logo
মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  অ্যাডভোকেট মো. সাইফুদ্দীন খালেদ   ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

নতুন আইনে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে কি?

সড়কে যানবাহন চলাচল এবং দুর্ঘটনাসংক্রান্ত ব্যাপারগুলোতে আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। আইনটি কার্যকরের আগে পর্যাপ্ত প্রচারণা চালানো হয়নি। এটি একটি দুর্বলতা। কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু, সমন্বিত পদক্ষেপ, জনগণের সচেতনতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশ দুর্ঘটনামুক্ত হবে এ প্রত্যাশা করছি।

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মুখে সরকার ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহণ আইন পাস করে। মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে এটি কার্যকর করতে এক বছরের বেশি সময় লেগে যায়। এর আগে মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এবং মোটরযান বিধিমালা ১৯৮৪-এর অধীনে সড়ক পরিবহণ খাত পরিচালিত হয়ে আসছিল। ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে 'সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮' কার্যকর করার জন্য গত ২২ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এরপর বিআরটিএ থেকে আইনটি কার্যকর করতে সবার কাছে অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছে। এতে বলা হচ্ছে, 'আইন মেনে চালাবো গাড়ি, নিরাপদে ফিরব বাড়ি'। সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮-এ মোটরযান চলাচলের নির্দেশাবলি দেওয়া হয়েছে। ওই আইনের ৪৯ ধারায় প্রথম অংশে বলা হয়েছে- মদ্যপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে কোনো চালক মোটরযান চালাতে পারবে না। মদ্যপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে কোনো কন্ডাক্টর বা মোটরযান শ্রমিক মোটরযানে অবস্থান করতে পারবে না। মোটরযানচালক কোনো অবস্থাতে কন্ডাক্টর বা মোটরযান শ্রমিককে মোটরযান চালনার দায়িত্ব প্রদান করতে পারবে না। সড়ক বা মহাসড়কে নির্ধারিত অভিমুখ ছাড়া বিপরীত দিক থেকে মোটরযান চালানো যাবে না। সড়ক বা মহাসড়কে নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্যকোনো স্থানে বা উল্টো পার্শ্বে বা ভুল দিকে (ডৎড়হম ঝরফব) মোটরযান থামিয়ে যানজট বা অন্যকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। চালক ছাড়া মোটরসাইকেলে একজনের অধিক সহযাত্রী বহন করা যাবে না এবং চালক ও সহযাত্রী উভয়কে যথাযথভাবে হেলমেট ব্যবহার করতে হবে। চলন্ত অবস্থায় চালক, কন্ডাক্টর বা অন্যকোনো ব্যক্তি কোনো যাত্রীকে মোটরযানে উঠাতে বা নামাতে পারবে না। প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য গণপরিবহণে অনুকূল সুযোগ-সুবিধা রাখতে হবে। মোটরযানের বডির সামনে, পিছনে, উভয়পার্শ্বে, বডির বাইরে বা ছাদে কোনো প্রকার যাত্রী বা পণ্য বা মালামাল বহন করা যাবে না। সরকার বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো মোটরযানে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন বা প্রচার করা যাবে না। কোনো মহাসড়ক, সড়ক, ফুটপাত, ওভারপাস বা আন্ডারপাসে মোটরযান মেরামতের নামে যন্ত্রাংশ বা মালামাল রেখে বা দোকান বসিয়ে বা অন্য কোনোভাবে দ্রব্যাদি রেখে যানবাহন বা পথচারী চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। সড়কের সংলগ্ন ফুটপাতের ওপর দিয়ে কোনো প্রকার মোটরযান চলাচল করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি কোনো মোটরযানের মালিক বা কোনো আইনানুগ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট মোটরযান চালিয়ে বাইরে নিয়ে যেতে পারবে না। আইনানুগ কর্তৃপক্ষ বা যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মোটরযানে প্রবেশ বা আরোহণ করতে পারবে না। দ্বিতীয় অংশ : মোটরযানচালক মোটরযান চালনারত অবস্থায় মোবাইল ফোন বা অনুরূপ সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারবে না। মোটরযানচালক সিটবেল্ট বাঁধা ছাড়া মোটরযান চালাতে পারবে না। দূরপালস্নার মোটরযানে নির্ধারিত সংখ্যক যাত্রী বা আরোহীর অতিরিক্ত কোনো যাত্রী আরোহী বহন করা যাবে না। কোনো চালক, কমান্ডার বা মোটরযান পরিচালনার সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি পরিবহণযানে যাত্রী সাধারণের সঙ্গে কোনো প্রকার দুর্ব্যবহার বা অসৌজন্যমূলক আচরণ বা হয়রানি করতে পারবে না। রাত্রিবেলায় বিপরীত দিক থেকে আসা মোটরযান চালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এরূপ হাইবিম ব্যবহার করে মোটরযান চালানো যাবে না। উপরোক্ত নির্দেশাবলিগুলো অমান্য করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। প্রথম অংশের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ৩ (তিন) মাসের কারাদন্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসাবে দোষ সূচক এক পয়েন্ট কর্তন হবে। দ্বিতীয় অংশের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ১ (এক) মাসের কারাদন্ড বা ৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসাবে দোষ সূচক এক পয়েন্ট কর্তন হবে। নতুন আইনে বেপরোয়া বা অবহেলায় গাড়ি চালানোর কারণে কেউ গুরুতর আহত বা কারও প্রাণহানি হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদন্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সড়ক পরিবহণ আইনে বলা আছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতু্য হত্যার উদ্দেশ্যে প্রমাণিত হলে তা দন্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০২ ধারার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যার শাস্তি মৃতু্যদন্ড। কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ব্যবহার করে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড হবে। সড়কে দুটি গাড়ি পালস্না দিয়ে (রেসিং) চালানোর সময় যদি দুর্ঘটনা ঘটে, সে ক্ষেত্রে তিন বছরের কারাদন্ড অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। চলন্ত অবস্থায় চালক মুঠোফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদন্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। এই আইনে অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদি ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার আরও বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে রাস্তার বস্ন্যাকস্পট (ত্রম্নটি), অদক্ষ চালক, সড়কের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা বেশি, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, রাস্তার জ্যামিতিক ত্রম্নটি, নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালানো, পথচারী ও যাত্রীদের অসাবধানতা, ডিভাইডারের অভাবে বিপরীতমুখী যানবাহনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ, রেলের অরক্ষিত লেভেলক্রসিং। অনেক সময় রেলক্রসিংগুলোতে ট্রেনের ধাক্কায় মারা যাচ্ছে মানুষ। দেশের অধিকাংশ রেলক্রসিংয়ে নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা, নেই কোনো সঠিক আগাম সংকেতের ব্যবস্থাও। দুর্ঘটনা কবলিত স্থানে দ্রম্নত চিকিৎসা সাহায্য পৌঁছানো, অ্যাম্বুলেন্স, ইমার্জেন্সি সার্ভিস এবং ফাস্টএইড টিমসংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। হাইওয়েগুলোতে পুলিশের পেট্রোল কারের সংখ্যাও নগণ্য। গাড়ির সিটবেল্ট এবং হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনীহা, ঝুঁকিপূর্ণ গতিতে গাড়ি ওভারটেক করা, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ইত্যাদি। এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা এখন অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্ত রাখার সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। যানবাহনের উচ্চগতি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। জেব্রা ক্রসিং ও ফুট ওভারব্রিজ ছাড়া রাস্তা পারাপার বন্ধ করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাসেও সড়ক দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিরোধসংক্রান্ত সচেতনতামূলক প্রবন্ধ, গল্প অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিআরটিএর উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ট্রাকে ওভারলোড বন্ধে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেশিন চালু করা এবং ওভারলোডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বিভিন্ন সড়কের সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করে দুর্ঘটনাবিরোধী অভিযান চালাতে হবে। সড়ক মেরামত, সংস্কারের মতো জরুরি কাজকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বিভিন্ন গাড়ি ভাংচুর করে আগুন জ্বালিয়ে সাধারণ জনতা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও তারা ভুলে যাচ্ছে এটা কোনো সঠিক পন্থা নয়। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সড়ক পরিবহণ আইন এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা দরকার।

সড়কে যানবাহন চলাচল এবং দুর্ঘটনাসংক্রান্ত ব্যাপারগুলোতে আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। আইনটি কার্যকরের আগে পর্যাপ্ত প্রচারণা চালানো হয়নি। এটি একটি দুর্বলতা। কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু, সমন্বিত পদক্ষেপ, জনগণের সচেতনতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশ দুর্ঘটনামুক্ত হবে এ প্রত্যাশা করছি।

অ্যাডভোকেট মো. সাইফুদ্দীন খালেদ: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে