডনি যেহেতু ঘাতক রোগ হয়ে আবির্ভূত হচ্ছে সে জন্য এ ব্যাপারে জনসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। যা বিপদ এড়ানোর ক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক।

কিডনি রোগের মূল সমস্যা হলো, কোনো রকম লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই ধীরে ধীরে কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় এবং রোগের শেষ পর্যায়ে অসুস্থতা প্রকাশ পায়। কিছু লক্ষণ হলো শারীরিক দুর্বলতা, ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেওয়া, প্রস্রাব কম হওয়া, ইনফেকশন ইত্যাদি। সিকেডিতে আক্রান্ত হলে পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব হয় না, তবে রোগের জটিলতা থেকে রোগীকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা হয়। পরিপূর্ণ কিডনি বিকল হলে ডায়ালিসিস, কিডনি ট্রান্সপস্নান্ট করাতে হয়।

\হদৈনিক আট থেকে ১০ গস্নাস পানি পান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম করা, অ্যালকোহল পরিত্যাগ করা ইত্যাদির মাধ্যমে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ প্রতিরোধ করা যায়।

কিডনি রোগের প্রধান প্রধান কারণ

কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা স্থায়ীভাবে কিডনি বিকল হয় নানা কারণে। তবে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নেফ্রাইটিসের কারণে ৪৬ শতাংশ, ডায়াবেটিসের কারণে ৩৮ শতাংশ ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে ১১ শতাংশ কিডনি বিকল হয়। এ ছাড়া বংশগত, ওষুধের প্রভাব ইত্যাদি কারণ রয়েছে।

নেফ্রাইটিস

\হনেফ্রাইটিস হলো কিডনির প্রধান একটি রোগ। যে কোনো বয়সে এ রোগ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি ৯০ শতাংশ নিরাময়যোগ্য। জটিলতা বাঁধে বড়দের বেলায়। সংক্রামক ও অসংক্রামক এ দুই ধরনের নেফ্রাইটিস হতে পারে। ২০ শতাংশ সংক্রামক ও ৮০ শতাংশই অসংক্রামক কারণে নেফ্রাইটিস হয়, যার কারণ সম্পূর্ণ অজানা। সংক্রামক কারণগুলো প্রতিরোধ বা প্রতিকার করা যায়। কিন্তু অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা বেশ জটিল।

নেফ্রাইটিসে শরীর ফুলে যায়, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং প্রস্রাবে আমিষ নির্গত হয়। এমনকি প্রস্রাবে লোহিতকণিকা, কাস্ট বা শ্বেতকণিকা যেতে পারে। রক্তে ক্রিয়েটিনিন নামের যৌগিক পদার্থ বেড়ে যেতে পারে। রক্তে চর্বির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। কিডনি থেকে সুচের মাধ্যমে টিসু্য বের করে তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে (বায়োপসির) এই রোগ শনাক্ত করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসার মাধ্যমে ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই জাতীয় ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) নিরাময় করা সম্ভব। আশঙ্কার কথা হলো, চিকিৎসা সত্ত্বেও ১০-১৫ বছরের মধ্যে ৬০ শতাংশ রোগীর কিডনির কার্যকারিতা লোপ পায় এবং কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়।

ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিস তেমন কোনো মারাত্মক ব্যাধি নয়। তবে নিয়ম না মেনে চলা ও সঠিক চিকিৎসার অভাবেই এটা মারাত্মক হয়। টাইপ ওয়ান, অর্থাৎ কম বয়সের ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যায়। বেশি বয়সীদের বা টাইপ টু, ডায়াবেটিস রোগ হলে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ট্যাবলেট বা ইনসুলিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ৯৮ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগী হচ্ছে টাইপ টু। তবে ডায়াবেটিস প্রতিকার, এমনকি প্রতিরোধ করাও সম্ভব। সচেতন হয়ে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ওষুধের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের অভ্যাস ডায়াবেটিক রোগীকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।

আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, ৪০ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগী কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। এটা ডায়াবেটিস রোগ শনাক্ত করার পর থেকে যে কোনো সময়ে হতে পারে। তাই কেউ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়েছে কি না তা জানা প্রতিটি ডায়াবেটিক রোগীর জন্য জরুরি। শুধু প্রস্রাব পরীক্ষা করে এবং রক্তের ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দেখে বোঝা যায়, কেউ ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগে আক্রান্ত কি না। বিশেষ করে চলিস্নশের বেশি বয়সী ডায়াবেটিক রোগীর এবং যাদের বংশে ডায়াবেটিক রোগী রয়েছে, তাদের এই পরীক্ষা করা জরুরি।

উচ্চ রক্তচাপ

কিডনি রোগের তৃতীয় প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। উন্নত বিশ্বে ২০-২৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপ রোগের কারণে কিডনি নষ্ট হয়। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপের কারণে ব্রেনস্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক তো আছেই। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না থাকলে তা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের ধারণা, উচ্চ রক্তচাপে উপসর্গ বা লক্ষণ প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসার দরকার নেই। আবার অনেকের ধারণা, সামান্য উচ্চ রক্তচাপের জন্য ওষুধ না খাওয়াই ভালো। অথবা ওষুধ সেবন করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ হয়ে গেলে আর ওষুধের দরকার নেই। আবার অনেকে মনে করেন, সারা জীবন এই ওষুধ খেতে থাকলে শরীরের অনেক ক্ষতি হতে পারে। মূলত এসবই ভুল চিন্তা, যা থেকেই উচ্চ রক্তচাপ সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়। এর প্রবণতায় পরবর্তী সময়ে কিডনি অকেজো হয়। তখন কিছু উপসর্গ প্রকাশ পায় বটে, কিন্তু চিকিৎসকের আর কিছুই করার থাকে না।

তাই কারো উচ্চ রক্তচাপ থাকুক আর না থাকুক, নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে চলিস্নশোর্ধ্ব বয়সী যারা এবং বংশে যাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে অথবা কিডনি রোগ রয়েছে, তাদের অবশ্যই বছরে এক-দুবার রক্তচাপ পরীক্ষা করে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। আর রক্তচাপের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে তখন থেকে চিকিৎসা শুরু করা উচিত। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার নিয়ম পরিবর্তন, লবণ পরিহার, প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।

যে কোনো রোগ থেকে মুক্ত থাকার জন্য খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে কিছু খাবার বাদ দিতে হবে। ভেজাল খাদ্য খেতে কেউ নিষেধ করলে দুয়েকদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাই। আমরা সহজেই ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করি। কিডনি ভালো রাখতে হলে কোনো অবস্থায় ভেজাল খাদ্য খাওয়া যাবে না। এ জন্য সচেতনতা দরকার। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। হৃদরোগ ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে।

আর কে চৌধুরী: মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে